প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৫)

মনসুর নিচু গলায় বলল, কেকের অর্ডার দিয়েছিলাম, সেটা আনতে গিয়েই দেরি হলাে। কেকের উপর লেখা থাকবে– রীনার জন্যে। শালা শুয়ােরের বাচ্চারা লিখেছে— “মীনার জন্য। যে লেখে সেই ব্যাটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দেরি হলাে। শালা আর এলােই না। কাণ্ড দেখ। কেকটা আবার কেন ? 

রীনার ইচ্ছা খাওয়াদাওয়ার পর কেক কাটবে। বয়স তাে বেশি না, ছেলেমানুষ এখনাে । নে, একটা সিগারেট খা। খাবার গরম করতে সময় লাগবে।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

এখন অনেক কিছুই আমার চোখে পড়ছে না। এত বড় একটা কেকের বাক্স সঙ্গে ছিল, কিন্তু আমার চোখে পড়ে নি। আমি হালকা স্বরে বললাম, বিবাহ বার্ষিকী-টার্ষিকী নিজেদের মধ্যে করতে হয়। আমাকে শুধু শুধু ডাকলি কেন? 

মনসুর গলা ফাটিয়ে হাসল, যেন, আমি খুব একটা হাসির কথা বলেছি। আমি বললাম, উপলক্ষটা বললে একটা কিছু আনতে পারতাম। শালা, তুই আবার আবি কী ? শুধু ফর্মালিটি। 

মনসুর গভীর মনােযােগের সঙ্গে কেকের লেখা মীনাকে রীনা বানানাের চেষ্টা করতে লাগল। রীনা একবার জিজ্ঞেস করে গেল, চা দেব ভাই? খাবার দিতে দেরি হবে। একটা জিনিস ভাজতে হবে। কুমড়াে ফুলের বড়া। চা লাগবে না। খান-না একটু, আমিও আপনার সঙ্গে খাব। ঠিক আছে, আনুন।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

মনসুর গম্ভীর হয়ে বলল, রীনাকে তুই আপনি-আপনি করিস কেন ? তুমি করে বলবি। স্ট্রেইট তুমি। আমি কিছু বললাম না। ওর এই বিচিত্র স্বভাব, বন্ধুবান্ধবকে সে তাদের দু’জনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে চায়। এটা যে হবার নয়, তা বুঝতে চায় না। আমি হালকা সুরে বললাম, আর কাউকে বলেছিস ? নাহ, শুধু তােকে। অনলি ইউ। কেন, শুধু আমাকে কেন ? 

মনসুর তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি সহজভাবেই বললাম, তাের কি ধারণা আমি আর ফিরে আসব না ? মনসুরের মুখ কালাে হয়ে গেল। এই কথাটি তাকে না বললেই হতাে। কেন বললাম ? রীনা চা নিয়ে এসে বসল আমার সঙ্গে। বেশ লাগছে মেয়েটিকে। এমনিতে তাকে এতটা ভালাে লাগে না। আমি লক্ষ করেছি, অসুন্দর মেয়েদেরও মাঝে মাঝে অপরূপ রূপবতী মনে হয়, যেমন গায়েহলুদের দিন। শুধু এই দিনটিতেই কোনাে বিচিত্র কারণে তারা দেবীমূর্তির মতাে হয়ে যায়। 

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। আমরা চা খাচ্ছি নিঃশব্দে। রীনা খুব কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমি বললাম, আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

বিয়ের শাড়িতে সবাইকে সুন্দর লাগে। তাই না-কি ? 

এ্যা। 

আর কোনাে কথা পাচ্ছি না। মনসুর বসে আছে গম্ভীর হয়ে। সে কি কেকের মীনাকে রীনা করেছে ? আমি বললাম, কটা বাজে রে ? যতটা বাজুক, তুই বসে থাক চুপচাপ রাতে তােকে যেতে দেব না। বলিস কী! রীনা নিচু স্বরে বলল, হাসপাতালে ভর্তি হবার আগে কটি দিন আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। 

মনসুর বলল, আমি কাল সকালে তাের জিনিসপত্র সব নিয়ে আসব। নতুন জায়গায় আমার ঘুম হয় না। না হলে না হবে। ফালতু কথা! 

রীনা বলল, আপনি থাকবেন বলে আপনার বন্ধু চাদর-বালিশ এইসব কিনে এনেছে। না থাকলে ওর কষ্ট হবে। কয়েকদিনের ব্যাপার তাে, থেকে যান। 

আমি কঠিন স্বরে বললাম, মনসুর, আমি জানি আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে আসব না। কাজেই যে কটা দিন আমি আছি, আমাকে নিজের মতাে থাকতে দে। এই নিয়ে ঝামেলা করিস না। 

মনসুর গম্ভীর স্বরে বলল, এখানে তাে কোনাে কষ্ট হবে না। জানি কষ্ট হবে না। এখানে অনেক সুখে থাকব। তবু তুই আমাকে আমার মতাে থাকতে দে। রীনা বলল, আজকের রাতটা অন্তত থাকুন । বেচারা আপনার জন্যে নতুন চাদর বালিশ কিনেছে। 

আমি কিছু বললাম না। রীনা নরম স্বরে বলল, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে ফেরত যাবেন কীভাবে? রাতও অনেক হয়েছে। আজকের রাতটা থাকুন । এক রাতে কী হবে ? ঠিক আছে, থাকব। মনসুর মুখ কালাে করে বলল, ইচ্ছা না হলে থাকতে হবে না। 

কিছু-কিছু মানুষের বয়স বাড়ে না। তারা মনসুরের মতাে সারা জীবন শিশু থেকে যায়। আজ সারারাত সে হয়তাে কথাই বলবে না। অথচ আমাকে এখানে এনে জড়ানাের তার কোনাে প্রয়ােজন ছিল না। আজকের এই ঝড়-জলের রাত হচ্ছে তাদের দুজনের। আজ তাদের একটা চমক্কার উৎসবের রাত। আমার এখানে স্থান কোথায় ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

অপরিচিত জায়গায় অপরিচিত পরিবেশে আমি ঘুমুতে পারি না। তার উপর আজ বিকেলেই বড় একটা ঘুম দিয়েছি। আমি মশারির ভেতর গা এলিয়ে শুয়ে রইলাম। ঘুম আসবে না জানি, ঘুমাবার চেষ্টা চালিয়ে যাবার কোনাে অর্থ হয় না। 

মেঝেতে হারিকেন ডিম করা। কেমন গ্রাম-গ্রাম লাগছে। আলাে না থাকলেই বােধহয় ভালাে ছিল। কিন্তু মনসুর শুধু হারিনে নয়, একটা টর্চলাইটও বালিশের নিচে রেখে গেছে। যত্নের চূড়ান্ত করতে চেষ্টা করছে দু’জনেই। | টেবিলের উপর ঝকঝকে পানির জগ, গ্লাস। রাতে খিদে পেলে খাওয়ার জন্যে হরলিক্সের টিনে কিছু বিসর্কিট শােবার আগে রীনা এলাে মশারি গুঁজে দিতে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ছি-ছি ! আমি বুঝি মশারি খুঁজতে জানি না ? লাভ হলাে না। মনসুর কমপক্ষে দশবার বলল, অসুবিধা হলেই ডাকবি। আমার পাতলা ঘুম, একবার ডাকলেই হবে। 

ঘড়িতে রাত একটা। ফিসফিস করে ওরা কথা বলছে। এক বৎসর পরও এত কথা থাকে নাকি কারাে ? স্বামী-স্ত্রীর ভালােবাসার কথাবার্তা শুনতে বড় অস্বস্তি লাগে। ওদের কথাবার্তা অবশ্যি কিছুই বােঝা যাচ্ছে না, তবু বড় অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে একটা-কিছু অপরাধ যেন করে ফেলেছি। 

আমার বড় ভাইয়ের বিয়ের পরও এমন অবস্থা। তাদের লাগােয়া ঘরটিতে আমি থাকি। গভীর রাত পর্যন্ত দু’জন কথা বলে। শুনতে ইচ্ছা করে না, তবু শুনতে হয়। কত অর্থহীন কথাবার্তা। অর্থহীন রসিকতা। সকালবেলা ঘুম ভেঙে 

ভাবিকে দেখলেই বড় লজ্জা লাগে। চোখ তুলে তাকাতে পারি না, এমন অবস্থা। ভাবির আচার-আচরণ কিন্তু খুব স্বাভাবিক। সবার সঙ্গে হাসছে, গল্প করছে। নতুন নতুন রান্নাবান্না করছে। ভাবিকে দিয়ে আমাদের সংসারের শ্রী ফিরে গেল। বাবা পর্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলতে শুরু করলেন। মাঝেমধ্যে হাসতে লাগলেন। 

তারপর একদিন বাসায় এসে শুনি, বড় ভাই আলাদা বাসা করছেন। তাঁর শ্বশুর নাকি অল্প ভাড়ায় একটা বাসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। শুধু বাসাই নয়, তিনি নাকি তাকে কী-একটা সাইড বিজনেসের কথাও বলছেন।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *