এর পরপরই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হল। পরীকে চিঠি লিখতে আর হল না। সে যখন দেশে ফিরে এল, তখন আনিস কম্বাইন্ড মিলিটারি হসপিটালে। সেখান থেকে পি জিতে। জৱী আনিসকে দেখে খুব কেঁদেছিল। আনিস সানার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘একটা যুদ্ধে অনেক কিছু হয়, জরী।
কত বার জরী গিয়েছে হাসপাতালে, কত কথাই তাে হয়েছে, কিন্তু ভুলেও আনিস সেই চিঠির উল্লেখ করে নি। জরীও সে-প্রসঙ্গ তােলে নি। যেন তাদের মনেই নেই, তারা দু’জনে মিলে চমক্কার একটি চিঠি লিখেছিল পরীকে। গাড়ি ইন করেছে স্টেশনে। হােসেন সাহেব বললেন, ‘লীনাকে আমার কোলে দিয়ে তুমি নাম পরী। পরীকে দেখতে পেয়ে একদল ছেলেমেয়ে চেচিয়ে উঠল, “ইস এত দেরি, এদিকে বােধ হয় গায়ে–হলুদ হয়ে গেছে।’ পরী তাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। লীনা হাততালি দিল। বিয়েবাড়ি খুব জমে উঠেছে।
বাড়ির সামনে খােলা মাঠে ছেলেমেয়েরা হৈহৈ করে চি–বুড়ি খেলছে। তাদের চিৎকারে কান পাতা দায়। শিশুদের আরেকটি দল গম্ভীর হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানে বাবুর্চিরা রান্না বসিয়েছে, সেখানেও অপেক্ষাকৃত কমবয়সী শিশুদের জটলা। ছাদে সামিয়ানা খাটান হয়ে গেছে। সেখানে চেয়ার–টেবিল সাজান হয়েছে। অনেকেই ভারিক্কি চালে চেয়ারে বসে আছে।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
কিশােরী মেয়েদের ছ’–সাত জনের একটি দল জোট বেধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিয়ে উপলক্ষে তারা আজ সবাই শাড়ি পরেছে। সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করছে যেন তাদেরকে মহিলার মতাে দেখায়। এদের মধ্যে শীলা নামের একটি মেয়ে বাড়ি থেকে এক প্যাকেট দামী সিগারেট এনেছে। বিয়েবাড়ির একটি নির্জন আড়াল খুঁজে পেলেই সিগারেট টানা যায়। কিন্তু কোথাও সে–রকম জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। কিশােরীর এই দলটির সবাই কিছু পরিমাণে উত্তেজিত। তারা কথা বলছে ধীরে ধীরে,মাঝে মাঝেই হেসে উঠছে, তবে সে–হাসির স্বরগ্রামও খুব নিচু।
পল। দোতলায় সবচেয়ে দক্ষিণের একটি ঘর। পুরনাে আসবাবে সে–ঘরটি ঠাসা। দুটি জানালাই বন্ধ বলে ঘরের ভেতরটা আর্দ্র ও অন্ধকার। একটি নিষিদ্ধ কিছু করবার উত্তেজনায় সবাই চুপচাপ।। | বড়াে রকমের একটি ঝগড়াও শুরু হয়েছে বিয়েবাড়িতে। এসব ঝগড়াগুলি সাধারণত শুরু করেন নিমন্ত্রিত গরিব আত্মীয়রা। তাঁরা প্রথমে খুব উৎসাহ নিয়ে বিয়েবাড়িতে আসেন, কোনাে একটা কাজ করবার জন্যে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু কিছু করতে না পেরে ক্রমেই বিমর্ষ হয়ে ওঠেন। একসময় দেখা যায় একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তারা মেতে উঠেছেন। চিৎকারে কান পাতা যাচ্ছে না।
বরপক্ষীয়দের তরফ থেকে দু’টি রুই মাছ পাঠান হয়েছিল, মাছ দু’টি নাকি পচা—এই হচ্ছে আজকের ঝগড়ার বিষয়। | তবে সব বিয়েতেই চরম গণ্ডগােলগুলি যেমন ফস করে নিভে যায়, এখানেও তাই হল। দেখা গেল বরপক্ষীয় যারা বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিল দুটি মেয়ে, একটি অল্পবয়সী ছেলে এবং এক জুন মাঝবয়সী ভদ্রলােক, মহানন্দে রঙ খেলায় মেতে গেছে। বরের বাড়ির রােগামতাে লম্বা মেয়েটিকে দু’–তিন জনে জাপটে ধরে সারা গায়ে খুব করে কালাে রঙ মাখাচ্ছে। মেয়েটি হাত–পা ছুঁড়ছে। এবং খুব হাসছে।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
রঙ ছোঁড়াছুঁড়ির ব্যাপারটা দেখতে দেখতে ক্ষ্যাপামির মতাে শুরু হল। একদল
মেয়ে দৌড়াচ্ছে, তাদের পিছু পিছু আরেক দল যাচ্ছে রঙের কৌটো নিয়ে। খিলখিল হাসি, চিৎকার আর ছােটাছুটিতে চারিদিক সরগরম।
ছেলেদের দলও বেমালুম জুটে গিয়েছে। অল্পপরিচিত, অপরিচিত মেয়েদের গালে রঙ মাখিয়ে দিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করছে না। মেয়েরাও যে এ ব্যাপারে কিছু একটা মনে করছে, তা মনে হচ্ছে না। তাদের ভালোই লাগছে। পরী যখন এসে পৌছল, তখন বরের বাড়ির রােগা মেয়েটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—যাকে দেখাচ্ছে ভূতের মতাে।
পান্না ভয় পেয়ে বলল, “মা, একটা পাগলী, ওমা, একটা পাগলী।’পরীকে দেখতে পেয়ে সবাই ছুটে এল। নিমেষের মধ্যে পরীর ধবধবে গাল আর লালচে ঠোঁট কালাে রঙে ডুবে গেল। লীনা ৪ পান্না দু জনেই হতভম্ব। লীনা বলল, ‘এরকম করছে কেন?”
হােসেন সাহেব ব্যাপার দেখে সটকে পড়েছেন। সটান চলে গিয়েছেন দোতলায়।
Read More