এ জাতীয় বই পড়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। ‘তুমি আমাকে চেন?
মেয়েটি হেসে ফেলে বলল, আপনাকে কেন চিনব না? আমি কি এই পৃথিবীর মেয়ে না ?
কি নাম তােমার ? ‘আমার নাম নুহাশ। ‘পড়াশােনা কর?” ‘না। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির ক্যাটালগার। ‘পটে প্রচুর কফি আছে। তুমি ইচ্ছা করেলে কফি খেতে পার। ‘ধন্যবাদ স্যার।
নুহাশ সাবধানে কফি ঢালল। কফির পেয়ালায় ছােট ছােট চুমুক দিচ্ছে। ফিহার শুরুতে মনে হয়েছিল এই মেয়েটির চেহারা বিশেষত্বহীন। এখন তা মনে হচ্ছে না। এর চেহারায় এক ধরনের মায়া আছে যা মানুষকে আকর্ষণ করে। ফিহার ভুরু কুঁচকে গেল। তার চিন্তায় ভুল হচ্ছে। মায়া’ আবার কি? মায়া তৈরি হয় কিছু। বিশেষ বিশেষ কারণে। এই মেয়েটির মধ্যে বিশেষ কারণের কি কি আছে? মেয়েটি কফি শেষ করে রুমালে ঠোট মুছতে মুছতে বলল, এত জঘন্য কফি আমি স্যার জীবনে খাইনি।
ফিহা হেসে ফেললেন। মেয়েটা সত্যি কথা বলেছে। মেয়েটির উপর মায়া তৈরি হবার একটি কারণ পাওয়া গেল, তার মধ্যে সারল্য আছে। আরেকটি জিনিস আছে – মেয়েটি লাজুক কিন্তু আত্ম বিশ্বাসী। লাজুক মানুষের আত্মবিশ্বাস কম থাকে।।
‘স্যার আমি যাই? বইটা কি আপনি রাখবেন? ‘না। আমি আবর্জনা পড়ি না। ‘পড়তে হবে না স্যার। শুধু আপনি বইটা হাতে নিন। আপনি বইটা হাতে নিলে
আমার ভাল লাগবে। আরফব আমার খুব প্রিয় লেখক।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
ফিহা কঠিন গলায় বললেন, বারবার এক ধরনের কথা বলতে আমার ভাল লাগে না। তােমাকে তাে একবার বলেছি এই আবর্জনা আমি হাত দিয়ে হেঁব না।।
নুহাশের মুখ কাল হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ চোখ ভিজে গেল। দেখেই মনে হচ্ছে মেয়েটা তার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছে। এতটা রূঢ় তিনি না হলেও পারতেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের উপর দখল কমে আসছে। এটা ভাল কথা না। এই মেয়েটির একজন প্রিয় লেখক থাকতেই পারে। মেয়েটির প্রিয় লেখক যে তারও প্রিয় হতে হবে এমন তাে কথা নেই।
‘স্যার আমি যাই? আপনাকে বিরক্ত করে থাকলে ক্ষমা চাচ্ছি।
মেয়েটা ঘর ছেড়ে যাচ্ছে। যে ভাবে ছুটে যাচ্ছে তাতে মনে হয় অবধারিতভাবে দরজার সঙ্গে ধাক্কা খাবে। হলও তাই। মেয়েটা দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেল।
পদার্থবিদ মহামতি ফিহা কাগজে বড় বড় করে লিখলেন, কফি পান করে তৃপ্তি পেয়েছি। নিচে নাম সই করলেন। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন কমিউন অফিসের দিকে। কমিউন কর্মাধ্যক্ষ মারল লি’র সঙ্গে তার আজ দেখা করার কথা। এপয়েন্টমেন্ট ছিল সকাল এগারােটায়। এখন বাজছে সাড়ে এগারাে। আধ ঘণ্টা দেরি।
তার জন্যে মারলা লি বিরক্ত হবেন না। বরং মধুর ভঙ্গিতে হাসবেন। মারলা লি একজন মেন্টালিস্ট। মেন্টালিস্টরা কখনাে বিরক্ত হয় না। আজ পর্যন্ত শুনা যায়নি কোন মেন্টালিস্ট উঁচু গলায় কথা বলেছে বা বিরক্তি প্রকাশ করেছে। পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতা যাদের হাতে তাদের বিরক্ত হবার প্রয়ােজন নেই।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
ফিহাকে সরাসরি মারলা লি’র ব্যক্তিগত ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। ঘরটা অন্ধকার। জানালার ভারি পর্দা টান টান করে বন্ধ করা। দিনের বেলাতেও ঘরে আলাে জ্বলছে। সে আলাে যথেষ্ট নয়। ফিহা লক্ষ্য করেছেন সব মেন্টালিস্টদের ঘরই খানিকটা অন্ধকার। সম্ভবত এর আলাে সহ্য করতে পারে না। কিংবা এদের আলাের তেমন প্রয়ােজন নেই।
ফিহা বললেন, আমি বােধহয় একটু দেরি করে ফেললাম।
মারলা লি হাসলেন। মেন্টালিস্টদের মধুর হাসি। উঠে দাড়িয়ে মাথা নিচু করে বিনয় এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেন।
‘আপনি এসেছেন এতেই আমি ধন্য। আপনার জন্যে খাটি কফি তৈরি করা আছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের স্বাদহীন কফি নয়, ভাল কফি।
‘আমি কফির প্রয়ােজন বােধ করছি না।
ফিহার মুখের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। মেন্টালিস্টদের সামনে বসলেই এ রকম হয়। মুখের ভেতরটা শুকিয়ে যায়। জিভ হয়ে যায় কাগজের মত। এটা তাঁর একার হয় না সবারই হয়, তা তিনি জানেন না। তিনি প্রচণ্ড রকম ক্রোধ এবং ঘৃণা নিয়ে মারলা লি’র দিকে তাকালেন। মানুষটা শান্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে অথচ এর মধ্যেই জেনে গেছে তিনি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কফি খেয়ে এসেছেন।
মেন্টালিস্টরা তার মাথা থেকে যাবতীয় তথ্য কত সহজে বের করে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ তিনি তাদের কিছুই জানতে পারছেন না। মারলা লি এই মুহূর্তে কি ভাবছে তা তিনি জানেন না। অথচ সে জানে তিনি কি ভাবছেন। এরা মেন্টালিস্ট। এদের কাছ থেকে কিছুই গােপন করা যায় না। এরা কোন এক বিচিত্র উপায়ে অন্যের মাথার ভেতর থেকে সমস্ত তথ্য বের করে নিতে পারে। পদ্ধতিটি টেলিপ্যাথিক। তা কি করে কাজ করে ফিহা জানেন না।
মারলা লি বললেন, মহামতি ফিহা, আপনি কি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত ?
‘আমি চিন্তিত কি-না তা প্রশ্ন করে জানার দরকার নেই। আপনি কি আমার মাথার ভেতরটা খােলা বই-এর মত পড়ে ফেলতে পারছেন না?
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
মারলা লি হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, আপনার ধারণা সঠিক নয় মহামতি ফিহা। আমরা সারাক্ষণ অন্যের মাথার ভেতর বসে থাকি না। অন্যের ভুবনে প্রবেশ করা স্বাধীনতা হরণ করার মত। আমরা ব্যক্তি-স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি আপনাকে কথা দিতে পারি যে এখানে আসার পর থেকে আমি আপনার মাথা থেকে কিছু জানার চেষ্টা করিনি।
কিছু জানার চেষ্টা করেন নি ?” ‘না’
‘তাহলে কেন বললেন যে আপনার কাছে ভাল কফি আছে। ভূমধ্যসাগরীর অঞ্চলের বাজে কফি না। এটা বলতে হলে আপনাকে জানতে হবে যে কিছুক্ষণ আগেই আমি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাজে কফি খেয়েছি।”
‘মহামতি ফিহা, এটা বলার জন্যে আপনার মস্তিষ্কে ঢােকার প্রয়ােজন পড়ে না। রেস্টুরেন্টগুলিতে এখন ভূমধ্যসাগরীয় কফি ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। কমিউন কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে আমি জানি কখন কোথায় কি পাওয়া যায়। আপনার কাছে কি আমার কথা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে?”
ফিহা চুপ করে রইলেন, কারণ কথাগুলি তাঁর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে।
মারলা লি চেয়ারে হেলান দিতে দিতে বললেন, আপনাকে আরেকটা কথা বলি। আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে মেন্টালিস্টর সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। আপনি আমার অফিসে ঢুকলেন প্রচণ্ড রাগ নিয়ে। আমি ইচ্ছা করলেই মানসিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আপনার রাগ কমিয়ে দিতে পারতাম। তা কি আমি করেছি ? করি নি।
ফিহা বললেন, এই প্রসঙ্গ থাক। কি জন্যে আমাকে তলব করা হয়েছে বলুন। আমার হাতে সময় বেশি নেই।
‘আপনাকে তলব করা হয়নি মহামতি ফিহা। এত স্পর্ধা আমার নেই। আমি নিজেই যেতাম আপনার কাছে। কিন্তু আপনি জানিয়ে দিয়েছেন আপনার বাড়ির এক হাজার গজের ভেতর যেন কোন মেন্টালিস্ট না যায়। আমরা আপনার ইচ্ছাকে আদেশ বলে মনে করি। সে কারণেই প্রয়ােজন হলেও আপনার কাছে যাই না। অতি বিনীত ভঙ্গিতে আপনাকে আসতে বলি। আশা করি আমাদের এই ধৃষ্টতা আপনি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন।
‘ক্লান্তিকর দীর্ঘ বিনয় বাক্য আমার পছন্দ নয়। যা বলতে চান বলুন !” ‘বলছি। তার আগে একটু কফি দিতে বলি? ‘বলুন।
Read More