নবনী দাড়িয়ে পড়েছে। তার মনে হচ্ছে সে একা একা আর ডাকবাংলোয় ফিরতে পারবে না। তার সব সাহস চলে গেছে। এখন হয়ত সে পথই খুঁজে পাবে না। বটের ঝুড়ির আড়াল থেকে কে যেন কাশল। একবার না, পরপর দু’বার ননী দারুণ চমকে বলল, কে? কে শুখানে
গাছের বাঁধানাে গুঁড়িতে পা তুলে গুটিসুটি মেয়ে কে যেন বসে আছে। তার গায়ে চাদরটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে খয়েরি । নবনী উচু গলায় বলল, কে এখানে বসে আছে।
‘জি আমি ।।
বের হয়ে আসুন দয়া করে।
লােকটা যদি জবাব দিতে আরেকটু দেরি করত তাহলে কি কাণ্ড হত কে জানে। নবনী হয় হার্টফেল করত । পাছের কুড়ির ভেতর দিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে লােকটা বের হল। দোয়ে দু পাওয়ার মত চেহারা । -ত্রিশ বছরের একজন মানুষ। লন পাজামা-পাঞ্জাবি। গায়ে খায়রি রঙের চাদর। চোখে চশমা। তাকে দেখে মনে হলে ননী যেমন ভয় পেয়েছে, সেও ভয় পেয়েছে। কেমন মুখ কাচুমাচু করে, খানিকটা কুঞ্জে
ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। ডালমত তাকালেও না নবীর দিকে। ভাল তাকালে দেখতে
বীর সবচেয়ে সুপবতী তরুণীটি তার সামনে দাড়িয়ে আছে।
নবনী বলল, আপনি কে? ‘জি, আমার নাম মবিনউদ্দিন।
এখানে কি করছিলেন? কিছু করছিলাম না। বসে ছিলাম। “আপনি কি করেন? ‘আমি মাস্টারি করি।’
”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২
স্কুল মাস্টার’ ‘জি না, আমি কলেজে শিক্ষকতা করি। নবনী কঠিন গলায় বলল, আমাকে বলা হয়েছে এখানে কোন কলেজ নেই।
কলেজটা পাশের গ্রামে। মাঝে একটা নদী আছে। শিবসা নদী। শিবসা নদীর ঐ পাড়ে কলেজ। মমিননেসা মেমােরিয়াল কলেজ।’
আপনার কলেজ ঐ গ্রামে, আপনি এখানে এসেছেন কেন?”
নবনী জেরা করার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করছে। ধমকের সুরে প্রশ্ন। যেন ভীত মুখে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি আসামি, সে ফরিয়াদি পক্ষের উকিল। কলেজের একজন শিক্ষকের সঙ্গে এভাবে কথা বলা যায় না হয়। কিন্তু নবনীর খুব রাগ লাগছে। লােকটা কেন তাকে ভয় দেখাল।
কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন? আপনি ঘাপটি মেরে এই গাছের নিচে বসে কি করছিলেন।
কিছু করছিলাম না। চুপচাপ বসে ছিলাম। ধ্যান করছিলেন না-কি?’ মবিনউদ্দিন জবাব দিল না। কয়েকবার কাশল। এখনাে সে মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে । ননী বলল, আপনি আমাকে দারুণ ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। এত ভয় আমি জীবনে পাই নি। যাই হােক, আপনি আমাকে দয়া করে একটু এগিয়ে দিন। আমার ভয় কাটছে
আমি ফিসাবিজের ডাকবাংলােয় উঠেছি।
‘জি আমি জানি। আপনি মন্ত্রী সাহেবের বড় মেয়ে।
”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২
নবনীর ভয় কেটে গেল। লােকটি তাকে চিনতে পেরেছে। ভয় কাটার জন্য এই যথেষ্ট । তাছাড়া কথা বলছে খুব ভদ্র ভঙ্গিতে । কলেজের টিচালা এত ভদ্র ভঙ্গিতে কথা বলে না। তাৱা খিটখিটে ধরনের হয়। কে জানে গ্রামের কলেজের টিচাৱা হয়ত এরকম । কিংবা এও হতে পারে, লােকটা তাকে চিনতে পেরেছে বলেই এত ভদ্রভাবে কথা বলছে। লােকটার সঙ্গে এতটা খারাপ ব্যবহার করা উচিত হয়নি। পরে সবাইকে বলে বেড়াবে মন্ত্রীর মেয়ে আমাকে ধমক দিয়েছে। কেউ বুঝবে না, মন্ত্রীর মেয়ে না হলেও নতুন এই পরিস্থিতিতে এভাবেই কথা বলত।
নবনী গলার স্বর স্বাভাবিক করে ফেলে বলল, চলুন যাই। আমাকে এগিয়ে দিতে আপনার সুবিধা নেই তাে?
কি-না।
আপনার সঙ্গে আমি রেগে রেগে কথা বলছিলাম। আপনি কিছু মনে করবেন না। আসলে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, তারপর ভয়টা কেটে গেল। হঠাৎ ভয় কাটলে মানুষ রেগে যায় এই থিওরিটা কি আপনি জানেন?
মবিন জবাব দিল না। সে মাথা নিচু করে হাটছে। নবনী যা আগে আগে, সে তার পেছনে পেছনে। একটু দূরত্ব নিয়ে হাঁটছে। ননী পরিস্থিতি সহজ করার জন্যে বলল, আমি যে গাছটার সনে কথা বলছিলাম, তা কি হতে পেয়েছিলেন কি বলছিলাম বলুন তাে? আপনি কললিন, মিস্টার বটগাছ আপনি কোথেকে এলেন “আপনি আমার কথা হনে অন্যাক হননি?”
”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২
জি না।’ অবাৰু মুননি কেন?
আমি দুর থেকেই দেখেছি আপনি আসছেন। এই জলেই অবাক হইনি । আপনাকে না দেখে হঠাৎ অপি নাম তাহলে অবাক হলাম ।
“আমাকে একা একা আসতে দেখে অবাক হননি?”
কেন স্বাক হননি “আপনি তো প্রায়ই একা একা হাঁটেন। আমি একা একা হাঁটি তাও জানেন?
মশিন অৱস্তির সঙ্গে বলল, জানি। সবাই জানে। এটা প্রায় গ্রামের মত জায়গা। শহরের কেউ এলেই সবাই অবাক হয়ে দেখে । আর আপনি হচ্ছেন একজন মন্ত্রীর মেয়ে । আপনি কি করছেন না করছেন, সবাই লক্ষ্য রাখছে।
জি এটাই তাে স্বাভাবিক। এখানে কোন বড় ঘটনা তাে ঘটে না। একজন মন্ত্রীর মেয়ে একা একা হাটছে এটা বিরাট ঘটনা। আপনাকে নিয়ে কলেজের টিচার্স কমনরুমে আলােচনা হয়।’
“সে কি! কি আলােচনা ?” “আপনার শােনার মত কিছু না। আমাদের তাে আলােচনা করার কিছু নেই।
কলেজে আপনি কি পড়ান। ইংরেজি সাহিত্য। আপনাদের এটা কি ডিগ্রি কলেজ “জি না । ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। “আপনি কি আমার নাম জানেন? জি জানি। আপনার নাম নবনী।
নবনী হেসে ফেলল । নিতান্ত অপরিচিত একজন কলেজের শিক্ষক, যে ভূতের মত ঘাপটি মেরে বটগাছের ডিতে এসেছিল সেও তার নাম জানে, আশ্চর্য হবার মতই
আপনি কি আমার ছােট বােনের নাম জানেন? জি না ।। “আমারটা জানেন তারটা জানেন না কেন? তার নাম হল শ্রাবণী।”
Read More
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৩