খোঁজ নেওয়া হয়েছে রে বাবা। ছেলে খুব ভাল। সবচেয়ে বড় কথা, বড় বংশের হেলে তাে, খুব বেশী খারাপ হয় না। সঙ্গ দোষে যদি একটু খারাপ হয়ও, ঠিক শুধরে যায়।
ও, বংশ বংশ করেই তােমরা গেলে। বড় বংশে কি দোষ কিছু কম ছিল? তাের সঙ্গে পারি না আমি। আয়, আমার কাছে আয় কটকটি, তােকে একটু আদর করি।
এই একটা ব্যাপারে যশােধরার কখনও আপত্তি নেই। সে অফুরন্ত আদর খেতে পারে। সুনয়নী বলা মাত্র সে মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ল। একটু জড়াজড়ি করে থাকার পর মেয়ের বাঁ হাতটা তুলে কড়ে আঙুলে একটু কামড় দিলেন সুনয়নী। পুঃ পুঃ করে একটু থুতু ছিঠানাের ভান করলেন। তারপর মেয়ের মুখখানা দুহাতে তুলে ধরে চোখের দিকে চেয়ে বললেন, বাপ কিছু কি হতে পারে? ঠাকুরকে কত ডাকছি। কিছু খারাপ হবে না মা।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২২
যশােধরার সঙ্গে তার বাবার এত ঘনিষ্ঠতা নেই। জায়নাথ রাশভারী মানুষ। অসম্ভব ব্যক্তিত্ববান বুদ্ধিমানও বটে। জ্যাঠামশাই একটু শৌখিন আর ভাবালু মানুষ। দেশভাগের পর জয়নাথ হাল না ধরলে দুর্দশায় পড়তে হত তাঁদের। জয়নাথ এদেশে এসেই জমিদারি চাল ছেড়ে ব্যবসাতে নেমে পড়েন। এই কঠোর বাবার সঙ্গে যশাধরার একরকম দেখাসাক্ষাৎই হয় না। তবু যশােধরা কেমন করে যেন টের পায়, দুনিয়াতে মায়ের চেয়েও বােধহয় ওই লােকটি তাকে বেশী ভালবাসে। কি করে টের পায় সেটাই এক রহস্য। আদিখ্যেতা কিছু নেই বাবার। কিন্তু গভীর এক চোখ আছে। আর আছে গভীর ভালােবাসা থেকে জন্মাননা এক অদ্ভুত অনুমানশক্তি। যশােধরার সব রকম অসুখ-বিসুখ বা ছােটোখাটো ব্যাথা–বেদনায় বাবা ঠিক বাতাসে খবর পেয়ে চলে আসে কাছে। জ্বত মাথায় বাবা হাতখানা রাখলেই যেন শরীর জুড়িয়ে যায়।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২২
ব্যাবসার কাজে জয়নাথ নানা জাগায় ঘুরে বেড়ান। যশােধরা আর কতটাই বা কাছে পায় বাবাকে ? তবু বিয়ে হয়ে গেলে বুঝি বাবার জন্যই তার সবচেয়ে বেশ কষ্ট হবে। সেই কষ্টটার নয় যদি দশা হয়, মাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট তবে সারে নয়। তার জ্যাঠা আছে, জ্যাঠাইমা আছে, অন্য সব তুতাে বােন আর ভাইয়েরা আছে, পােষা পাখি, পােষা কুকুরে, তিনটে বেড়াল, এমন কি ওই কুঠিঘাটের গঙ্গা, এখনকার আলাে–বাতাস, ফুলের বাগান, আর এই যে তাদের মায়ের মতাে মিষ্টি বাড়িটা, কার জন্য কষ্ট কম ? নম্বর দিয়ে দেখছে যশােধরা, অনেক হয়। অনেক। তার বদলে কী পাবে যশােধারা কে জানে!
সকালটা বেশ কাটল। পাড়ি করে সবাই হৈ-হৈ করতে করতে দক্ষিণেশ্বর যাওয়া; দক্ষিণেশ্বর মন্দির তাদের অচেনা জায়গা নয়। কোনও শুভ কাজ ঘটবার আগে এখানে পুজো দিতে আসবেই; চেনা লােক আছে, ডিড় থাকলেও তাদের ঠিক আগে ঢুকিয়ে দেয়।
আজ যশােধরার প্রণাম অন্য দিনের মতাে হল না। দুরুদুরু বুকে অনেকক্ষণ মাথা পেতে রাখল মন্দিরের শানে । যেন নিবেদন করে দিল নিজেকে ভাল মন্দ সে কিছুই জানে না। আর কেউ তার ভাল মন্দের তার–নিক।
শশুরবাড়িকে আজকাল সব মেয়েই ভয় পায়। কত মেয়ে মরছে, খুন হচ্ছে। আজ স্বামী, শাড়ি. দেওর, শ্বশুর ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। কী বিচ্ছিরি সব কাণ্ড যে হচ্ছে।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২২
দুপুরে কোনওদিন ঘুমােয় না যশােধরা। আজ খেয়ে দেয়ে উঠতেই মা বলল, একটু শুয়ে থাক । মুখচোখ বড় বকনাে দেখাচ্ছে।
যশােধরা ঝংকার দিল, ইস, ওদের জন্যে সুন্দরী হতে হবে বুঝি! অত লাগে না। আ আয়, দুঞ্জনে শুয়ে শুয়ে গল্প করি।
না তাে, আমি ফ্ল্যাঠাইমার ঘরে একটা পান খেয়ে ইতি-মিতিদের সঙ্গে ছাদের ঘরে গিয়ে বাচ্চা নেবাে।
না রে বাবা, আজ পান খেয়ে কাজ নেই। দাঁতগুলাে লাল দেখাবে। ৪০
দেখাক গে । অত পাত্তা দিও না তো মা। তােমাদের সম্মান রাখতে সামনে গিয়ে বসব সেটাই ঢের।
সুনয়নী মেয়ের সঙ্গে কোনওদিনই এটে ওঠেন না। শাসন করার ধাত তার নেই, তারওপর বড় আদরের মেয়ে। এত আশকারা পেয়েছে যে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ওর বড় কষ্ট হবে। সুনয়নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আজকাল লেটার বক্সে পাড়ার বদমাস ছেলেরা যশােধরার নামে নানারকম প্রস্তাব তুলে চিঠি দিয়ে যায়। ওর কলেজের একজন অধ্যাপক আর একজন অধ্যাপককে যশােধরাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল জয়নাথের কাছে। একজন সিনেমার লােক যশােধরাকে সিনেমায় নামানাের কথা বলতে এসেছিল। এ ছাড়া রাস্তায় বেরােলাে পেছনে লাগা তাে আছেই। ওই আগুন রুপ কি আর পােকমাকড়দের টানবে না! তবে যশােধরা ভাল মেয়ে। একটু বােধ হ, অহংকারীও। কাউকে পাত্তা দেয়নি।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২২
সুনয়নী হাতে ঘড়ি বেঁধে একটু শুলেন। ঘুম হবে না। পাচটা ওরা এস পড়বে। পাত্র নিজে আসবে না। পাত্র কেন আসবে না সেটাই ভাবছেন সুনয়নী । মা বােনেরা যাকে পছন্দ করে দেবে তাকেই বিয়ে করবে এমন পাত্র কি আজকাল আছে নাকি? বিশেষ করে যে পাত্র আমেরিকায় থাকে।
ভাসুরঠাকুর অবশ্য বারবার বলেছেন, পাত্র ওল্ড ভ্যালুজে বিশ্বাসী বলেই মেয়ে দেখতে চাইছে । আরে নেই-নেই করে এবনও ভ্যালুজ বলেই কিছু আছে।
তাই হবে। তবু একমাত্র সন্তানের ভাবনায় মায়ের মন নানা কথা ভেবে যায়।
চারটের সময় সাজানাে শুরু হল যশােধরাকে । সুনয়নী আর তাঁর জা দুজনে মিলে একটা বালুচরি শাড়ি পছন্দ করে রেখেছেন। নীলচে রঙে ময়ূরকণ্ঠী জমি। তাতে কলকা বুটি। আর আঁচলে রামায়ণের ভেপিকশস, নানা রঙের সুতােয় কাজ করা।
Read More