‘না। সব ঠিকই আছে। ‘জীবনী গ্রন্থের ভাষাটা আপনার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?” ‘ভাষার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
আমি জীবনী গ্রন্থটি কয়েক ধরনের ভাষা ব্যবহার করে লিখেছি। একই জিনিস খুব কাব্যিকভাবেও লিখেছি। যেমন

ফিহা উঠে পড়লেন। পাঠকও উঠে দাঁড়াল। ফিহা বললেন, পাঠক, তুমি আমার মেন্টালিস্ট বাব-মা’র সঙ্গে যােগাযােগ করবে। বলবে, আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
‘এটা তাে স্যার সম্ভব না। আমি চেষ্টা করেছিলাম। তাদের একটা ইন্টাভু নেয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ভূগর্ভস্থ মেন্টালিস্টরা সবার যােগাযােগের বাইরে।
ফিহা শােবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। অস্থির ভাব আবার ফিরে এসেছে। শুধু ফিরে এসেছে তাই না। দ্রুত বাড়ছে। তিনি এই অস্থিরতার ধরন জানেন। এ অন্য ধরনের অস্থিরতা। ঘুমের অষুধ খেয়ে তিনি কি নিজেকে শান্ত করবেন ? না, তার প্রয়ােজন নেই। অস্থিরতার প্রয়ােজন আছে। তিনি সময় সমীকরণের খুব কাছাকাছি আছেন।
তিনি জানেন তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করছে। সমীকরণের সমাধান অবচেতন মনের কাছে চলে এসেছে। চেতন মন বা তাঁর জাগ্রত সত্তা সেই সমাধান এখনাে পায় নি। তবে পেয়ে যাবে। খুব শিগগিরই পেয়ে যাবে। এখন প্রয়ােজন নিজেকে শান্ত রাখা। সর্বযুগের সর্বকালের সবচে বড় আবিষ্কারটির মুখােমুখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
সময় সমীকরণের সমাধান।। | এর ফলাফল কি হবে ? মানবজাতি কি উপকৃত হবে? না ধ্বংস হয়ে যাবে ? এই মুহুর্তে তা বলা যাচ্ছে না। কিছু ব্যাপার আছে যা আগে বলা যায় না, যার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। মেন্টালিস্টদের কথাই ধরা যাক।
মেন্টালিস্ট তৈরি করা হয়েছিল যে উদ্দেশ্যে তা সফল হয় নি। মানবজাতি আজ দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে প্রচণ্ড মানসিক ক্ষমতাধর মেন্টালিস্ট। অন্যদিকে মানসিক ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ। এই সাধারণ মানুষদের নিয়ন্ত্রিত করছে মেন্টালিস্টরা। সাধারণ মানুষ তাদের হাতের পুতুলের মত। হাসতে বললে হাসতে হবে, কাঁদতে বললে কাঁদতে হবে। তারা বাধ্য করবে। সেই ক্ষমতা তাদের আছে। তারা এগুচ্ছে খুব ঠাণ্ডা মাথায়। পুরো মানবগােষ্ঠিকে মেন্টালিস্ট বানানােই তাদের পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা কিছুতেই শুভ হতে পারে না। প্রকৃতি
মানবগােষ্ঠি চায় নি। এটা একটা কৃত্রিম ব্যবস্থা। | ফিহা কমুনিকেটর-এ হাত রাখলেন। কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। একজন মেন্টালিস্টের সঙ্গে কথা বলা দরকার। যে-কেউ হতে পারে। মারলা লি’র সঙ্গেই কথা বলা যায়। | মারল। লি বিস্মিত গলায় বললেন, গভীর রাতে আপনি? কি ব্যাপার মহামতি ফিহা ?”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘রাত কি খুব বেশি হয়েছে?” ‘মন্দও হয়নি। এগারােটা বাজে। ‘আমি কি আপনাকে ঘুম থেকে তুললাম?
‘বিছানা থেকে তুললেন। আমি বিছনায় শুয়ে শুয়ে অনেকরাত পর্যন্ত পড়ি।। আপনার মত আমারাে রাত জাগা স্বভাব। কি ব্যাপার জানতে পারি ?
‘মেন্টালিস্টদের সম্পর্কে আমি কিছু পড়াশােনা করতে চাই।‘ ‘ও আচ্ছা।
‘আপনি কি এই বিষয়ে বইপত্র দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারেন? বইপত্র নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে আছে।‘
‘আছে। কিন্তু মহামতি ফিহা, এইসব বইপত্র আমাদের জন্যে। যারা মেন্টালিস্ট নয় তাদের কাছে বইপত্র দেয়া নিষেধ আছে।
‘নিষেধ আছে বলেই আপনার কাছে চাচ্ছি।
‘আপনার বিষয় পদার্থবিদ্যা। পড়াশােনা সেই বিষয়ে সীমিত রাখাই কি ভাল নয় ?
‘তার মানে কি আপনি আমাকে বই দিতে পারবেন না ? ‘আপনি চেয়েছেন, অবশ্যই আপনাকে দেয়া হবে।‘ | ফিহা বললেন, ধন্যবাদ। আমি কম্যুনিকেটর বন্ধ করে দেব। তার আগে একটি জিনিস জানতে চাই। মেন্টালিস্ট সমাজের সবচে’ দুর্বল দিক কি ?
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমাদের কোন দুর্বল দিক নেই।
‘ভুল বললেন। আপনাদের সমাজের সবচে’ দুর্বল দিক হচ্ছে এই সমাজে কোন সৃষ্টিশীল মানুষ নেই। আপনাদের কোন বিজ্ঞানী নেই, কবি নেই, গল্পকার নেই, শিল্পী নেই . আমি কি ভুল বললাম?
‘না ভুল বলেন নি। তবে . ‘তবে কি ?
‘আজ থাক। অন্য সময় এই নিয়ে কথা বলব। শুভ রাত্রি মহামতি ফিহা। আমি মেন্টালিস্টদের নিয়ে লেখা ছােট্ট একটা বই পাঠাব। বইটা পড়ার পর আপনার আর কিছু পড়তে ইচ্ছা করবে না। বইটা কাল ভােরে পাঠালে কি হয় ?
‘আজ রাতে পাঠাতে পারবেন? ‘অবশ্যই পারব। ‘আরেকটি কথা। ‘বলুন।
‘আমি যদি বিয়ে করতে চাই তাহলে কি আপনাদের অনুমতির প্রয়ােজন আছে ?
‘আপনার জন্য নেই। আপনি কি বিয়ের কথা ভাবছেন?
ফিহা কমুনিকেটর বন্ধ করে দিলেন। নিজের উপর রাগ লাগছে। শুধু শুধু এই কথা বলার প্রয়ােজন ছিল না। হ
মারলা লি বিছানা থেকে নামলেন। কাপড় পাল্টালেন। গাড়ি বের করতে বললেন। রােবট নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নয় – নিজে চালাবেন এমন গাড়ি। গভীর রাতে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে ; গাড়ি চালানােয় আনন্দ আছে।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
আজ রাস্তাঘাট অন্যসব রাতের চেয়েও ফাঁকা। বিজ্ঞান পল্লী ‘ধী ১১’-র মানুষজন মনে হয় আতংকগ্রস্ত। বিক্ষিপ্ত ভাবে নানান জায়গায় মেন্টালিস্টদের সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে। মানুষজন রাস্তায় বেরুচ্ছে না।
মারল। লি গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে চলে এলেন। হাইওয়ের পেট্রল পুলিশের গাড়ি জায়গায় জায়গায় থেমে আছে। পেট্রল পুলিশকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।
মারলা লি’র গাড়ির ড্যাসবাের্ডে জরুরী সংবাদজ্ঞাপক লাল বোতাম দু’টি ক্রমাগত জ্বলছে নিভছে। জরুরী কোন খবর আছে। জরুরী খবর শুনতে ইচ্ছা করছে না। তবু অভ্যাসের বসে বােতাম টিপে দিলেন। আবহাওয়া দপ্তর ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক সতর্ক সংকেত প্রচার করছে। ঘূর্ণিঝড়টির বিজ্ঞান পল্লী ‘ধী-১১-র উপর দিয়ে উড়ে যাবার একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সর্তক ব্যবস্থা হিসেবে পদার্থবিদ্যা গবেষণাগারের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মারলা লি’র ভুর, কুঞ্চিত হল।
Read More