এখনাে কিছু হয় নি। সে কী! আমি মাত্র গতকাল এসেছি।
তাতে কী, চব্বিশ ঘণ্টা তাে পার হলাে। এই যে ইয়ং ডক্টরস, তােমরা করছ কী ?
ইন্টার্নি ডাক্তাররা নার্ভাস ভঙ্গিতে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। ডাক্তার সাহেব এগিয়ে এলেন আমার ব্লমেটের দিকে।
জুবায়ের সাহেব, আছেন কেমন ? ভালাে। কী পড়ছেন ? থ্রিলার। ইন্টারেস্টিং নাকি ? আছে মােটামুটি। আপনার অপারেশন সিডিউল হয়েছে তাে ? জি, কাল। কী, নার্ভাস ? নাহ। দ্যাটস্ গুড। কখন টাইম দিয়েছে ?
সকাল এগারােটা। আজ বেশি রাত জাগবেন না। শুয়ে পড়বেন। জুবায়ের সাহেব কোনাে উত্তর দিলেন না। টেনশন কমাবার জন্য দুটি ট্যাবলেট দিচ্ছি, খেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুবেন । ঠিক আছে।
জুবায়ের সাহেব ঘুমুতে গেলেন না । রাত এগারােটা পর্যন্ত নিঃশব্দে থ্রিলার পড়তে লাগলেন। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম-সিগারেট খেতে চান কি না। নতুন এক প্যাকেট দামি সিগারেট দিয়ে গেছে রহমান, দিনে চারটার বেশি খাব
এই চুক্তিতে। জুবায়ের সাহেব সিগারেটের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেন না।
আমি চাদর টেনে ঘুমুতে গেলাম। তখন তিনি ডাকলেন। ফরিদ সাহেব। বলুন। লক্ষ করেছেন, অ্যানি আজ আসে নি ? জি, লক্ষ করেছি। আপনার কথাও ঠিক হতে পারে। কিসের কথা বলছেন ? ঐ যে বলছিলেন অ্যানি রাগ করেছে, কিন্তু জানতে দেয় নি। আমি কোনাে কথা বললাম না ।। কাল আমার অপারেশন, আজ তার আসা উচিত ছিল। ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল, আসতে পারেন নি।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)
ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে তাে অনেকেই এসেছে। তা ছাড়া সে আসবে গাড়িতে। ঝড়-বৃষ্টিতে তার কী অসুবিধা?”
হয়তাে মন-খারাপ হবে বলে আসেন নি, কিংবা হয়তাে শরীর খারাপ ।
দিন একটা সিগারেট। মন-খারাপের কথা যেটা বললেন সেটাই বােধহয় ঠিক। ওকে আপনার কেমন লাগল?
ভালাে। শুধু ভালাে ? বেশ ভালাে।
ও একটি একসেপশনাল মেয়ে। দূর থেকে এতটা বােঝা যায় না। ভালাে করে না মিশলে আপনি বুঝবেন না।
আমি চুপ করে রইলাম। জুবায়ের সাহেব গাঢ় স্বরে বললেন, অ্যানির সঙ্গে পরিচয় হওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার। পরিচয়টা স্থায়ী হলাে না।
এখনই এত নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে ?
তিনি থেমে থেমে বললেন, আমি নিজেও একজন ডাক্তার। দিন, আরেকটা সিগারেট দিন।
আমি প্যাকেট বাড়িয়ে দিলাম। ফরিদ সাহেব! জি ? আপনি কি বিয়ে করেছেন?
বিয়ে করেন নি কেন? বিয়ে করার মতাে সামর্থ্য কখনাে হয় নি।
শুধু এই জন্যেই বিয়ে করলেন না? হ্যা, এই জন্যেই । কোনাে মেয়ের সঙ্গে কি কখনাে পরিচয় হয়েছে ? আপনি যে অর্থে বলছেন সেই অর্থে হয় নি। ভালাে লাগে নি কাউকে ? লেগেছে। তাদের কাউকে কি তা বলেছেন ?
, বলা হয় নি। ফরিদ সাহেব। জি! বলেন নি কেন ? সাহস হয় নি।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)
বলা উচিত ছিল। অ্যানিকে কিছু বলার সাহস আমারও ছিল না। আমি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আর দেখছেন তাে আমাকে, বাঁশগাছের মতাে লম্বা। মেডিকেল কলেজে আমার নাম ছিল-~- বেঙ্গল বেম্বাে বাংলাদেশের বাঁশ। তবু আমি সাহস করে বলেছিলাম ।
অ্যানিও কি ডাক্তার ? হ্যা, সেও ডাক্তার। আমরা এক ইয়ারেই পাস করি। জুবায়ের সাহেব, ঘুমিয়ে পড়েন।
আজ রাতটা আমি জেগে থাকতে চাই। আজ সারা দিন কী ভেবে রেখেছিলাম জানেন ?
কী ?
অ্যানিকে বলব রাতটা এখানে থেকে যেতে। গল্প করে কাটিয়ে দেয়া যেত। আপনিও গল্প করতেন আমাদের সঙ্গে। অসুবিধা কিছু ছিল না। কী বলেন?
, অসুবিধা কী! ফরিদ সাহেব। বলেন। আপনি কি মৃত্যুর কথা ভাবেন ? হাসপাতালে আসবার আগে ভাবতাম, এখন ভাবি না। এর কারণ কী, জানেন ?
, জানি না। চূড়ান্ত ভয়ের মুখােমুখি হলে এড্রেলিন নামের একটা এনজাইম প্রচুর পরিমাণে আমাদের শরীরে আসে। তখন আর ভয়টয় থাকে না। আপনার রক্তে এখন এড্রেলিন প্রচুর পরিমাণে আছে। কাজেই ভয়টয় লাগছে না। যত দিন যাবে এড্রেলিনের প্রভাব কমে আসতে থাকবে। তখন আবার ভয়। আবার হতাশা।
আমি কিছু বললাম না। কথাটা হয়তাে সত্যি। হাসপাতালে আমার খুব একটা খারাপ লাগছে না। এই ক’দিন মৃত্যুর কথা একবারও মনে হয় নি। যা হবার হবে এরকম একটা ভাব চলে এসেছে। নাকি এরকম ভাব আমার মধ্যে সব সময়ই ছিল ?
মনে হয়, ছিল। সংসারে কারাে জন্যেই আমার কোনাে বিশেষ টান নেই। মা মারা যাবার তিন দিনের দিন আমি স্কুলের অন্যসব ছেলেদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিলাম। সেখানে মায়ের কথা একবারও মনে হয় নি। আমরা সবাই বােধহয় নিজেদের জন্যেই বাচি। জুব্বীয়ের সাহেব যদি সত্যি সত্যি মারা যান, আমার খুব কি খারাপ লাগবে ? সাপের মতাে লম্বা ফরসা একটা মানুষ মারা গেলে আমার কী যায় আসে ? শুধু আমার কেন, এ জগতের কারােরই কিছু যায় আসে না।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)
অ্যানি নামের এই চমৎকার মেয়েটি হয়তাে কিছুদিনের ভেতরই সুস্থ সবল একটি ছেলেকে বিয়ে করবে। ছুটির দিনে নাটক দেখতে যাবে মহিলা সমিতিতে। ভালােবাসার কথা বলাবলি করবে গভীর রাতে। এদের ঘরে আসবে চমৎকার একজন বাবু। খুব দুষ্টু হবে বাবুটি।
ভিজিটিং আওয়ার চারটায়। বাবা তিনটার সময় উপস্থিত। গেটে আটকে রেখেছিল, তিনি হৈ-চৈ চেঁচামেচি করে চলে এসেছেন।
কী রে, আছিস কেমন ? ভালাে। চিঠি পেয়েছেন তাে? হ্যা। আজই পেয়েছেন ? হা।
বাবা কী বলবেন তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার ব্যাপারে খোঁজ করবেন, নাকি বাবুলের পাঠানাে টাকার পরিমাণটা জিজ্ঞেস করবেন ? কোনটি তার কাছে বেশি জরুরি ? বাবা বললেন, টাকাটা তুলেছিস ?
ড্রাফট জমা দিয়েছি, ক্যাশ হতে সময় লাগবে। কতদিন লাগবে ? এই ধরেন, দিন সাতেক। কত টাক সেটা তাে জিজ্ঞেস করলেন না ? কত টাকা? লাখখানিক হতে পারে। বলিস কী! আরাে পাঠাবে। দেখেন, চিঠিটা পড়ে দেখেন।
Read more