ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

আমার মন খারাপ হয়ে যায়। 

‘ওদের সঙ্গে দেখা না করলেই পারেন।

ফিহা সমীকরণদেখা না করেও কি ওদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় আছে? এই মুহূর্তে আমরা দু’জন যে কথা বলছি তা কি মেন্টালিস্টরা শুনছে না?” 

‘নুহাশ ক্ষীণ স্বরে বল, খুব সম্ভব শুনছে। 

‘আমার প্রায়ই ইচ্ছা করে আমরা সাধারণ মানুষরা পৃথিবীর কোন এক নির্জন প্রান্তে চলে যাই। আমাদের নিজেদের একটি দেশ হােক। স্বাধীন দেশ। 

নুহাশ কঠিন গলায় বলল, এ জাতীয় কথা আর কখনাে বলবেন না। যারা এ জাতীয় কথা বলেছে বা ভেবেছে তাদের ভয়াবহ শাস্তির কথা কি আপনি জানেন 

ফিহা চুপ করে গেলেন। হ্যা, এই অপরাধের শাস্তির কথা তিনি জানেন। শাস্তি একটিই – জেল নয়, মৃত্যুদণ্ড নয় — মানসিকতা হরণ। অপরাধীর মাথা থেকে সমস্ত স্মৃতি নষ্ট করে দেয়া হয়। অপরাধী তখন পৃথিবীতে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর মতই হয়ে যায়। সে কিছুই জানবে না। সব তাকে নতুন করে শিখতে হয়। সে হাঁটতে শেখে, কথা বলতে শেখে। এই শাস্তির চেয়ে মৃত্যুদণ্ড অনেক সহজ শাস্তি। 

খাওয়া শেষ না করেই ফিহা উঠে পড়লেন। তাঁর আর খেতে ইচ্ছা করছে না। নুহাশ বলল, আপনার কি শরীর খারাপ করছে? 

‘না। তুমি ঘুমুতে যাও আমি কাজ রব। ‘কি কাজ করবেন ? ‘অংকের একটা মডেল তৈরি করার চেষ্টা করছি। ওটা শেষ করব। ‘আজ না করলে হয় না? 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

‘না, হয় না নুহাশ, এই জিনিসটা আমার মাথায় ঘুরছে, এটা শেষ না করে অন্য কোন কিছুতেই আমি মন দিতে পারব না।” 

‘আপনি যখন কাজ করবেন তখন আমি কি আপনার পাশে বসে থাকতে পারি ? 

‘না, পার না। তুমি রাগ করো না নুহাশ। ‘আমি রাগ করি নি। তবে আপনাকে একটা কথা দিতে হবে – ফিহা বিস্মিত হয়ে বললেন, কি কথা? ‘রাতে আপনি যখন ঘুমুতে আসবেন তখন আমি আপনাকে একটা গল্প পড়ে 

শুনাব। অতিপ্রাকৃত গল্পগুচ্ছ থেকে একটা গল্প। আপনাকে সেই গল্প শুনতে হবে। 

‘আমি কখন ঘুমুতে আসি তার তাে ঠিক নেই . 

নুহাশ লজ্জিত গলায় বলল, যত রাতই হোক। আমি জেগে থাকব আপনার জন্যে। 

ডাটা এন্ট্রির মাঝপথে আবারাে বাধা পড়ল। কমুনিকেটরে যােগাযােগ করলেন মারলা লি। 

‘মহামতি ফিহা। ‘কথা বলছি। ‘গভীর রাতে আপনাকে বিরক্ত করছি বলে দুঃখিত। 

কি বলবেন বলুন। ‘আপনি আপনার পালক বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ 

‘আপনি বলেছিলেন ব্যবস্থা করা যাবে না। 

‘এখন করা হয়েছে। এঁরা দুজনই গুরুতর অসুস্থ। মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছেন। মৃত্যুপথযাত্রী মেন্টালিস্টদের শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়। এঁরা দু’জন আপনাকে দেখতে চাচ্ছেন। আপনি কি আসবেন?” 

‘আমি এক্ষুণি আসছি। ‘আপনার গেটের কাছে গাড়ি থাকবে। 

ফিহা পাঠকের দিকে তাকালেন। পাঠক বলল, আমার মনে হয় আজ রাতে কাজটা করতে পারব না। 

‘আমারাে তাই মনে হচ্ছে। নুহাশের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে হবে। সে আমাকে কি এক গল্প না-কি পড়ে শুনাবে। 

‘আপনি কখন ফিরবেন?’ 

‘বুঝতে পারছি না কতক্ষণ লাগবে। তাড়াতাড়িই ফিরতে চেষ্টা করব। এখন কটা বাজে? 

‘রাত তিনটা। ভাের হবার বেশি বাকি নেই। ফিহা বাড়ি থেকে বের হলেন। নুহাশকে কিছু বলে গেলেন না। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

চল্লিশ বছর পর ফিহা তার পালক পিতামাতাকে দেখলেন। ঘরে এই দু’জন ছাড়া অন্য কেউ নেই। প্রশস্ত একটি খাটে দু’জন বসে আছেন। দু’জনকেই চূড়ান্ত রকমে অসুস্থ বলে মনে হচ্ছে। দেখেই মনে হচ্ছে এঁরা মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছেন। মানুষ না কংকাল, জ্বলজ্বলে চোখ ছাড়া এদের যেন কিছুই নেই। ঘর প্রায় অন্ধকার। অস্পষ্টভাবে সব কিছু চোখে আসে। 

ফিহা বললেন, আপনারা কেমন আছেন? 

দু’জনই এক সঙ্গে ফিহার দিকে তাকালেন। বৃদ্ধ হাতের ইশারায় ফিহাকে পাশে বসতে বললেন। ফিহা বললেন, আপনার কি কথা বলার মত শক্তি আছে ? 

দু’জনই একত্রে হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন। কিন্তু কোন কথা বললেন না। 

ফিহা বললেন, আমার শৈশব আপনারা আপনাদের ভালবাসায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। আপনাদের ছেড়ে চলে এলেও আমি সেই ভালবাসার কথা ভুলি নি। আমার সবচে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটির নাম করণ করা হয়েছে আপনার নামে। মিরাণ ফাংশান। 

বৃদ্ধ মিরাণ আবার মাথা নাড়লেন, আবার হাত ইশারা করে পাশে বসতে বললেন। ফিহা বসলেন না। 

দাঁড়িয়ে রইলেন। দু’জনকে দেখে তীব্র কষ্ট হচ্ছে। এতটা কষ্ট তাঁর হবে তা কখনাে কল্পনা করেননি। তাঁর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কোমল গলায় বললেন, যতদিন পদার্থবিদ্যা বেঁচে থাকবে আপনার নাম বেঁচে থাকবে। আমি আপনাদের ছেড়ে এসেছি কিন্তু আপনাদের ভালবাসার অমর্যাদা করি নি। আমি মেন্টালিস্টদের ঘৃণা করি। তারা আমাদের রােবট বানিয়ে রেখেছে। আপনারাও মেন্টালিস্ট। আমি আপনাদেরও ঘৃণা করি – কিন্তু . 

‘কিন্তু কি? ‘আপনাদের দুজনের প্রতি আমার ভালবাসারও সীমা নেই। ‘জানি। 

‘কি করে জানেন? 

‘আমরা মেন্টালিস্ট। আমরা দূর থেকে তােমার মন পড়তে পারি। চল্লিশ বছর। ধরেই পড়ছি।

 

Read More

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *