পড়ছেন, আর বাবাকে দেখলেই মনে হয় ওঁর ঘুম পেয়েছে। মাঝে মাঝে চোখ রগড়িয়ে টান হয়ে বসছেন। সন্ন্যাসীর যেন আমাদের কোনও ব্যাপারেই কোনও ইন্টারেস্ট নেই । সে একমনে একটা হিন্দি খবরের কাগজের পাতা উলটোচ্ছে। ফেলুদা জানালার বাইরে চেয়ে গাড়ির তালে তালে একটা গান ধরেছে। সেটা আবার হিন্দি গান। তার প্রথম দুলাইন হচ্ছে— যব ছােড় চলে লখনৌ নগরী
তব হাল আদম পর ক্যা গুজরী… বাকিটা ফেলুদা হুঁ হুঁ করে গাইছে। বুঝলাম ওই দুলাইন ছাড়া আর কথা জানা নেই। বনবিহারীবাবু হঠাৎ বললেন, ‘ওয়াজিদ আলি শার গান তুমি জানলে কী করে ? ফেলুদা বলল, আমার এক জ্যাঠামশাই গাইতেন। খুব ভাল ঠুংরি গাইয়ে ছিলেন। রনবিহারীবাবু পাইপে টান দিয়ে জানালার বাইরে সন্ধ্যার লাল আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আশ্চর্য নবাব ছিলেন ওয়াজিদ আলি। গান গাইতেন পাখির মতাে।
গান রচনাও করতেন । ভারতবর্ষের প্রথম অপেরা লিখেছিলেন একেবারে বিলিতি ঢং-এ। কিন্তু যুদ্ধ করতে জানতেন না এক ফোঁটাও। শেষ বয়সটা কাটে কলকাতার মেটেবুরুজে—এখন যেখানে সব কলকাতার মুসলমান দরজিগুলাে থাকে। আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কী জানাে ? তখনকার বিখ্যাত ধনী রাজেন মল্লিকের সঙ্গে একজোটে কলকাতার প্রথম চিড়িয়াখানার পরিকল্পনা করেন ওয়াজিদ আলি শা।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৯)
কথা শেষ করে বনবিহারীবাবু দাঁড়িয়ে উঠে বাঙ্কে রাখা ট্রাঙ্কটা খুলে তার ভিতর থেকে একটা ছােট গ্রামােফোনের মতাে বাক্স বার করে বেঞ্চির উপরে রেখে বললেন, এবার আমার প্রিয় কিছু গান শােনাই। এটা হচ্ছে আমার টেপ রেকডার। ব্যাটারিতে চলে।
এই বলে বাক্সটার ঢাকনা খুলে হারমােনিয়ামের পর্দার মতাে দেখতে একটা সাদা জিনিস টিপতেই বুঝতেই পারলাম কী একটা জিনিস জানি চলতে আরম্ভ করল।
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘এ গান যদি সত্যি করে উপভােগ করতে হয় তা হলে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখতে দেখতে শােনাে।
আমি বাইরের দিকে চেয়ে আবছা আলােতে দেখলাম, বিরাট গাছওয়ালা ঘন অন্ধকার জঙ্গল ছুটে চলেছে ট্রেনের উলটো দিকে। সেই জঙ্গল থেকেই যেন শােনা গেল বনবিড়ালের কর্কশ চিৎকার । | বনবিহারীবাবু বললেন, ‘ভলুম ইচ্ছে করে বাড়াইনি—যাতে মনে হয় চিৎকারটা দূর থেকেই আসছে।’
তারপর শুনলাম হাইনার হাসি। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। ট্রেনে করে জঙ্গলের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছি—আর সারা জঙ্গল থেকে হাইনার হাসির শব্দ ভেসে আসছে। . বনবিহারীবাবু বললেন, এর পরের শব্দটা আরেকটু কমানাে উচিত, কারণ ওটা শােনা যায় খুব আস্তেই। তবে গাড়ির শব্দের জন্য আমি ওটা একটু বাড়িয়েই শােনাচ্ছি।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৯)
‘কিরর কি কি কি..কি কিট কিট কিট..
আমার বুকের ভিতরটা যেন ঢিপ ঢিপ করতে লাগল । সন্ন্যাসীর দিকে চেয়ে দেখি তিনিও অবাক হয়ে শুনছেন।
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘র্যাটল স্নেক।..আওয়াজটা শুনলে যদিও ভয় করে, কিন্তু আসলে ওরা নিজের অস্তিত্বটা জানিয়ে দেবার জন্যই শব্দটা করে যাতে অন্য কোনও প্রাণী অজান্তে ওদের মাড়িয়ে না ফেলে ।
বাবা বললেন, ‘তা হলে ওরা এমনিতে মানুষকে অ্যাটাক করে না ?
‘জঙ্গলে-টঙ্গলে এমনিতে করে না। সে আমাদের দিশি বিষাক্ত সাপেরাই বা কটা অ্যাটাক করে বলুন। তবে কোণঠাসা হয়ে গেলে করে বইকী। যেমন ধরুন, একটা ছােট ঘরের মধ্যে আপনার সঙ্গে যদি সাপটাকে বন্দি করে রাখা যায় তা হলে কি আর করবে না ? নিশ্চয়ই করবে। আর এদের আরেকটা আশ্চর্য ক্ষমতা কী জানেন তাে ইনফ্রা রেড রশ্মি এদের চোখে ধরা পড়ে। অথাৎ, এরা অন্ধকারে স্পষ্ট দেখতে পায়।
তারপর রেকডার বন্ধ করে দিয়ে বনবিহারীবাবু বললেন, ‘দুঃখের বিষয় আমার বাকি যেকটি প্রাণী আছে—বিছে আর মাকড়সা—তারা দুটিই মৌন। এবার যদি অজগরটি পাই,
তা হলে তার ফোঁসফোঁসানি নিশ্চয়ই রেকর্ড করে রাখব।
বাবা বললেন, ‘ভয় ভয় করছিল কিন্তু শব্দগুলাে শুনে।’
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘তা তাে বটেই। কিন্তু আমার কাছে এ-শব্দ সংগীতের চেয়েও মধুর ! বাইরে যখন যাই, জানােয়ারগুলােকে তাে তখন নিয়ে যেতে পারি না, তাই এই শব্দগুলােকেই নিয়ে যাই সঙ্গে করে।’
বেরিলিতে আমাদের ডিনার দিল, আর সন্ন্যাসী ভদ্রলােক নেমে গেলেন।
ফেলুদা এক প্লেট খাবার পরেও আমার প্লেট থেকে মুরগির ঠ্যাং তুলে নিয়ে বলল, ‘ব্রেনের কাজটা যখন বেশি চলে, তখন মুরগি জিনিসটা খুব হেল্প করে।’
‘আর আমি বুঝি ব্রেনের কাজ করছি না ! ‘তােরটা কাজ নয়, খেলা।’ ‘তােমার এত কাজ করে কী ফলটা হচ্ছে শুনি।’
ফেলুদা গলাটা নামিয়ে নিয়ে শুধু আমি যাতে শুনতে পাই এমনভাবে বলল, “পিয়ারিলাল কোন স্পাই-এর কথা বলেছিলেন সেটার একটা আন্দাজ পেয়েছি।’
এইটুকু বলে ফেলুদা একেবারে চুপ মেরে গেল।
গাড়ি বেরিলি ছেড়েছে। বাবা বললেন, ‘ভাের চারটায় উঠতে হবে। তােরা সব এবার শুয়ে পড়।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৯)
বেঞ্চির অর্ধেকটা আমি নিয়ে বাকি অর্ধেকটা ফেলুদাকে ছেড়ে দিলাম। বনবিহারীবাবু বললেন উনি ঘুমােবেন না। তবে আপনারা নিশ্চিন্তে ঘুমােন, আমি হরিদ্বার আসার ঠিক আগেই আপনাদের তুলে দেব।’ | বাবা আর শ্রীবাস্তব ওঁদের বেঞ্চিটায় ভাগাভাগি করে শুয়ে পড়লেন। বনবিহারীবাবু দেখলাম বাতিগুলাে নিভিয়ে দিলেন। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার হতেই বুঝতে পারলাম বাইরে চাঁদের আলাে রয়েছে। শুধু তাই না, আমি যেখানে শুয়ে আছি সেখান থেকে চাঁদটা দেখাও যাচ্ছে। বােধহয় পূর্ণিমার আগের দিনের চাঁদ, আর সেটা আমাদের গাড়ির সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে চলেছে।
চাঁদ দেখতে দেখতে আমার মন কেন জানি বলল যে, হরিদ্বারে শুধু তীর্থস্থানই দেখা হবে না—আরও কিছু ঘটবে সেখানে। কিংবা এও হতে পারে যে আমার মন চাইছে হরিদ্বারেও কিছু ঘটুক। শুধু গঙ্গা আর গঙ্গার ঘাট আর মন্দির দেখলেই যেন ওখানে যাওয়াটা সার্থক হবে না। ‘ আচ্ছা, ট্রেনের এত দোলানি আর এত শব্দের মধ্যে কী করে ঘুম এসে যায় ?
কলকাতায় আমার বাড়ির পাশে যদি এরকম ঘটাং ঘটাং শব্দ হত, আর আমার খাটটাকে ধরে কেউ যদি ক্রমাগত ঝাঁকুনি দিত, তা হলে কি ঘুম আসত ? ফেলুদাকে কথাটা জিজ্ঞেস করাতে ও বলল, এরকম শব্দ যদি অনেকক্ষণ ধরে হয়, তা হলে মানুষের কান তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় ; তখন আর শব্দটা ডিস্টার্ব করে না। আর ঝাঁকুনিটা তাে ঘুমকে হেল্পই করে। খােকাদের দোল
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৯)
দিয়ে ঘুম পাড়ায় দেখিসনি ? বরং শব্দ আর দোলানি যদি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় তা হলেই ঘুম। ভেঙে যাবার চান্স থাকে। তুই লক্ষ করে দেখিস, অনেক সময় স্টেশনে গাড়ি থামলেই ঘুম ভেঙে যায়।’ | ঘুমে যখন প্রায় চোখ বুজে এসেছে, তখন একবার মনে হল বাঙ্কের উপর যে লােকটি চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমােচ্ছিল, সে যেন উঠে বাঙ্ক থেকে নেমে একবার ঘরের মধ্যে ঘােরাফেরা করল। তারপর একবার যেন কার একটা হাসি শুনতে পেলাম—সেটা মানুষও হতে পারে, আবার হাইনাও হতে পারে।
তারপর দেখলাম আমি ভুলভুলাইয়ার ভেতর পথ হারিয়ে পাগলের মতাে ছুটোছুটি করছি, আর যতবারই এক একটা মােড় ঘুরছি, ততবারই দেখছি একটা প্রকাণ্ড মাকড়সা আমার পথ আগলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রকাণ্ড দুটো জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ দিয়ে আমাকে দেখছে। একবার একটা মাকড়সা হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে এসে তার একটা প্রকাণ্ড কালাে লােমে ঢাকা পা আমার কাঁধের উপর রাখতেই আমার ঘুম আর স্বপ্ন একসঙ্গে ভেঙে গেল, আর দেখলাম ফেলুদা আমার কাঁধে হাত রেখে ঠেলা দিয়ে বলছে
এই তােপসে ওঠ! হরিদ্বার এসে গেছে।
‘পাণ্ডা চাই, বাবু পাণ্ডা ?
‘বাবুর নামটা কী ? নিবাস কোথায় ? ‘এই যে বাবু, এদিকে ! কোন ধর্মশালায় উঠেছেন বাবু ? ‘বাবা দক্ষেশ্বর দর্শন হবে তাে বাবু ?
প্ল্যাটফর্মে নামতে না নামতে পাণ্ডারা যে এভাবে চারিদিক থেকে হেঁকে ধরবে সেটা ভাবতেই পারিনি। ফেলুদা অবিশ্যি আগেই বলেছিল যে এরকম হয়। আর এই সব পাণ্ডাদের কাছে নাকি প্রকাণ্ড মােটা মােটা সব খাতা থাকে, তাতে নাকি আমাদের সব দুশাে তিনশাে বছরের পূর্বপুরুষদের নাম ঠিকানা লেখা থাকে—অবিশ্যি তাঁরা যদি কোনওদিন হরিদ্বার এসে থাকেন তা হলেই।
Read More