হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২১

‘এমনিতে বুঝি আমার সঙ্গে গল্প করার সুযােগ পাস না?’ 

উহু, পাই না। রাতে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করার অন্যরকম আনন্দ। আচ্ছা আপা, আজ না-কি তুমি ঐ মাস্টার সাহেবের খোজে গিয়েছিলে?’ 

‘কে বলল?’

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ‘আমি অনুমান করছি। চেয়ারম্যান চাচা বললেন, তুমি বটগাছের কাছে গিয়েছিলে। সেখান থেকে ধারণা করলাম, তুমি নিশ্চয়ই ইংরেজির অধ্যাপকের সন্ধানে গিয়েছ। 

আমি গাছটাই দেখতে গিয়েছিলাম-কারাে সন্ধানে যাইনি।’ 

‘রেগে যাচ্ছ কেন, আপা? সাধারণ কথা বলছি—তুমি রেগে যাচ্ছ। ঐ দ্রলােক সম্পর্কে তােমার এক ধরনের কৌতূহল আছে বলেই আবারাে তুমি বটগাছের কাছে গিয়েছ। তুমি মনে আশা করছিলে যে বটগারে কাছে ঐ ভদ্রলােকের দেখা পেয়ে যাবে। 

‘আমি এমন কিছু ভাবিনি। তুই কি মনের ডাক্তার হয়ে গেছিস?” 

শ্রাবণী হালকা গলায় বলল, আমাদের সমস্যা কি জান আপা? আমরা বেশির ভাগ সময়ই জানি না আমরা কি চাই । যেটা চাই বলে মনে হয়—আসলে সেটা চাই না। তুমি তীব্রভাবে শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গ কামনা করছ। এটা এক ধরনের ভ্রান্তিও হতে পারে। হয়ত তুমি অন্য কিছু চাচ্ছ বুঝতে পারছ না।’ 

নবনী বিরক্ত হয়ে বলল, এইসব কথা তুই কোন উপন্যাস থেকে বলছিস? 

শ্রাবণী খিলখিল করে হেসে ফেলল। নবনী বলল, হাসি বন্ধ কর। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। 

শ্রাবণী আরাে শব্দ করে হেসে উঠল । অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, তােমার রাগ আমি আরাে বাড়িয়ে দিচ্ছি। এই যে শাহেদ ভাইয়ের কথাই ধর। শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, কৃতী এবং সুপুরুষ একজন মানুষ। নিজের ওপর তার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। তার ধারণা, নিজেকে তিনি ভাল করেই জানেন। আসলে কিন্তু জানেন না। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২১

তার মানে কি? ‘আমার ধারণা তােমার চেয়ে আমি—আমি শ্রাবণী চৌধুরী তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চট করে রেগে যেও না আপা প্রমাণ দিচ্ছি। আমি এই শীতের মধ্যে তাকে কুয়াের পানিতে গােসল করতে বললাম, তিনি যথারীতি গােসল করে ঠাণ্ডা বাঁধালেন। আমি বললাম, শাহেদ তাই কুয়ােতলায় চা খেতে খুব ভাল লাগে ।

উনি রেগুলার সেখানে চা খাওয়া শুরু করলেন। বিকেলে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলছিলাম। তুমি চুপচাপ একা বসেছিলে। তিনি তােমাকে ফেলে আমার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেই আনন্দ পাচ্ছিলেন। খেলাটা তাঁর কাছে জরুরি ছিল না। আমার সঙ্গটা অনেক জরুরি ছিল। এই যে তিনি সব কাজকর্ম ফেলে এখানে ছুটে এলেন তার পেছনে তােমার যতটা ভূমিকা, আমার ধারণা আমার নিজের ভূমিকা অনেক বেশি।’ 

নবনী বলল, তাের জ্বর অনেক বেড়েছে। তুই অসুস্থ মেয়ের মত কথা বলছিস। এসব সুস্থ কোন মেয়ের কথা না। এসব হল বিকারগ্রস্ত মেয়ের কথা। সমস্যা শাহেদের , সমস্যা তাের। 

শ্রাবণী হাই তুলতে তুলতে বলল, আমার কোনই সমস্যা নেই, আপা। আমার সমস্যা থাকলে এত সহজে এসব কথা তােমাকে বলতে পারতাম না। সমস্যা কোথায় আমি তােমাকে ধরিয়ে দিলাম। আমি যা বলছি তা যে জ্বরের ঘােরে অসুস্থ হয়ে বলছি তাও কিন্তু না। আমি যা বলছি তা প্রমাণ করে দিতে পারব। কি ভাবে?’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২১

কাল আমাদের তিনজনের পাখি শিকারে যাবার কথা। শেষ মুহূর্তে আমি বলব, যান না। তখন দেখবে শাহেদ ভাই বলবেন, থাক, বাদ দাও। যাওয়া বাতিল হয়ে যাবে। 

নবনী ক্ষীণ স্বরে বলল, তুই এমন সব অদ্ভুত কথা বলছিস কেন রে শ্রাবণী? তাের কি হয়েছে? 

আমার কিছুই হয়নি, আপা। যা সত্যি আমি তাই বলছি।’ 

যা সত্যি তা তুই বলছিস না । দিনরাত গল্পের বই পড়ে পড়ে তাের মাথা অন্য রকম হয়ে গেছে । তুই বানিয়ে বানিয়ে প্রচুর মিথ্যা কথা বলছিস। এখানে কোন ইংরেজ মহিলার কবর নেই। তুই আমাকে বললি, কবর আছে—আমি খােজ নিলাম… 

নবনী থেমে গেল। আর কথা বলা অর্থহীন। শ্রাবণী ঘুমিয়ে পড়েছে। 

নবনী খুব ভােরে ঘর থেকে বের হল । শ্রাবণী তখনাে ঘুমুচ্ছে। কোলবালিশ জড়িয়ে এলােমেলাে হয়ে শুয়ে আছে। তার শােয়া দেখে মনে হবে বাচ্চা একটা মেয়ে। প্রচণ্ড শীতেও গায়ে কখনাে লেপ থাকে না। ভােরবেলার দিকে খুব শীত পড়ে। আজো পড়েছে। শ্রাবণীর গায়ে লেপ নেই। কোলবালিশ জড়িয়ে সে শীতে কাঁপছে । ঘর থেকে বের হবার সময় নবনী ছােট বােনের গায়ে লেপ তুলে দিল। কেমন বাচ্চাদের মত ঘুমিয়ে থাকে। বড় মায়া লাগে। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২১

নবনীর নিজেরও শীত লাগছে। শাড়িটা ভালমত গায়ে জড়িয়ে সে ডাকবাংলাের মূল বারান্দায় চলে এল। শাহেদ বারান্দায় বসে আছে। এত ভােরে সে কখনাে ওঠে না। শাহেদ নবনীকে দেখে খুশি-খুশি গলায় বলল, গুড মর্নিং প্রিন্সেস। নবনী বলল, গুড় মনিং । 

শাহেদ বলল, আজ কেন জানি ভাের পাঁচটার সময় ঘুম ভেঙে গেছে। তারপর হাজার চেষ্টা করেও ঘুম আসে না। শেষমেষ বারান্দায় এসে বসে আছি। কি প্রচণ্ড কুয়াশা হয়েছে। দেই? 

হ্যা, খুব কুয়াশা।’ 

আজ তাে আবার স্পিড বােটে করে বেড়াতে যাবার কথা। কুয়াশা না কাটলে যাব কিভাবে? রওনা হতে অনেক দেরি হবে।’ 

নবনী কিছু বলল না। শাহেদ বলল, তােমার ঘুম ভেঙেছে, ভাল হয়েছে। চল কুয়াশার মধ্যে হেঁটে আসি। মনিং ওয়াক। তার আগে আমাকে চা খেতে হবে। নবনী, চা বানাতে পারবে? 

পারব না কেন?’

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২২

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *