সত্যিই তাে! মনে পড়ল একবার বাবা বলেছিলেন—যে–কোনও বাংলা উপন্যাস নিয়ে তার যে–কোনও একটা পাতা খুলে পড়ে দেখাে, দেখবে প্রায় অর্ধেক কথা হয় উর্দু, নয় ফারসি, না হয় ইংরাজি, না হয় পর্তুগিজ, না হয় অন্য কিছু। এ সব কথা বাংলায় এমন চলে গেছে যে, আমরা ভুলে গেছি এগুলাে আসলে বাংলা নয়।
আমি লাল অক্ষরে লেখা কথা দুটোর দিকে চেয়ে আছি দেখে প্রায় যেন আমার মনের প্রশ্নটা আন্দাজ করেই ফেলুদা বলল, একটা সাজা পানের ডগা দিয়ে অনেক সময় চুন খয়ের মেশানাে লাল রস চুইয়ে পড়ে দেখেছিস ? এটা সেই পানের ডগা দিয়ে লাল রস দিয়ে লেখা।
আমি লেখাটা নাকের কাছে আনতেই পানের গন্ধ পেলাম। ‘কিন্তু কে লিখেছে বলাে তাে ? ‘জানি না।’ ‘লােকটা বাঙালি তাে বটেই ? ‘জানি না।’ ‘কিন্তু তােমাকে কেন লিখতে যাবে ? তুমি তাে আর আংটি চুরি করােনি।’
ফেলুদা হাে হাে করে হেসে বলল, “হুমকি জিনিসটা কি আর চোরকে দেয় রে বোেকা ? ওটা দেয় চোরের যে শত্রু তাকে। অর্থাৎ ডিটেকটিভকে। তাই এ সব কাজে নামতে হলে ডিটেটিভের একেবারে প্রাণটি হাতে নিয়ে নামতে হয়।’
আমার বুকের ভিতরটা টিপ টিপ করে উঠল, আর বুঝতে পারলাম যে গলাটা কেমন জানি শুকিয়ে আসছে। কোনও রকমে ঢােক গিলে বললাম, তা হলে এবার থেকে সত্যিই হুঁশিয়ার হওয়া উচিত।’
‘হুঁশিয়ার হইনি সে কথা তােকে কে বললে ?’—এই বলে ফেলুদা পকেট থেকে একটা গােল কৌটো বার করে আমার নাকের সামনে ধরল। দেখলাম বাক্সটার ঢাকনায় লেখা রয়েছে–দশংসংস্কারচূর্ণ।‘ | ওটা যে একটা দাঁতের মাজনের নাম সেটা আমি ছেলেবেলা থেকে জানি কারণ দাদু ওটা ব্যবহার করতেন। তাই আমি একটু অবাক হয়েই বললাম, ‘দাঁতের মাজন দিয়ে কী করে হুঁশিয়ার হবে ফেলুদা।
‘তাের যেমন বুদ্ধি !—দাঁতের মাজন হতে যাবে কেন ?
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২১)
তবে ওটায় কী আছে ? চোখ দুটো গােল করে গলাটা বাড়িয়ে আর নামিয়ে নিয়ে ফেলুদা বলল, চূর্ণীকৃত ব্রহ্মাস্ত্র।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর ফেলুদা হঠাৎ বলল, তােপসে, কী মনে হচ্ছে বল তাে ?
আমি বললাম, কীসের কী মনে হচ্ছে ? ‘এই যে–সব ঘটনা ঘটছে-টটছে।’
‘বারে বা, সে তাে তুমি বলবে। আমি আবার কী করে বলব ? আমি কি ডিটেকটিভ নাকি ? আর সন্ন্যাসীটা কে, সেটা না জানা অবধি তাে কিছুই বোেঝা যাবে না।’ | ‘কিন্তু কিছু কিছু জিনিস তাে বােঝা যাচ্ছে। যেমন, সন্ন্যাসীটা বাথরুমে ঢুকে আর বেরােল।
এটা তাে খুব রিভিলিং। | ‘রিভিলিং মানে ?
‘রিভিলিং মানে যার থেকে অনেক কিছু বােঝা যায়।’ ‘এখানে কী বােঝা যাচ্ছে ? ‘তুই নিজে বুঝতে পারছিস না ? ‘আমি বুঝতে পারছি যে ওয়েটিংরুমের দারােয়ানটা অন্যমনস্ক ছিল।’ ‘তাের মুণ্ডু। ‘তবে ? ‘সন্ন্যাসী বেরােলে নিশ্চয়ই দারােয়ানের চোখে পড়ত।
তা হলে ? সন্ন্যাসী বেরােয়নি ? ‘সন্ন্যাসীর হাতে কী ছিল মনে আছে ? ‘আমি তাে আর…ও হ্যাঁ হ্যাঁ-অ্যাটাচি কেস।’ ‘সন্ন্যাসীর হাতে টাচি কেস দেখেছিস কখনও ? ‘তা দেখিনি।’
সেই তাে বলছি। ওটা থেকেই সন্দেহ হয়। কী সন্দেহ হয় ? ‘য়ে সন্ন্যাসী আসলে সন্ন্যাসী নন। উনি পান্ট শার্ট কি ধুতি-পাঞ্জাবি পরা আমাদের মতাে অ-সন্ন্যাসী, আর সেই পােশাক ছিল ওই অ্যাটাচি কেসে। গেরুয়াটা ছিল ছদ্মবেশ। খুব সম্ভবত দাড়িগোঁফটাও।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২১)
‘বুঝেছি। সেগুলাে ও বাক্সে পুরে নিয়েছে, আর অন্য পােশাক পরে বেরিয়ে এসেছে। তাই দারােয়ান ওকে চিনতে পারেনি।’ ‘গুড। এইবার মাথা খুলেছে।’ কিন্তু আজ সকালে তা হলে কে তােমার গায়ে কাগজ ছুঁড়ে মারল ? ‘হয় ও নিজেই, না হয় ওর কোনও লােক। স্টেশনের আশেপাশে ঘােরাফেরা করছিল। আমি যে একে-তাকে সন্ন্যাসীর কথা জিজ্ঞেস করছি, সেটা ও শুনেছিল-~~-আর তাই হুমকি দিয়ে গেল।
‘বুঝেছি। কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও রহস্য আছে কি ?
বাবা, বলিস কী ? রহস্যের কোনও শেষ আছে নাকি ? শ্রীবাস্তবকে স্ট্যান্ডার্ড গাড়িতে কে ফলো করল ? সেও কি ওই সন্ন্যাসী, না অন্য কেউ ? গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে চারমিনার আর পান খেতে খেতে কে ওয়াচ করছিল ? পিয়ারিলাল কোন ‘স্পাই’-এর কথা বলতে চেয়েছিলেন ? বনবিহারীবাবু হিংস্র জানােয়ার পােষেন কেন ? পিয়ারিলালের ছেলে বনবিহারীবাবুকে আগে কোথায় দেখেছে ? সে আংটির ব্যাপার কতখানি জানে?’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২১)
রাত্রে বিছানায় শুয়ে এই সব রহস্যের কথাই ভাবছিলাম । ফেলুদা একটা নীল খাতায় কী যেন সব লিখল। তারপরে সাড়ে দশটায় শুয়ে পড়ল, আর শােবার কিছুক্ষণ পরেই জোরে জোরে নিশ্বাস। বুঝলাম ও ঘুমিয়ে পড়েছে। দূর থেকে রামলীলার ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে। একবার একটা জানােয়ারের ডাক শুনলাম-“হয়তাে শেয়াল কিংবা কুকুর, কিন্তু হঠাৎ কেন জানি হাইনার হাসি বলে মনে হয়েছিল।
বনবিহারীবাবু যে হিংস্র জানােয়ার পােষেন, তাতে ফেলুদার আশ্চর্য হবার কী আছে? সব সময় কি সব জিনিসের পিছনে লুকোনাে কারণ থাকে ? অনেক রকম অদ্ভুত অদ্ভুত শখের কথা তাে শুনতে পাওয়া যায়। বনবিহারীবাবুর চিড়িয়াখানাও হয়তাে সেই রকমই একটা।
Read More