সুরুজ মিয়া নদীর পাড়ে লােক রেখে দিয়েছেন। নৌকা বাঁধা আছে। নৌকায় দু’জন মাঝি। তাদের কাজ হল ডাকবাংলাের দিকে তাকিয়ে থাকা। কাউকে আসতে দেখলেই একজন নৌকায় থাকবে, অন্যজন ছুটে এসে তাকে খবর দেবে। তখন না হয় মিনিস্টার সাহেবকে খবর দেয়া যাবে। ব্যাপারটা হয়ত কিছুই না। আবার হয়ত অনেক কিছু। মই এর ব্যাপারটা ধরা যাক। এমন কিছু না ।
মই দিয়ে ছাদে উঠার শখ বড় মানুষের ছেলেপুলেদের হবেই। কিন্তু মই দিয়ে ছাদে উঠে এই মেয়ে যদি নিচে ঝাপ দেয় তখন অবস্থাটা কি হবে? যে মেয়ে নিশিরাতে নদীর পাড়ে যেতে পারে সে অনেক কিছুই করতে পারে। মেয়েটার মধ্যে পাগলামি আছে। ভাল রকম পাগলামি আছে। সুরুজ মিয়ার ধারণা, মেয়েটার বড়বােনের মধ্যেও আছে। সেই মেয়েও একা একা ঘুরে বেড়ায় । পাগলামি বংশগত ব্যাপার ।
একজনের কারাের থাকলে সবার মধ্যে খানিকটা চলে আসে। মিনিস্টার সাহেবের মধ্যে কি আছে সুরুজ মিয়া এবননা তা ধরতে পারেন নি। তবে খানিকটা আছে বলে মনে হয়। না হলে থানার ওয়ারলেস দিয়ে কেউ খবর পাঠায়— সুন্দর বনের বাঘের সংখ্যা কত? সুন্দর বনের বাঘের সংখ্যা দিয়ে কি হবে? এটা কি একটা জানার বিষয়?
শ্রাবণী সুরুজ মিয়ার সঙ্গে বাগানে হাঁটছে। সুরুজ মিয়া মেয়েটির হাবভাব বােঝার চেষ্টা করছেন। মেয়েটাকে তাে বেশ সহজ স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। ভয় পাওয়ার বােধহয় কিছু নেই। ঐ দিন রাতে নদীর ঘাটে একা একা কেন গিয়েছিল জিজ্ঞেস করে ফেলবেন
—কিরেগে না গেলেই হল। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করতে হবে, যাতে রাগতে না পারে।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১১
‘আম্মা, একটা কথা বলব?”
বলতে ইচ্ছে করলে অবশ্যি বলবেন। সুরুজ মিয়া ইতস্তত করতে লাগলেন। বােধহয় বলাটা ঠিক হবে না। শ্রাবণী বলল, এমন কোন কথা যা বলতে আপনার অস্বস্তি লাগছে?
সুরুজ মিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, ভুলও হইতে পারে। মানুষ মাত্রই ল হয়।
বলে ফেলুন তাে শুনি। এত প্যাচানাের কোন দরকার নেই ।
‘ইয়ে মানে—ব্যাপার হয়েছে কি–পুলিশের সেন্ট্রি আমারে বলল আপনারে না-কি দেখেছে রাত তিনটার দিকে একা একা নদীর পাড়ে গেছেন।
শ্রাবণী সহজ গলায় বলল, ঠিকই দেখেছে। আপনি এটা বলতে এত অস্বস্তি বােধ করছেন কেন?
না মানে গভীর রাত!
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১১
‘গভীর রাত হয়েছে তাে কি হয়েছে? ভরা পূর্ণিমা। ডাকবাংলাের সঙ্গে নদী । ডাকবাংলােয় পুলিশ পাহারা। কাছেই একদল আনসার, ডাকলেই ছুটে আসবে। আমি ভয় পাব কেন?’
না, ভয়ের কিছু নাই।
আমার অবশ্যি খানিকটা ভয়-ভয় করছিল। কিন্তু এত সুন্দর লাগছিল—বালির উপর চাঁদের আলাে। ভাবলাম, কাছে গিয়েই দেখে আসি। আপনার ধারণা কাজটা ভুল হয়েছে?
‘ জিনা, আম্মা। ভুল হয় নাই। তবে স্যার শুনলে রাগ করবেন।’
বাবা শুনেছেন। সকাল বেলায় বাবাকে বলেছি। বাবা রাগ করেননি। শুধু বলেছেন— নেক্সট টাইম এমন ইচ্ছা যদি হয় তাহলে যেন একজন সেন্ট্রি সঙ্গে করে নিয়ে যাই।
সুরুজ মিয়া এখন খানিকটা নিশ্চিন্ত বােধ করছেন। ব্যাপারটা যত জটিল শুরুতে মনে হয়েছিল—এখন দেখা যাচ্ছে তত জটিল নয়।
চেয়ারম্যান চাচা!’ জি আম্মা!’ আপনার বাড়ি এখান থেকে কত দূরে?’ বেশি দূরে না আম্মা। কাছেই। চলুন তাহলে আপনার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসি।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১১
সুরুজ মিয়া হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, শুনে খুবই আনন্দ পেয়েছি আম্মা। কিন্তু স্যারকে না জিজ্ঞেস করে আপনাকে নিতে পারব না। স্যার অনুমতি দিলে একদিন নিয়ে যাব। বাড়ির মেয়েছেলেরাও আপনাকে আর বড় আম্মাকে দেখতে চায়।
শাহেদের ঘুম ভেঙেছে। সে জানালা দিয়ে দেখছে শ্রাবণী এবং টুপি মাথায় বুড়ো ধরনের একজন লােক বাগানে হাঁটছে। শ্রাবণী হাত নেড়ে খুব গল্প করছে। শাহেদের জ্বর শেষ পর্যন্ত আসেনি। শরীর ঝরঝর লাগছে । রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন প্রচণ্ড খিদে বােধ হচ্ছে। শাহেদ বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাত উঁচিয়ে শ্রাবণীকে ইশারা করল। শ্রাবণী এগিয়ে আসছে। তাকে রােগা রােগা লাগছে।
‘গুড মর্নিং, শাহেদ ভাই।’
গুড মনিং শ্রাবণী।’ এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন?
Read More