সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

তারপর ধীরুবাব আলমারি থেকে সরিয়ে সেটা আবার নিজের কাছে রেখে ভাবছেন এইবার ডাকাতের হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেল। কী বলাে, ফেলু মাস্টার ? আমার গােয়েন্দাগিরিটা কি 

নেহাত উড়িয়ে দেবার মতাে ? 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড ফেলুদা তার খাতা বন্ধ করে কমলালেবুর খােসা ছাড়তে ছাড়াতে বলল, ‘ডাক্তার শ্রীবাস্তব যে মহাবীরকে প্রায় দুরারােগ্য ব্যারাম থেকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন, তার কি কোনও সাক্ষীর অভাব আছে ? 

বনবিহারীবাবু বললেন, না তা হয়তাে নেই । ফেলুদা বলল, আমি বিশ্বাস করি, আংটির দাম যত লাখ টাকাই হােক না কেন, একটি ছেলের জীবনের মূল্যের চেয়ে তার মূল্য বেশি নয়। শ্রীবাস্তব যদি আংটি চুরি করে থাকেন, তা হলে তাঁর অপরাধ নিশ্চয় আছে, কিন্তু এখন যারা ওঁর আংটির পিছনে লেগেছে, তাদের অপরাধ আরও অনেক বেশি, কারণ তারা একেবারে খাঁটি চোর এবং খুব ডেঞ্জারাস জাতের চোর।’  বুঝেছি।’ বনবিহারীবাবুর গলার স্বর গম্ভীরতা হলে তুমি বিশ্বাস করাে না যে শ্রীবাস্তবের কাছেই এখনও আংটিটা আছে।’  না? করি না। আমার কাছে তার প্রমাণ আছে । 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

কামরার সকলেই চুপআমি অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে চাইলাম বনবিহারীবাবু কিছুক্ষণ ফেলুদার দিকে চেয়ে থেকে বললেন, কী প্রমাণ আছে তা জিজ্ঞেস করতে পারি কি ? 

 ‘জিজ্ঞেস নিশ্চয়ই করতে পারেন, কিন্তু উত্তর এখন পাবেন না—তার সময় এখনও আসেনি।’ 

আমি ফেলুদাকে এরকম জোরের সঙ্গে কথা বলতে এর আগে কখনও শুনিনি। বনবিহারীবাবু আবার ঠাট্টার সুরে বললেন, আমি বেঁচে থাকতে সে উত্তর পাব তাে ? 

ফেলুদা বলল, আশা তাে করছি। একটা স্পাইএর রহস্য আছেসেটা সমাধান হলেই পাবেন। 

‘স্পাই ? বনবিহারীবাবু অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে চাইলেন। কী স্পাই ? 

শ্রীবাস্তব বললেন, ‘ফেলুবাবু বােধহয় পিয়ারিলালের লাস্ট ওয়ার্ডসএর কথা বলছেন। মারা যাবার আগে দুবার ‘স্পাই’ কথাটা বলেছিলেন।’ 

বনবিহারীবাবুর ভূকুটি আরও বেড়ে গেল। বললেন, আশ্চর্য ! লখনৌ শহরে স্পাই ? 

তারপর কিছুক্ষণ পাইপটা হাতে নিয়ে চুপ করে কামরার মেঝের দিকে চেয়ে বললেন হতে পারে...হতে পারে...আমার একবার একটা সন্দেহ হয়েছিল বটে। 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

‘কী সন্দেহ ?’শ্রীবাস্তব জিজ্ঞেস করলেন। ‘না। কিচ্ছু না...আই মে বি রং। 

বুঝলাম বনবিহারীবাবু আর ও বিষয় কিছু বলতে চান না। আর এমনিতেই হরদোই স্টেশন এসে পড়াতে কথা বন্ধই হয়ে গেল। 

‘একটু চা হলে মন্দ হয় না বলে ফেলুদা প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লআমিও নামলাম, কারণ ট্রেন স্টেশনে থামলে গাড়ির ভিতর বসে থাকতে আমার ইচ্ছে করে না। 

আমরা নামতেই আরেকজন গেরুয়াপরা দাড়িওয়ালা লােক কোখেকে জানি এসে আমাদের গাড়িতে উঠে পড়ল । বনবিহারীবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “কামরা রিজার্ভড়জায়গা নেই, জায়গা নেই। 

তাতে গেরুয়াধারী ইংরিজিতে বলল, ‘বেরিলি পর্যন্ত যেতে দিন দয়া করেতারপর আমি অন্য গাড়িতে চলে যাব। রাত্রে আপনাদের বিরক্ত করব না।‘ 

অগত্যা বনবিহারীবাবু তাকে উঠতে দিলেন। ফেলুদা বলল, ‘সন্ন্যাসীদের জ্বালায় দেখছি আর পারা গেল না। এই চাওয়ালা ! চাওয়ালা দৌড়ে এগিয়ে এল । ‘তুই খাবি ?’ কেন খাব না ? 

অন্যদের জিজ্ঞেস করাতে ওঁরা বললেন যে খাবেন না। 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

গরম চায়ের ভাঁড় কোনও রকমে এ-হাত ও-হাত করতে করতে ফেলুদাকে বললাম, ‘শ্রীবাস্তব চোর হলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।’ 

ফেলুদা ওই সাংঘাতিক গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, কেন ? ‘কারণ ওঁকে আমার বেশ ভাল লাগে—তার মনে হয় খুব ভালমানুষ।’ ‘বােকচন্দর—তুই যে ডিটেকটিভ বই পড়িসনি। পড়লে জানতে পারতিস যে যে-লােকটাকে সবচেয়ে নিরীহ বলে মনে হয়, সে-ই শেষ পর্যন্ত অপরাধী প্রমাণ হয়।’ 

এ ঘটনা তাে আর ডিটেকটিভ বইয়ের ঘটনা নয়।’ ‘তাতে কী হল ? ৰাস্তব জীবনের ঘটনা থেকেই তাে লেখকরা আইডিয়া পান! 

আমার ভারী রাগ হল। বললাম, তা হলে শ্রীবাস্তব যখন প্রথম দিন আমাদের বাড়িতে বসে গল্প করছিলেন, তখন বাইরে থেকে কে ওঁকে ওয়াচ করছিল, আর চারমিনার খাচ্ছিল ? 

সে হয়তাে ডাকাতের দলের লােক। ‘তা হলে তুমি বলছ শ্রীবাস্তবও খারাপ লােক, আর ডাকাতরাও খারাপ লােক ? তা হলে তাে সকলেই খারাপ লােক-কারণ গণেশ গুহ বলছিল বনবিহারীবাবুও লােক ভাল নয়।’ 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

ফেলুদা উত্তরের বদলে চায়ের ভাঁড়ে একটা বড় রকম চুমুক দিতেই কোখেকে জানি একটা দলা পাকানাে কাগজ ঠাই করে এসে ওর কপালে লেগে রিবাউন্ড করে একেবারে ভাঁড়ের মধ্যে পড়ল । | এক ছােবলে কাগজটা ভাঁড় থেকে তুলে নিয়ে ফেলদা প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের দিকে চাইতেই গার্ডের হুইসিল শােনা গেল । এখন আর কারুর সন্ধানে ছােটাছুটি করার কোনও উপায় নেই। 

কম্পার্টমেন্টে ওঠার আগে কাগজটা খুলে একবার নিজে দেখে তারপর আমাকে দেখিয়ে (ফেলুদা সেটাকে আবার দলা পাকিয়ে প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে একেবারে ট্রেনের চাকার ধারে ফেলে দিল । 

কাগজে লেখা ছিল খুব হুঁশিয়ার’—আর দেখে বুঝলাম এবারও পানের রস দিয়েই লেখা। 

 বাদশাহী আংটির রহস্যজনক আর রােমাঞ্চকর ব্যাপারটা আমরা মােটেই লখনৌ শহরে ছেড়ে আসিনি। সেটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে। 

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কামরার বাতিগুলাে এইমাত্র জ্বলেছে। ট্রেন ছুটে চলেছে বেরিলির দিকে।

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৮)

 কামরায় সবসুদ্ধ সাতজন লােক। আমি আর ফেলুদা একটা বেঞ্চিতে, একটায় বাবা আর শ্রীবাস্তব, আর তৃতীয়টায় বনবিহারীবাবু আর সেই সন্ন্যাসী। বাবাদের উপরের বাঙ্কে বনবিহারীবাবুর একটা কাঠের প্যাকিং কেস আর একটা বড় ট্রাঙ্ক রয়েছে। আমাদের উপরের বাঙ্কে একটা লােক আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমােচ্ছে। লখনৌ স্টেশনে গাড়িতে উঠে অবধি তাকে এই ঘুম আর চাদরমুড়ি অবস্থাতেই দেখেছি। তার পায়ের ডগাদৃটো শুধু বেরিয়ে আছে, উপরের দিকে চাইলেই দেখা যায়। | বনবিহারীবাবু বেঞ্চির উপর পা তুলে বাবু হয়ে বসে পাইপ টানছেন, শ্রীবাস্তব গীতাঞ্জলি 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *