হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৫

এই ঘর থেকে চলে যামিলু একটু সরে গেল কিন্তু ঘর থেকে বের হল 

না। 

মিলু প্রায় কুড়ি বছর ধরে তাদের সঙ্গে আছেদশ বছর বয়সে ভিক্ষা করতে এসেছিলজাহানারা তার সুন্দর মুখ দেখে অবাক হয়ে বললেন, ভিক্ষা করছিস কেন বাসায় কাজ করবি? মিলু বলল, নাতিনি মেয়েটাকে একটা জামা দিলেনপাঁচটা টাকা দিলেনবলে দিলেন, যদি কাজ করতে ইচ্ছা হয় চলে আসিসমেয়েটা পরের দিনই চলে এল তিনি বললেন, কি রে থাকবি?

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণেনাম কি তাের? কুদরতী।‘ 

কুদরতী কোন নাম নাতাের নাম এখন মিলু। বুঝেছিস? 

ইনা বল জি।জি।। পা ছুঁয়ে সালাম করমিলু পা ছুঁয়ে সালাম করল । 

জাহানারা বললেন, তাের চেহারা ছবি সুন্দর তুই ভালমত থাক তাের ভাল হবেবয়স কালে বিয়ে দিয়ে দেবতাের বয়েসী মেয়ে পথে ঘাটে ঘুরাও ঠিক না। থাকবিতাে ঠকমত

হ্যনা-বল জিজি‘ 

ভালমত থাকবিআদবকায়দা শিখবিকাজকর্ম শিখবি। সময় কালে আমি টাকা পয়সা খরচ করে বিয়ে দেব।’ 

জি আচ্ছ‘ 

জাহানারা তার কথা রেখেছেনমিলুর বিয়ে দিয়েছেন তাঁদের ড্রাইভার রহমতের সঙ্গেবিয়ের পরেও মিলু ঘরেই আছে ছেলেপুলে হয়নি। একদিক দিয়ে সুবিধাই হয়েছেছেলেপুলে হয়ে গেলে নিজের কাছে রাখতে পারবেন নাযেখানে যান নিজের সঙ্গে রাখেন। 

শাহেদকে কোথাও পাওয়া গেল নাডাকবাংলাের সর্ব পশ্চিমের ঘরটা নবনীর ছােট বােন শ্রাবণীর আর তিন মাস পরেই তার আই এস সি ফাইন্যাল পরীক্ষাদুটি কাটাতে এসেও সে নিরিবিলি পড়বে এই অজুহাতে ডাকবাংলোর সবচেয়ে সুন্দর ঘরটা নিয়ে নিয়েছে। এই ঘটা নাকি নিরিবিলিতার ঘরের সঙ্গের বারান্দাটা নদীর দিকেবারান্দায় দাড়ালেই নদী দেখা যায়

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫

শীতকাল বলেই নদী শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। নদীর চেয়েও যা চোখে পড়ে তা হল নদীর চর চাঁদের আলােয় বালির চর চিকচিক করে অদ্ভুত লাগে দেখতেশ্রাবণী এখানে আসার আগে দুসুটকেস ভর্তি বই নিয়ে এসেছে। এক সুটকেসে পাঠ্যবই। এক সুটকেসে গল্পবইপাঠ্যবইয়ের সুটকেসের তালা খােলা হয়নিগল্পের বইয়ের সুটকেস খােলা হয়েছেসে ক্রমাগত গল্পের বই পড়ে যাচ্ছেপ্রতিটি বই তার আগেই পড়াএকবার না, কয়েকবার করে পড়তারপরেও এমন ভাবে পড়ছে যেন নতুন বই। 

নবনী ঘরে ঢুকে দেখল, শ্রাবণী খাটে পা ঝুলিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছেতার হাতে বইগলায় লালরঙা মাফলার শাবণীর গলায় লালরঙা মাফলারের মানে হল টনসিলের সমস্যা হয়েছেকিছুদিন পর পর তার টনসিলের সমস্যা হয়ঢোক গিলতে পারে নাসে কাউকেই কিছু বলে না। একটা লাল মাফলার গলায় পেঁচিয়ে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। 

নবনী বলল, তাের কি গলাব্যথা? শ্রাবণী বই থেকে মাথা না তুলে বলল, হুঁজ্বর আসেনি তাে, গাল লাল লাগছেএসেছেএকশ এক পয়েন্ট ফাইভ‘ 

কি পড়ছিস?নির্বাচিত ভূতের গল্প এখন পড়ছি পরশুরামের মহেশের মহাযাত্রা। 

আজ কি সারাদিনই বই পড়লি?‘ 

মাঝখানে একবার বাবা মাছ দেখতে ডাকলেনমাছ দেখলামবাবাকে খুশি করার জন্যে বিকট চিৎকার দিলাম—মগাে! এটা কি? মাছ নাকি? ওয়াক থুমাছ এত বড় হয়? 

নবনী হেসে ফেলল শ্রাবণী হাসল নাপা নাচাতে লাগলনবনী বলল, যত দিন যাচ্ছে তুই উতই একটা ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছিসব্যাপারটা কেউ লক্ষ্য করছে না। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫

শ্রাবণী হাই তুলতে তুলতে বলল, কেউ যে করছে না তা—না, কেউ কেউ করছে। আহ আপা, এখন তুমি যাও। ভূতের গল্প এক নাগাড়ে পড়তে হয়। মাঝখানে ইন্টারাপশান হলে পড়াই মাটি। মনে হচ্ছে তুমি শাহেদ ভাইকে খুঁজছু। খুঁজে না পেয়ে বিব্রত বােধ করছ ? কাউকে মুখ ফুটে জিজ্ঞেসও করতে পারছ না।

উনি গােসল করার জন্যে কুয়ােতলায় গেছেন । ডাকবাংলােয় একটা কুয়া আছে, তুমি জান কি-না জানি না কুমার পানি অব পরিষ্কার। শাহেদ ভাই সেই পরিষ্কার পানিতে গা ধুবেন । এই ঠাণ্ডায় কুয়ার পানি? হ্যা। উনার যেহেতু টনসিলের সমস্যা নেই, ঠাণ্ডা পানিতে কিছু হবে না।’ কুয়ার পানিতে গােসলের বুদ্ধি কি তুই দিয়েছিস?” 

শ্রাবণী পা নাচাতে নাচাতে বলল, । গতকাল কুয়ার পানিতে আমি গােসল করে ঠা গিয়েছি। আজ লাগাবেন শাহেদ ভাই। আপা, এখন কি তুমি যাবে? গল্পটা শেষ করতে চাই। তুমি এক কাজ কর, কুয়ার পাড়ে চলে যাও। আমার বারান্দা দিয়ে নামার সিড়ি আছে। এসাে, তােমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি। ‘দেখাতে হবে না।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫

নবনী কি করবে ঠিক ভেবে পেল না। শেষ পর্যন্ত কুয়ালার দিকে রওনা হল । ডাকবাংলাের জায়গাটা অনেক বড়। কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা। পেছনে রীমিত আম কাঠালের বাগান। নবনীরা দু’দিন পার করে দিয়েছে, এখনাে ডাকবাংলাের চারপাশে ভাল করে দেখা হয়নি। সে জানতােই না– এদের কুয়ােতলাও আছে। ডাকবাংলােয় সাধারণত কুয়া থাকে না। 

শাহেদ শােসল শেষ করে হি হি করে কাঁপছে। তার গায়ে মােটা টাওয়েল । শাহেদ একা নয়। ডাকবাংলাের কেয়ারটেকার দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে হারিকেন । মালীও আছে। সে এতক্ষণ পানি তুলে দিচ্ছিল। 

নবনী কুয়ালার পাশে এসে দাঁড়াল। সহজ গলাল বলল, কেমন আছ? 

শাহেদ বলল, খুব খারাপ আছি। শ্রাবণীর কথা শুনে পুরােপুরি বিভ্রান্ত হয়েছি। সে বলেছে কুয়ার পানি গরম। আমি সরল মনে বিশ্বাস করেছি। 

বললেই তাে ওরা গরম পানি করে দিত।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৬

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *