পাত্র এসেছে এ খবরটা ভিতর বাড়িতে রটে যেতে দেরী হল না। সামান্য একটু হুড়ােহুড়ি আর উকিঝুঁকি পড়ে গেল দোতালার বারান্দায়, অলিন্দে ।

এ বাড়িতে এখনও নহবৎখানা আছে, দেউড়ি এবং দাবােয়ান আছে, মালী আছে, ফর্সা ধুতি বা পায়জামা পরা এবং কাচা গেঞ্জি গায়ে তিনচারজন চাকর আছে, ছ‘ফুট লম্বা দেয়ালঘড়ি আছে, বাগানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা আছে দেখে ঈষৎ বিশ্বিত পাত্রপক্ষ দোতালায় উঠে এল। দুজন পুরুষ তিনজন মহিলা।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২৪
হলঘরে সাবেক আমলের আবলুস কাঠের মস্ত খাওয়ার টেবিল, তাকে ঘিরে মানানসই ভারী এবং অনড় চেয়ার। বসলে মচাৎ করে শব্দ হয় না। গদিগুলােও আরামদায়ক ভাবে নরম। মােটা দেয়াল এবং চুন সুড়কির গাঁথুনি, দরজায় জানালায় খস লাগানাের নীট ফল, ঘরটা বেশ ঠান্ডা। এয়ার কন্ডিশনের মতােই। বাতাসে রুম ফ্রেশনার ছড়ানাে রয়েছে। মৃদু সুবাস ।।
টেবিল ঘিরে পাত্র বসলেন। চারজনের জায়গায় পাঁচজন আসায় চেয়ার কম পড় না। অভয়নার ও জয়নাথএকটু দূরে মুখখামুখি বসলেন। কিছু বেমানান দেখাল না।
জ্যোৎস্না সামান্য কুষ্ঠিত গলায় জয়নাথের দিকে চেয়ে বললেন, ওকেও নিয়ে এলাম। রওনা হওয়ার মুখে মুখে ধনবাদ থেকে ফিরল । জোর করেই এনেছি। গাড়ির জামাকাপড় অবধি ছাড়তে দিইনি।
অভয়নাথের মুখ চোখ দুই-ই গম্ভীর । পাত্রের এই হঠাৎ-আসাটাও তিনি ভাল চোখ দেখছেন না। | জ্যোৎস্নাই বললেন, ভেবে দেখলাম, আপনারা বিশিষ্ট দ্রলােক, আপনাদের বারবার বিরক্ত করা ঠিক হবে না। আমরা পছন্দ করে যাওয়ার পরও যদি ছেলে হঠাৎ নিজে মেয়ে দেখার বায়না করে।
তার চেয়ে একবারেই দেখে নেওয়া ভাল।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২৪
সে তাে বটেই। কথার মাঝখানে চাকর সরবত নিয়ে এল । সঙ্গে ঘরে কাটা ছানার সন্দেশ। আগে যেয়ে দেখি।
, আগে মিষ্টিমুখ। অভয়নাথের গম্ভীর ঘােষণা।
এ–বাড়ির আবহাওয়াটাই কিছু গম্ভীর ঠেকল পাত্রপক্ষের কাছে। একটা পুরনাে সাবেক কালের গেরামভারী বাতাস যেন থমকে থেমে আছে । লিলিও পাখা তাকে নাড়াতে পারছে না। গঙ্গার হাওয়া তাকে তাড়াতে পাছে না।
পাত্রপক্ষ অগত্যা সরবতে চুমুক দিল এবং সন্দেশ কামড়াল। ভিতরের ঘরে সুনয়নী মেয়েকে বললেন, আয় মা, ওঁরা অপেক্ষা করছেন।
মা, ওরা কথা বলছেন। ওঁদের কথা শেষ হােক, তারপর যাবো। ও মা! কথা বলছেন তাে কী হয়েছে!
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২৪
কথার মাঝখানে আমি যাবাে কেন? ওঁরা কথা থামাক, তৈরি হােক, অপেক্ষা করুক। তবে যাবাে। সব ব্যাপরেই একটা মােমেন্ট আছে মা, যেমন–তেমনভাবে কিছু করতে নেই।
কোথায় যাবাে বাবা! গুয়ের গ্যাংলা মেয়ে আমাকে কত কিছু শেখাচ্ছে। আমি অত সস্তা হতে পারি না মা। আর আমার তাে তাড়া নেই। ওদের তাে থাকতে পারে।
অত তাড়া নিয়ে আসে কেন? যাও, ওদের চুপটি করে বসতে বলল। আর খাওয়া শেষ করুক। সন্দেশ চিবােতে চিবোতে আর সরবতে চুমুক দিতে দিতে হেলাফেলা করে তাকাবে ও চলবে না।
বাবা রে বাবা! এত বায়নাক্কা থাকলে জীবনে সুখী হওয়া শক্ত হবে না। মাথাটার মধ্যে তাের কী সব খেলছে সবসময়ে বুঝতেই পারি না।
সুনয়নী গজগজ করলেন বটে, কিন্তু আর ঘটালিন না। চাকর হরিশঙ্করকে ডেকে বললেন, নজর রাখিস, পাত্রপক্ষের খাওয়া শেষ হলে আমাকে খবর দিবি।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২৪
জানালার ধারে একটা মােড়ায় বসে গঙ্গার দিকে চেয়ে রইল যশোধরা । তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। বুক শুকিয়ে উঠছে। এ বাড়ি থেকে বিদায়ের বাজনা বাজছে । সব মেয়কেই পরের ঘরে যেতে হয়। সেজন্য সে কি ছেলেবেলা থেকে মনে মনে তৈরি নয়? তৈরিই, তবু ঘটনাটা যখন ঘটতে
করে তখনই একটা উল্টো টান যেন বড় বেশী টের পাওয়া যায় ।
হরিশঙ্কর এসে খবর দিল, খাওয়া শেষ হয়েছে মা। সুনয়নী মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন, আমি ওদের চুপ করিয়ে দিতে যাচ্ছি। দয়া করে আমার পিছু পিছু এসাে কিন্তু। সুনয়নী হলঘরে ঢুকে পাত্রপক্ষের উদ্দেশে হাতজোড় করে বললেন, আমার মেয়ে আসছে। চুপ করানাের পক্ষে এই ঘােষণাই যথেষ্ট। পাত্রপক্ষ স্থির হয়ে দরজার দিকে চেয়ে রইল ।
যশােধরা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে মুহুর্তটিকে রচনা করে নিল। যেন নাটকের কোনও ভূমিকায় বিশেষ নাটকীয় মুহূর্তে সে প্রবেশ করেছ । অমনােনীত হওয়ার ভয় তার নেই। কিন্তু সবকিছুই ঘটাতে চায় তার নিজের মতাে করে । | যশোধরা পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকতেই পাত্রপক্ষ চুপ থেকে নিথর হয়ে গেল। ঘরের আবহাওয়ায় যেন সঞ্চারিত হল একটা মৃদু আলাে।।
এই মুগ্ধতা নিজের সর্বাঙ্গে অনুভব করে যশােধরা। আর এজন্যই সে মুহুর্তটিকে রচনা করতে চেয়েছিল। শেষ অবধি অবশ্য সেই ক্রীতদাসী হওয়াই হয়তাে সব বিয়ের পরিণতি। দুনিয়ার মেয়েরাই সবচেয়ে সস্তা পণ্য সস্তার ঝি, সস্তার বঁধুনী সস্তার সেবদিবাসী। যশােধরা সেই ঐতিহ্যকে ভেঙে ফেলার শক্তি বাখেন এখনও। কিন্তু তবু তার সাধ্যমতাে সে নিজেকে অপমানিত হতে দিতে চায়না। যত সূক্ষ্মই হােক।
হা, তার কপাল অবশ্যই কষ্ট আছে। সে জানে ।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২৪
আর কেই নয়, সবার প্রথমেই সে দেখতে পেলতােতনকে। প্রথম নজরেই। জিনসের প্যান্ট আর সাদা ফতুয়া পরা। দেখতে আহামরি কিছু নয় খুব বেশী সুন্দর পুরুষকে ভালও লাগে না যশােধরার। এ হলেটা সেরকম সুন্দর নয়। চোখ দেখলেই বােঝা যায়, এ অন্যমনস্ক, ভুলাে স্বভাবের লােক। প্রাকটিক্যাল নয়। এর ওপর প্রভাব বিস্তার করা সহজ। আর এখানেই মুশকিল। তােতন একবার তাকিয়েই নববধুর মতাে চোখ নত করে ফেলেছে। অস্বস্তি বােধ করছে সে। শুধু তিনজোড়া মেয়ে চোখ পলকহীন এবং স্থির হয়ে আছে তার ওপর।
সনােহন সম্পূর্ণ । মুহূর্তটি রচিত হয়েছে। যশােধরা কিছুক্ষণ স্থির প্রতিমার মতাে দাঁড়িয়ে থেকে সন্মােহনটা ভেঙে দিল। হাতজোড় করে একটা নমস্কার করল সে। তারপর দেয়ালের কাছে ঘেঁষে রাখা নির্দিষ্ট চেয়ারে বসল।
পাত্রপক্ষ এতক্ষণ যাদু ইয়ে থাকার পর এখন একযােগে ব্যক্তির বাস ফেলল।
সে কতােখানি এদের ইমশ্রেস করে তা জেলার আয় কশাস করে বােঝা গেল, আমার কি এমন ভাগ্য হবে যে, এক বউ করে ঘরে নিয়ে যেতে পারব। এ যে লক্ষীপ্রতিমা।
অনাথের দিকে অভয়নাথ এমনভাবে তাকালেন যার অর্থ হ, কেমন বুঝয়ে? জয়নাথ বিম্বিত বলেন না, কারণ একমই তাে হওয়ার কথা।
Read More