সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৩)

ধীরুকাকা বললেন, ‘কী রকম? এই যেমন ধরুনসন্ন্যাসী গােদরেজের আলমারির চাবি পেল কোখেকে। তারপরবাড়িতে চাকরবাকর থাকতে সেসন্ন্যাসীর এত সাহসই বা হবে কোত্থেকে যে সে একেবারে আপনার বেডরুমে গিয়ে ঢুকবে। তা ছাড়া একটা ব্যাপার তাে অনেকদিন থেকেই খটকা লেগে আছে। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড ধীরুকাকা বললেন, কী ব্যাপার ? ‘শ্রীবাস্তবকে সত্যিই পিয়ারিলাল আংটি দিয়েছিলেন, না শ্রীবাস্তব সেটা অন্য ভাবে ধীরুকাকা বাধা দিয়ে বললেন, ‘সে কী মশাই, আপনি কি শ্রীবাস্তবকেও সন্দেহ করেন নাকি ‘সন্দেহ তাে প্রত্যেককেই করতে হবেএমন কী আমাকে আপনাকেও-তাই নয় কি ফেলুবাবু ? 

ফেলুদা বলল, “নিশ্চয়ইআর যেদিন সন্ন্যাসী আমাদের বাড়ি এসেছিলেন, সেদিন তাে শ্রীবাস্তবও এসেছিলেনওই বিকেলেই। তারপর আমাদের না পেয়ে বনবিহারীবাবুর বাড়িতে এলেন। 

 ‘এগজ্যাক্টলি । বনবিহারীবাবু যেন রীতিমতাে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। এবারে বাবা যেন বেশ থতমত খেয়েই বললেন, কিন্তু শ্রীবাস্তব যদি অসদুপায়ে আংটি পেয়ে থাকেন, তা হলে তিনি সেটা আমাদের কাছে রাখবেনই বা কেন, আর রেখে সেটা চুরিই বা করবেন কেন ? 

বনবিহারীবাবু হাে হাে করে হেসে উঠে বললেন, বুঝলেন না ? অত্যন্ত সহজ। শ্রীবাস্তবের পেছনে সত্যিই ডাকাত লেগেছিল। ভিতু মানুষতাই ভয় পেয়ে আংটিটা আপনাদের কাছে এনে রেখেছিলেন। এদিকে লােভও আছে যােলাে আনা, তাই তিনি নিজেই আবার সেটা চুরি করে চোরদের ধাপ্পা দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন‘ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৩)

আমার মাথার মধ্যে সব কেমন জানি গণ্ডগােল হয়ে যাচ্ছিল । শ্রীবাস্তবের মতাে এত ভালমানুষ হাসিখুশি লােক, তিনি কখনও চোর হতে পারেন ? ফেলুদাও কি বনবিহারীবাবুর সঙ্গে একমত, নাকি বনবিহারীবাবুর কথাতেই ওর প্রথম শ্রীবাস্তবের ওপর সন্দেহ পড়েছে ? ৪৮ 

বনবিহারীবাবু বললেন, ‘শ্রীবাস্তব অমায়িক লােক তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন লখনৌএর মতাে জায়গাএমন আর কীসেখানে স্রেফ হাড়ের ব্যারামের চিকিৎসা করে এত বড় বাড়ি গাড়ি বাগান আসবাবপত্রভাবতে একটু-ইয়ে লাগে না কি ? 

ধীরুকাকা বললেন, ‘ওর বাপের হয়তাে টাকা ছিল ? বনবিহারীবাবু বললেন, ‘বাপ ছিলেন এলাহাবাদ পােস্ট আপিসের সামান্য কেরানি। এই সময় ফেলুদা হঠাৎ একটা বাজে প্রশ্ন করে বসল ‘আপনার কোনও জানােয়ার কখনও আপনাকে কামড়েছে কি ? ‘নাে নেভার । তা হলে আপনার ডান হাতের কবজিতে ওই দাগটা কী ? 

ও হাে হােবাঃ বাঃ, তুমি তাে খুব ভাল লক্ষ করেছকারণ ও দাগটা সচরাচর আমার আস্তিনের ভেতরেই থাকে। ওটা হয়েছিল ফেসিং করতে গিয়ে। ফেসিং বােঝাে? 

ফেলুদা কেনআমিও জানতাম ফেসিং কাকে বলে। রেপিয়ার বলে একরকম সরু লম্বা তলােয়ার দিয়ে খেলাকে বলে ফেনসিং। 

‘ফেনসিং করতে গিয়ে হাতে খোঁচা খাই । এটা সেই খোঁচার দাগ। 

রেসিডেন্সিটা সত্যিই একটা দেখবার জিনিসপ্রথমত জায়গাটা খুব সুন্দর। চারিদিকে বড় বড় গাছপালাতার মাঝখানে এখানে ওখানে এক একটা মিউটিনির আমলের সাহেবদের ভাঙা বাড়ি । গাছগুলাের ডালে দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁদর। লখনৌ শহরের বাঁদরের কথা আগেই শুনেছি, এবার নিজের চোখে তাদের কাণ্ডকারখানা দেখলাম।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৩)

কতগুলাে রাস্তার ছেলে গুলতি দিয়ে বাঁদরগুলাের দিকে তাগ করে ইট মারছিলবনবিহারীবাবু তাদের কষে ধমক দিলেন । তারপর আমাদের বললেন, ‘জন্তুজানােয়ারের ওপর দুর্ব্যবহারটা আমি সহ্য করতে পারি না। আমাদের দেশেই 

জিনিসটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।’ 

ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহের কথা পড়েছি, রেসিডেন্সি দেখার সময় সেই বইয়ে পড়া ঘটনাগুলাে চোখের সামনে ভেসে উঠল। 

 একটা বড় বাড়ির ভিতর আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছি, আর বনবিহারীবাবু বর্ণনা দিয়ে চলেছে 

‘সেপাই মিউটিনির সময় লখনৌ শহরে নবাবদেরই রাজত্ব। ব্রিটিশরা তাদের সৈন্য রেখেছিলেন এই বাড়িটার ভেতরেই। স্যার হেনরি লরেন্স ছিলেন তাদের সেনাপতি। বিদ্রোহ গল দেখে প্রাণের ভয়ে লখনৌ শহরের যত সাহেব মেমসাহেব একটা হাসপাতালের ভিতর গিয়ে আশ্রয় নিলকদিন খুব লড়েছিলেন স্যার হেনরি, কিন্তু আর শেষটায় পেরে উঠলেন না। সেপাইএর গুলিতে তাঁর মৃত্যু হল ।

আর তার পরে ব্রিটিশদের কী দশা হল সেটা এই বাড়ির চেহারা দেখেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারছ। স্যার কলিন ক্যাম্পবেল যদি শেষটায় টাটকা সৈন্য সামন্ত নিয়ে না এসে পড়তেন, তা হলে ব্রিটিশদের দফা রফা হয়ে যেত।এ ঘরটা ছিল বিলিয়ার্ড খেলার ঘরদেয়ালে সেপাইদের গােলা লেগে কী অবস্থা হয়েছে দেখাে।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৩)

 

বাবা আর ধীরুকাকা আগেই রেসিডেন্সি দেখেছেন বলে মাঠে পায়চারি করছিলেন। আমি আর ফেলুদাই তন্ময় হয়ে বনবিহারীবাবুর কথা শুনছিলাম। আর দুশাে বছরের পুরনাে পাতলা অথচ মজবুত ইটের তৈরি ব্রিটিশদের ঘরবাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখছিলাম, এমন সময় ঘরের দেয়ালের একটা ফুটো দিয়ে হঠাৎ কী একটা জিনিস তীরের মতাে এসে ফেলুদার কান ঘেঁষে ধাঁই করে পিছনের দেয়ালে লেগে মাটিতে পড়ল। চেয়ে দেখি সেটা একটা পাথরের টুকরাে । 

তার পরমুহূর্তেই বনবিহারীবাবু একটা হ্যাঁচকা টানে ফেলুদাকে তার দিকে টেনে নিলেন, আর ঠিক সেই সময় আরেকটা পাথর এসে আবার ঘরের দেয়ালে লেগে মাটিতে পড়ল। পাথরগুলাে যে গুলতি দিয়ে মারা হয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

বনবিহারীবাবুর বয়স হলেও এখনও যে কত চটপটে সেটা এবার বেশ বুঝতে পারলাম। উনি এক লাফে দেয়ালের একটা বড় গর্তের ভেতর দিয়ে গিয়ে বাইরের ঘাসে পড়লেন। আমি আর ফেলুদাও অবিশ্যি তক্ষুনি লাফিয়ে গিয়ে ওঁর কাছে পৌঁছলাম।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *