নিজের কাজ ছাড়া অন্য কিছু প্রায় জানে বললেই হয়। একটি রােবটের দায়িত্ব হচ্ছে ঘর গুছিয়ে রাখা এবং রান্না করা। তার নাম লীম। লীম দিনরাত এইটি করে। খুব যে ভাল করে তাও না। রান্নায় লবণের পরিমাণ কখনােই ঠিক হয় না। বাকি দুটি রােবটের একটির কাজ বাড়ি পাহারা দেয়া। সে ক্রমাগত বাড়ির চারদিকে হাঁটে। তৃতীয় রােবটের কোন কাজকর্ম নেই।
এই রােবটটি ‘PR” টাইপের। বুদ্ধিবৃত্তি বাকি দু’জনের মত নিচের দিকে নয় বরং বেশ ভাল। ফিহা তাকে কিনেছিলেন নিজের কাজ সাহায্য করার জন্যে। শেষটায় মত বদলেছেন। রােবটের সাহায্য তাঁর কাছে অপ্রয়ােজনীয় বলে মনে হয়েছে। এখন রােবটটার কাজ হচ্ছে দিনরাত বারান্দায় বসে বই পড়া। ফিহা একে খানিকটা পছন্দ করেন। পাঠক’ নামে ডাকেন। মাঝে মধ্যে ডেকে কথাবার্তা বলেন। PR’ টাইপের রােবটের বড় ত্রুটি হচ্ছে এরা গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। অপ্রয়ােজনে দীর্ঘ বাক্য বলে। কথা বলতে এরা পছন্দ করে। ফিহা বাইরে থেকে এলে চেষ্টা করবে একগাদা কথা বলতে।।
আজ ফিহা গেট দিয়ে ঢুকতেই সে এগিয়ে গেল এবং একঘেঁয়ে গলায় বলল, স্যার আজ আপনি দু’ ঘণ্টা একত্রিশ মিনিট বাইশ সেকেণ্ড বহরে কাটিয়েছেন। ন’ তারিখ আপনি বাইরে ছিলেন। সেদিন আপনি ছিলেন এক ঘণ্টা চল্লিশ সেকেণ্ড। আবার তিন তারিখে
‘চুপ কর।
পাঠক চুপ করে গেল। তবে তাও অল্প কিছুক্ষণের জন্যে। ফিহার পেছনে পেছনে আসতে আসতে বলল, স্যার, আপনার কি মনে আছে কাল রাতে আপনি। বাগানে এসে বললেন, “আজ তাে আকাশে অনেক তারা।” আপনার কথা শােনার পর আমি সিদ্ধান্ত নেই কোন সময় আকাশে তারা বেশি দেখা যায় তা বের করব। বের করতে গিয়ে পড়াশােনা করেছি এবং কিছু মজার তথ্য
ফিহা দ্বিতীয়বার বললেন, চুপ কর।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি জানেন পাঠক চুপ করবে না। তবে অসুবিধা নেই। তিনি এখন তাঁর শােবার ঘরে ঢুকে যাবেন। পাঠক শোবার ঘরে ঢুকবে না। তাকে সে অনুমতি দেয়া হয় নি। সে খাবার ঘরে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করবে ফিহার জন্যে। ফিহার দেখা পেলে কোন একটা আলাপ শুরুর চেষ্টা করবে। ফিহা ঠিক করলেন তাকে এই সুযােগ দেবেন না। শোবার ঘর থেকে বের হবেন না। তাঁর মন বেশ খারাপ। খেতেও ইচ্ছা করছে না। মেন্টালিস্টদের সঙ্গে কথাবার্তা বললেই তাঁর মেজাজ আকাশে চড়ে যায়।
শােবার ঘরের চেয়ারে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে তিনি মত বদলালেন। নিজেকে কষ্ট দেবার কোন মানে হয় না। খাওয়া-দাওয়া করা যেতে পারে। পাঠকের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পও করা যায়। বেচারা গল্প করতে পছন্দ করে। গল্প করার সঙ্গি নেই।
ফিহা খাবার ঘরে ঢুকলেন ।
পাঠক সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি কি কথা বলতে পারি স্যার? ‘না’
ফিহা খেতে বসলেন। আজও লবণ কম হয়েছে। শুধু কম না, বেশ কম। অথচ দুদিন আগে প্রতিটি খাবারে অতিরিক্ত লবণ ছিল। এই রােবটটা মনে হয় বদলানাে দরকার। ফিহা বিরক্ত মুখে বললেন, লবণের জন্যে তাে কিছু মুখে দিতে পারছি না।
তুমি কি লবণের ব্যাপারটা কিছুতেই ঠিক করতে পারবে না?
লীম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে তার কিছু বলার নেই। পাঠক বলল, লবণ প্রসঙ্গে আমি কি একটা ছােট্র কথা বলতে পারি স্যার?
‘না।”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
আপনার নিষেধ অগ্রাহ্য করেই কথাটা বলার ইচ্ছা হচ্ছে, যদিও জানি তা সম্ভব । আপনাকে আবারো অনুরােধ করছি লবণ সম্পর্কে আমাকে কথাটা বলতে দিন।
‘বল।’
‘আমাদের রােবট লীম লবণের পরিমাণে কোন ভুল করে না। সমস্যাটা আপনার।
‘সমস্যা আমার মানে ?
‘আপনার যখন মন-টন ভাল থাকে, তখন আপনি লবণ কম খান। আবার যখন মেজাজ খারাপ থাকে লবণ বেশি খান। আমি দীর্ঘ দিন পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছি। মনে হয় মেজাজ খারাপ থাকলে আপনার শরীর বেশি ইলেকট্রোলাইট চায়। শরীরবিদ্যার কোন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করা যায়। আমি চারজন বিশেষজ্ঞের ঠিকানা জোগাড় করেছি। আপনি কি কথা বলতে চান ?
কথা বলতে চাই না। ‘বাইরে গেলেই আপনার মেজাজ খারাপ হয় এর কারণ কি?
ফিহা জবাব দিলেন না। পাঠক বলল, মেন্টালিস্টদের নিয়ে আপনি কি খুব বেশি চিন্তা করেন?
‘না। তুমি কথা বলা বন্ধ কর।।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে যদি আপনার খারাপ লাগে তাহলে অন্য বিষয়ে কথা বলি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্মরহস্য নিয়ে কি স্যার আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করব?
‘পাঠক!’
‘জ্বি স্যার। ‘তােমার কথা বলার জন্যে কি একজন সঙ্গি দরকার?
পাঠক প্রথমবারের মত প্রশ্নের জবাব দিল না। মনে হচ্ছে সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে। ফিহা বললেন, নুহাশ নামে একজন তরুণীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। শতকরা কুড়িভাগ সম্ভাবনা সে এ বাড়িতে আসবে। যদি আসে তুমি কথা বলার সঙ্গি পাবে।
‘আমি স্যার শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলাতেই আগ্রহ বােধ করি। ‘কেন ?
‘আমি চিন্তা করছি আপনার একটা জীবনী লিখব। জীবনী লেখার জন্যে আপনার সম্পর্কে অনেক তথ্য প্রয়ােজন। তথ্য তেমন কিছু নেই। তাই সারাক্ষণ কথা বলতে চেষ্টা করি, যদি কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে কোন তথ্য পেয়ে যাই।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘কিছু পেয়েছ ?” ‘জি স্যার। “কি পেলে ?” ‘আমি যে অল্প কয়েক পাতা লিখেছি আপনি কি পড়তে চান ? ‘না।
‘আপনার জীবনী গ্রন্থে আমি উল্লেখ করেছি যে ‘না’ শব্দটা আপনার প্রিয়। যখন তখন আপনি ‘না’ বলেন। মাঝে মধ্যে কিছু না ভেবেই বলেন। জীবনী গ্রন্থের শুরুটা একটু দেখে দিলে ভাল হয়। অনেক মজার মজার জিনিস সেখানে আছে। যেমন ধরুন, শুরুতেই একটা চমক আছে। পাঠক শুরুর কয়েকটি লাইনটি পড়েই চমকে উঠবে —
‘শুরুটা কি?
‘শুরু হচ্ছে – মহামতি ফিহা বড় হয়েছেন একটি মেন্টালিস্ট পরিবারে। এই পরিবারটি ফিহাকে অনাথ আশ্রম থেকে তুলে নিয়েছিলেন। পরম আদর এবং মমতায় ফিহাকে তাঁরা লালন পালন করেন। অসাধারণ প্রতিভাধর এই বালকটির প্রতিভার পূর্ণ বিকাশে মেন্টালিস্ট পরিবারের ভূমিকাকে ছােট করে দেখার কোন উপায় নেই। বার বছর বয়সে ফিহা ঐ মেন্টালিস্ট পরিবার ছেড়ে চলে আসেন। পরবর্তি সময়ে কোন দিনও তিনি তাঁর পালক পিতা-মাতার সঙ্গে যােগাযােগ করেন
নি।
পাঠক থামল। ফিহা মূর্তির মত বসে আছেন। পাঠক বলল, আমি কি কোন
ভুল তথ্য দিয়েছি স্যার?
Read More