সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৫)

ও প্রথমে লুকিয়ে ওর খাতা দেখার জন্য দারুণ রেগে গেল। বলল, এটা তুই একটা জঘন্য কাজ করেছিস। তােকে প্রায় ক্রিমিনাল বলা যেতে পারে।’ তারপর একটু নরম হয়ে বলল, তাের পক্ষে ওটা পড়ার চেষ্টা করা বৃথা, কারণ ও অক্ষর তাের জানা নেই।’ ‘কী অক্ষর ওটা ? ‘গ্রিক। ‘ভাষাটাও গ্রিক ? ‘ন।’ তবে ? ‘ইংরিজি । – ‘তা তুমি গ্রিক অক্ষর শিখলে কী করে? 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ডসে অনেকদিনের শেখ। ফাস্ট ইয়ারে থাকতে। আলফা বিটা গামা ডেল্টা পাই মিউ এপসাইলন~এ সব তাে অঙ্কুতেই শিখেছি, তার বাকিগুলাে শিখে নিয়েছিলাম এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে। ইংরিজি ভাষাটা গ্রিক অক্ষরে লিখলে বেশ একটা সাংকেতিক ভাষা হয়ে যায়। এমনি লােকের কারুর সাধ্য নেই যে পড়ে।’ 

‘লখনৌ বানান কী হৰে গ্রিকে ? ‘ল্যামডা উপসাইলন কালা নিউ ওমিক্রন উপসাইলন ? C আর টা গ্রিকে নেই, তাই বানানটা হচ্ছে L-UK-N 0 {} ?’ 

‘আর ক্যালকাটা বানান?’ ‘কা আফা লাভ কপি উপসাইলন টাউ টাউ আলফা । ‘বাসরে বাস্ ! তিনটে বানান করতেই পিরিয়ড’ কাবার ! 

চৌরঙ্গি বলে অবিশ্যি বাড়িয়ে বলা হবে—-কিন্তু হজরতগঞ্জের দোকান-টাকানগুলাে? বেশ ভালই দেখতে। 

টাঙ্গার ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে ফেলুদা আর আমি হাঁটতে আরম্ভ করলাম । ‘ওই তাে মনিহারি দোকান ফেলুদা-ওখানে নিশ্চয়ই ব্লেড পাওয়া যাবে।’ ‘দাঁড়া, আগে একটা অন্য কাজ সেরে নিই।’ 

আরও কিছুদূর গিয়ে ফেলুদা হঠাৎ একটা দোকান দেখে সেটার দিকে এগিয়ে গেল। দোকানের সামনে লাল সাইনবাের্ডে সােনালি উঁচু উঁচু অক্ষরে লেখা আছে— 

MALKANI & CO 

ANTIQUE & CURIO DEALERS কাচের মধ্যে দিয়ে দোকানের ভিতরটা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম সেটা সব পুরনাে আমলের জিনিসের দোকান। ঢুকে দেখি হরেক রকমের পুরনাে জিনিসে দোকানটা গিজগিজ করছে—গয়নাগাটি কার্পেট ঘড়ি চেয়ার টেবিল ঝাড়লণ্ঠন বাঁধানাে ছবি আর আরও কত কী। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৫)

পাকাচুলওয়ালা সােনার চশমা পরা একজন বুড়াে ভদ্রলােক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। 

ফেলুদা বলল, ‘বাদশাদের আমলের গয়নাগাটি কিছু আছে আপনাদের এখানে ? ‘গয়না তাে নেই। তবে মুগল আমলের ঢাল তলােয়ার জাজিম বর্ম, এই সব কিছু আছে। দেখাব ? 

ফেলল একটা কাচের আতরদান হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বলল, “পিয়ারিলালের কাছে কিছু মুগল আমলের গয়না দেখেছিলাম। তিনি তাে আপনার খুব বড় খদ্দের ছিলেন, তাই ?

ভদ্রলােক যেন অবাক হলেন । ‘বও খদ্দের ? কোন পিয়ারিলাল ? ‘কেন-পিয়ারিলাল শেঠ, যিনি কিছুদিন আগে মারা গেলেন।’ মালকানি মাথা নেড়ে বললেন, আমার কাছ থেকে কখনই কিছু কেনেননি তিনি, আর আমার চেয়ে বড় দোকান এখানে আর নেই। 

‘আই সি। তা হলে বােধহয় যখন কলকাতায় ছিলেন তখন কিনেছিলেন।’ ‘তাই হবে।’ 

এখানে বড় খদ্দের বলতে কাকে বলেন আপনি ? 

মালকানির মুখ দেখে বুঝলাম বড় খদ্দের তার খুব বেশি নেই। বললেন, “বিদেশি টুরিস এসে মাঝে মাঝে ভাল জিনিস ভাল দামে কিনে নিয়ে যায়। এখানের খদ্দের বলতে মিস্টার মেহতা আছেন, মাঝে মাঝে এটা সেটা নেন, আর মিস্টার পেস্টনজি আমার অনেক দিনের খদ্দের~-সেদিন তিন হাজার টাকায় একটা কার্পেট কিনে নিয়ে গেছেন—খাস ইরানের জিনিস।’ 

ফেলুদা হঠাৎ একটা হাতির দাঁতের তৈরি নৌকোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওটা বাংলা দেশের জিনিস না ? ‘হ্যাঁ, মুরশিদাবাদ।’ ‘দেখেছিস তােপসে-~-বজরাটা কেমন বানিয়েছে।’

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৫)

সত্যি, এত সুন্দর হাতির দাঁতের কাজ করা নৌকো আমি কখনও দেখিনি। বজরার ছাতে সামিয়ানার তলায় নবাব বসে গড়গড়া টানছে, তার দুপাশে পাত্রমিত্র সভাসদ সব বসে আছে, আর সামনে নাচগান হচ্ছে । ষােলােজন দাঁড়ি দাঁড় বাইছে, আর একটা লােক হাল ধরে বসে আছে। তা ছাড়া সেপাই বরকন্দাজ সব কিছুই আছে, আর সব কিছুই এত নিখুঁতভাবে করা হয়েছে যে দেখলে তাক লেগে যায়। 

ফেলুদা বলল, এটা কোত্থেকে পেলেন ? ‘ওটা বেচলেন মিস্টার সরকার। ‘কোন মিস্টার সরকার ? 

‘মিস্টার বি. সরকার—যিনি বাদশানগরে থাকেন । উনি মাঝে মাঝে এটা সেটা কিনে নিয়ে যান। ভাল জিনিস আছে ওঁর কাছে। 

‘আই সি। ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ। আপনার দোকান ভারী ভাল লাগল। গুড ডে।’ 

গুড ডে, স্যার।’ বাইরে এসে ফেলুদা বলল, বনবিহারী সরকারের তা হলে এ সব দোকানে যাতায়াত আছে। অবিশ্যি সে সন্দেহটা আমার আগেই হয়েছিল।’ 

“কিন্তু উনি যে বলেছিলেন এ সব ব্যাপারে এর কোনও ইন্টারেস্ট নেই।’ ‘ইন্টারেস্ট না থাকলে পাথর দেখেই কেউ বলতে পারে সেটা আসল কি নকল ? 

মালকানি ব্রাদার্সের সামনে দেখি এম্পায়ার বুক স্টল বলে একটা বইয়ের দোকান। ফেলুদা বলল ওর হরিদ্বার লছমনঝুলা সম্বন্ধে একটা বই কেনা দরকার, তাই আমরা দোকানটায় ঢুকলাম, আর ঢুকেই দেখি পিয়ারিলালের ছেলে মহাবীর। 

ফেলুদা ফিসফিস করে বলল, ক্রিকেটের বই কিনছে । ভেরি গুড়। মহাবীর আমাদের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে বই কিনছিল তাই আমাদের দেখতে পায়নি। 

ফেলুদা দোকানদারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, নেভিল কাডাসের কোনও বই আছে আপনাদের ? 

বলতেই মহাবীর ফেলুদার দিকে ফিরে তাকাল । আমি জানতাম নেভিল কার্ডস ক্রিকেট সম্বন্ধে খুব ভাল ভাল বই লিখেছে। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৫)

দোকানদার বলল, ‘কোন বইটা খুঁজছেন বলুন তাে?” 

Centuries বইটা আছে ? “আজ্ঞে না–তবে অন্য বই দেখাতে পারি।’ 

মহাবীর মুখে হাসি নিয়ে ফেলুদার দিকে এগিয়ে এসে বলল, আপনার বুঝি ক্রিকেটে ইন্টারেস্ট ? | ‘হ্যাঁ। আপনারও দেখছি…’ 

মহাবীর তার হাতের বইটা ফেলুদাকে দেখিয়ে বলল, “এটা আমার অডার দেওয়া ছিল। ব্র্যাডম্যানের আত্মজীবনী।। 

ওহাে-ওটা পড়েছি। দারুণ বই। ‘আপনার কী মনে হয়-~~-রণজি বড় ছিলেন, না ব্র্যাডম্যান ? 

দুজনে ক্রিকেটের গল্পে দারুণ মেতে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলার পর মহাবীর বলল, ‘কাছেই কোয়ালিটি আছে, আসুন না একটু বসে চা খাই।’ 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *