প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

বড় আপা মাকে ডেকে আনল এবং দুপুররাতে মা আমার পেটে তেল মালিশ করতে লাগলেন।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

কৈশােরের সেই বিরহ দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। আমি যথারীতি পরীক্ষা দিই এবং সবাইকে অবাক করে একটি লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করে আনন্দমােহন কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ি। 

এই আচার-খাওয়া মেয়েটির সঙ্গে খুব সম্ভব নীলিমার কোনাে মিল নেই, তবু মাঝে মাঝে এই মেয়েটিকে নীলিমা ভাবতে ভালাে লাগে। শুধু এই মেয়েটিকে কেন, পৃথিবীর সব বালিকাকেই আমার কাছে নীলিমা বলে মনে হয়। 

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আমি পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায় তুমুল বর্ষণ হচ্ছে বাইরে। চারদিক অন্ধকার। ইলেকট্রিসিটি নেই। মনসুরের আসবার কথা চারটায়, বৃষ্টিতে আটকা পড়েছে নিশ্চয়ই! দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি, বারান্দায় হারিকেন জ্বালাবার চেষ্টা করছেন করিম সাহেব। তার ঘর থেকে শোঁ-শোঁ শব্দ আসছে। কুকারে ভাত চড়িয়েছেন বােধহয়। করিম সাহেব আমাদের মতাে হােটেলের খান না। নিজে রান্না করেন। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

এই যে ফরিদ ভাই, আজ শরীরটা কেমন ? ভালােই। ব্যথা-ট্যথা নেই তাে ? জি-না। ঘুমিয়েছিলেন নাকি? জি। দেশ ভাসিয়ে দিয়েছে বৃষ্টিতে। ক্যাটস্ অ্যান্ড ডগ যাকে বলে। চা খাবেন কি ? জি-না, থাক। আসেন আসেন, এক কাপ চা খান। চা সবসময় খাওয়া যায়। করিম সাহেবের ঘরে গিয়ে বসতে হলাে। চাও খেতে হলাে। আজকাল লােকজন আমাকে খুব খাতির করছে। অপারেশনের ডেট দিয়েছে ? জি-না। 

অপারেশন আজকাল ডালভাত হয়ে গেছে। ভয়ের কিছুই নাই। তলপেটের অপারেশন তাে এখন চোখ বন্ধ করে বা হাতে করে। হা-হা-হা । আমি চুপ করে রইলাম । পরিচিত-অপরিচিত প্রায় সবাই এখন আমাকে বােঝাতে চেষ্টা করে অপারেশনটা কত সহজ। আমার দিক থেকে তার কোনাে প্রয়ােজন নেই। অপারেশনটা সহজ কিংবা জটিল, তাতে কিছু যায় আসে না। করিম সাহেব চায়ে চিনি মেশাতে মেশাতে বললেন, কত্ত সিরিয়াস অপারেশন এখন হচ্ছে— হার্ট, ব্রেইন। একেবারে ছেলেখেলা ব্যাপার। তা ঠিক। 

করিম সাহেব ভাত টিপে দেখলেনু তারপর বেশ আন্তরিকভাবেই বললেন, আজ চারটা ভাত খান-না আমার সঙ্গে, খাটি গাওয়া ঘি আছে। বেগুন ভাজা, গাওয়া ঘি। তার সঙ্গে শুকনাে মরিচ ভেজে দেব। খারাপ লাগবে না। আজ থাক। আরেকদিন খাব। আজ অসুবিধা কী? বৃষ্টির দিন হােটেলে যেতে কষ্ট হবে । আসেন দুজনে মিলে খাই।। আমাকে নিতে আসবে, এক জায়গায় খাওয়ার কথা আছে। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আসবে কীভাবে? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

কথাটা সত্যি। বেশ দুর্যোগ বাইরে। রাস্তায় বাতিও নেই। মনসুর আসতে পারবে বলে মনে হয় না। তবুও সে আসবে। আমি আমার অন্ধকার ঘরে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মােমবাতি আছে, তবুও জ্বালাতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কে যেন বলেছিল- প্রতীক্ষা করতে হয় অন্ধকারে। বােধহয় মিলনের প্রতীক্ষার কথা বলা হয়েছে। বসে থাকতে থাকতে আটটা বেজে গেল। আমি যখন প্রায় নিশ্চিত মনসুর আসবে না, তখন সে এলাে। গা দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ঝড়াে কাকের মতাে চেহারা, কাঁপছে ঠকঠক করে । রিকশা দাঁড় করিয়ে এসেছি, চল।

মনসুরের বাসায় যেতে আমার ভালাে লাগে না। সে নতুন বিয়ে করেছে। নতুন বউরা স্বামীর বন্ধুদের সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এমন ভাব দেখায় যেন স্বামীর বন্ধুদের জন্য খুব ব্যস্ত। মনসুরের বউ সে ভাবটাও দেখায় না। সে স্পষ্টতই বিরক্ত হয়। সবাই তার বিরক্তি ধরতে পারে। মনসুর পারে না। উঠতে গেলেই মনসুর বলে, এত তাড়া কী রে, আরেকটু বােস, আরেকটু বােস। 

মনসুরের স্ত্রী রীনা তীক্ষ কণ্ঠে বলে, বসতে বলছে, বসুন না। মনসুর তাতে উৎসাহ পায়। হাসিমুখে বলে, রীনা, আমাদের একটা গান শােনাও না। প্লিজ! আজ না, আরেক দিন।। আহ, শােনাও না! এই, তােরা একটু রিকোয়েস্ট কর না! তােরা রিকোয়েস্ট করলে শােনাবে। রিকোয়েস্ট করতে ইচ্ছে হয় না, তবু করতে হয় এবং এক সময় রীনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত শােনায়– আজি এ বসন্তে…। 

মাঘ মাসের দুর্দান্ত শীতে বসন্তের গান শুনে আমরা প্রশংসা করি। মনসুর দাঁত বের করে হাসে। এর বুদ্ধিসুদ্ধি এমনিতেই কম। বিয়ের পর আরাে কমে গেছে। তার ধারণা হয়েছে, এরকম একটা ভালাে বিয়ে পৃথিবীর কেউ করে নি। শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে তার উৎসাহ সীমাহীন। কেনটাকিতে তার স্ত্রীর এক ভাই থাকে। তাদের নতুন কেনা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে ডেন্ট পড়ে গেছে। এই নিয়ে মনসুরের চিন্তার শেষ নেই। অথচ সে ভাইকে সে চোখেও দেখে নি। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

কাণ্ডটা দেখ, নতুন কেনা গাড়ি। সিক্স থাউজে ইউএস ডলার দাম। অবশ্যি ইনসুরেন্স আছে। সব কভার করবে। আমরা উৎসাহ না দেখালেও ক্ষতি নেই। মনসুর মুগ্ধ ভঙ্গিতে শ্বশুরবাড়ির গল্প করে যাবে বুঝলি ? আমার শ্বশুর সাহেবের ইচ্ছা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকা। গ্রামের বাড়ি হলে কী হবে, হুলুস্থুল ব্যাপার। বাড়ির পিছনে আলিশান পুকুর। গত বৎসর তিন হাজার টাকার রুইয়ের পােনা ছাড়া হয়েছে। এর মধ্যেই এক হাত বড় হয়ে গেছে। 

নির্বোধের মতাে গল্প। শুনলেই অস্বস্তি হয়। তবু শুনতে হয়। হাসতে হয় । ভান করতে হয় যেন খুব আগ্রহবােধ করছি। রীনা বসে থাকে পাথরের মূর্তির মতাে। তার চোখে-মুখে তাচ্ছিল্যের একটা ভাব। মনসুরের গল্পগুলি সে কীভাবে গ্রহণ করে বুঝতে পারি না।। আজ অবশ্যি রীনা খুব যত্ন-উত্ন করল। তােয়ালে নিয়ে এলাে মাথা মােছার জন্যে এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, মাথা নিচু করুন, আমি মুছিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার বিস্ময় গােপন করে বললাম, কোনাে রমণীর কাছে আমি মাথা নিচু করি না। চির উন্নত মম শির। 

রীনা একটু হকচকিয়ে গেল। আমি কথাবার্তা কম বলি । এরকম কিছু বলব শশী করে নি বােধহয়। মনসুর উঁচু গলায় বলল, আজ আমাদের ম্যারেজ-ডে । তাই নাকি? 

আরে গাধা, রীনার ড্রেস দেখে বুঝতে পারছিস না ? বিয়ের শাড়ি। তুই আর আমি গিয়ে কিনলাম নগদ দুই হাজার টাকায়। টাকা শর্ট পড়ল, তাের কাছ থেকে 1.লাম দুশ’ টাকা। মনে নেই কিছু ? 

শাড়ির ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ল না কেন? ঝড়-বাদলার দিনে কোনাে মেয়ে তাে এমন বেনারসি পরে ঘরে থাকে না। ঘরে অবশ্যি ইলেকট্রিসিটি নেই, হারিকেন জ্বলছে। তবুও এ আলােতেও তাে চোখে পড়া উচিত ছিল।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *