জ্যাঠইমা সুচেতা আর সুনয়নী দুজনেই ঝোলাঝুলি করে হাল ছাড়লেন । সুচেতা হতাশ গলায় বললেন, দে, মুখপুড়িকে সাদা বেনারসীটই বের করে দে। এই ভূতটাকে তাে সবই বানায় ।
আদরের বকা। তবু ফোঁস করে ওঠে যশােধরা, ওসব চালাকি ছাড়া তাে বড়মা: কায়দা করে বেসরসী পরাবে তা হবে না।
তাহলে ট্যানা পরে সামনে যাস। ওরে অত হ্যাক ছি করতে নেই। তারাও ফ্যালনা নয়।
তা হােক, তবু কাউকে খুশি করতে আমি এই দিনদুপুরে অত ঝকমকে সাজ করতে পারবে না। তােমরা সরাে তাে, ও ঘরে যাও দুজনে । গিয়ে আমার মুণ্ডপাত করাে। আমি আমার পছন্দমতাে সেজে নিচ্ছি।
সুচেতা সুনয়নীর দিকে চেয়ে করুণ গলায় বললেন, তাই করাে। চল ও-ঘরে গিয়ে বসি নিজেই সেজে আসুক। কথাটা হয়তো মিথ্যেও বলেনি। আমাদের একটু সেকেলে নজর ।।
পরাজিত দুই মহিলা পাশের ঘরে গেলেন। যশােধরা কিছুক্ষণ আলমারি খুলে তার অজস্র হ্যাঙ্গারে ঝােলানাে শাড়ির দিকে চেয়ে রইল। পুজোয়, দিনে, ষষ্ঠীতে, নববর্ষে জ্যাঠা দেয় জেঠিম দেয়,বাব দেয়, আবার নাও দেয়। পছন্দ হলে সে নিজেও দোকান থেকে কিনে আনে। কত জমেছে তার শাড়ি, সালােয়ার কামিজ, চুড়িদার, রাজস্থানী পোশাক, মেসােহেবী পােশাক । মা অবশ্য শাড়ির দিন • বেহেছে নে একটা তাঁতের শাড়ি বের করল । সরু সবুজ পাড়, জমিটা মাজা বা
হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
রঙের। খুব উজ্জ্বল নয়। মুখে প্রসাধন ছোঁয়াল না, শুধু টার্কিস তােয়ালে দিয়ে মুছে নিল। চুল এলােই রইল ।
এসে দেখে যাও পছন্দ হয়েছে কিনা।
সুনয়নী আর সুচেতা ঘরের দরজায় পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালেন। সাজেনি, তবু কী অপরুপ দেখাচ্ছে।
সুনয়নী গম্ভীর হয়ে বললেন, কুঁচিটা ঠিক করে নে। যা খাইয়েছে দুপুরে, নিচু হতে পারছি না। সুচেতা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন, আমিই দিচ্ছি ঠিক করে। সব ঠিকঠাক হলে একটা শ্বাস ফেলে যশােধরা এলে, নাও, এবার আমি যুদ্ধের জন্য তৈরি। আহা, যুদ্ধ। যুদ্ধ কিসের রে? ওরা কি তাের শত্রু? পাত্রপক্ষ মানেই আজকাল মেয়েদের শg খুব পণ্ডিত হয়েছে! ইতি আর মিতিকে ডেকে দেবে বড়মা? মযার্ন সাজ তাে তােমরা বােঝে না। ওরা বুঝবে।
দিচ্ছি ডেকে বাবা। তবে বলি যা সেজেছাে তাতেই হবে। তােমার তাে সাজ লাগে না। কিন্তু বলি, গুরুজনের কথা অমানি করার অভ্যাসও ভাল নয়। শ্বশুর বাড়ি গেলে বুঝবে।
ইন, গুরুজন! ওরা আবার একজন নাকি! তােমরাই আমার গুরুজন। তােমাদের তাে অন্য সময়ে অমান্য করি না।
সুনয়নী মৃদু স্বরে বলেন, তা করাে না। কিন্তু এখনই বা করলে কেন? আজকাল খুব উইমেন লিব করতে শিখেছে, না?
যুগের ধর্ম মা, কী করে ঠেকাবে? কনেবউ সাজা আমাদের পােষাবে না।
সুচেতা সুনয়নীর দিকে চেয়ে বললেন, আর ঘাঁটাসনি, যা হয়েছে তাই হয়েছে। ও সাজলেও পছন্দ করবে, না সাজলেও করবে।
সুনয়নী মুদু স্বরে বলেন, এত সােজা নয় দিদি। পাত্রপক্ষ যদি বুঝতে পারে, ইচ্ছে করেই সাজেনি, তাদের পাত্তা দিতে চাইছে না বলে,তখন তাে আর রুপটাই বিচার করবে না, স্বভাবটাও দেখবে ।
থাকগে, যেতে দে। সাজেনি বলে তাে আর মনে হচ্ছে না। প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ হল।
হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
অভয়নাথ আর জয়নাথ ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাইরের ঘরে বসে ছিলেন। সাবেক বৈঠকখানায় এখনও কয়েকখানা তৈলচিত্র । সবই পূর্বপুরুষদের পাের্ট্রেট, সােফা আছে, আবার পুরনাে আমলের নচু বৈঠকখানাও বিদেয় হয়নি। তাকিয়ার বন্দোবস্ত আজও আছে। অভয়নাথ গান-বাজনার লােক। মাঝে মাঝে এ-ঘরে জলসা হয়।
অভয়নাথ ঘড়ি দেখে বললেন, অলকের একটা পাল্টা টেলিফোন আসা উচিত ছিল এতদিনে। জয়নাল মৃদু স্বরে বললেন, আসবে । সেইরেসপনসিব ছেলে নয়।
ইররেসপনসিবল না হলেও একটু ঢিলে স্বভাবের আছে। ওর খারটা:পাওয়ার আগে পাত্রপক্ষকে ময়ে দেখানােটা আমার ইচ্ছে ছিল না। দেরী করছে এদিকে পাত্ৰক্ষেরও তাড়া। এত তাড়াহুগােই বা কন বুঝি না।
কানাথ গভীর চিন্তামগ্ন । এ কথার জবাব দিলেন না।
অভয়নাথ বললেন, অবনীবাবুকে অবশ্য চিনি। সামান্যই পরিচয়। লােকটি চমৎকার। এখন ছেলে ভাল হলেই ভাল।
জয়নাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, কিছুই আমাদের হাতে নয় দাদা। উই টেক ডিসিশান অন হােপ অ্যান্ড ডিজায়ার ।
সেটা ঠিক । কিন্তু ছেলেটাকে দেখলি কেমন?
খরাপ নয়। তবে ওই একঝলক দেখা। কোথায় যেন বেরিয়ে যাচ্ছিল, ওর মা ডেকে পরিচয় করিয়ে দিল। মিনিট দুয়েকের দেখা।
পা ছুঁয়ে প্রণাম করল?
না। হাতজোড় করে। অভ্যেস নেই বােধহয়। অভ্যেস ওর না থাকতেই পারে। কিন্তু ওর মা তাে ছিল, সে কেন বলল না পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে? তার মানে সহবত জানে না।
আজকালকার ছেলে। সবাই তােরাও কথা বললে কেমন করে হয়? আজকাল বসতেই বি
অরজিকতা, ঔদ্ধত্য?
জয়নাথ মৃদু হাসলেন, দালা, বিয়ে তাে এখনও ঠিক হয়নি। কাটিয়ে দেওয়ার অনেক সময় আছে, পছন্দ না হলে ।
কিন্তু দেখে ফেলেছে যে! খামােখা মেয়েকে এক্সপােজ করব কেন যদি সম্ভাবনা না থাকে?
বলেছি তো, ইচ্ছে না থাকলেও ভুদ্রহিলার চাপাচাপিতে রাজি হতে হল । এত চাপাচাপি কিসের? ছেলে আমিরিকায় থাকে, সেখানে কি হয় না হয় । কতরকম ভয়ভীতি থাকে মানুষের।
হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
তার মানে ছেলের ওপর কনফিডেন্স নেই । এটাও ভাল লক্ষণ নয়। যে ছেলেকে তার মা বিশ্বাস করে না তাকে আমরা বিশ্বাস করি কিভাবে?
মায়ের মন একটা আলাদা ব্যাপার । অকারণ আশঙ্কা মায়েদের স্বভাবগত। বউমা বলেছিলেন ছেলে যে নিজে মেয়ে দেখতে আসছে না এটা তাঁর ভাল লাগছে না। হ্যাঁ, আমাকেও বলেছেন। সেটা নিয়ে ভেবেছিস?
, ভেবে কী হবে? তাঁরা জাস্ট মেয়েটাকে একটু দেখতে চান। আমরা দেখাচ্ছি। উই গুড লুক বিফোর উই লিপ। হ্যাঁ, সে তাে বটেই।
বাইরে গাড়ির একটা হন শােনা গেল। দুই যুগপৎ বেরিয়ে দেখলেন, পাত্রপক্ষ এসে গেছে । চারজন আসার কথা ছিল। কিন্তু গাড়ি থেকে নামল পাঁচজন।
জয়নাথ চাপা গলায় বললেন, ছেলেও এসেছে দেখছি। কোনা এই সব্যর পিছনে।
Read More