প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৮)

বাবা চার-পাঁচবার চিঠিটা পড়লেন। এখনাে বােধহয় ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমি বললাম, রাজার হালে থাকবেন, এখন চিন্তা নেই কিছু। বাড়ি বানাতে চাইলে বানাতে পারেন। কিংবা টাকাটা ব্যাংকে রেখে তার ইন্টারেস্ট দিয়ে চলতে পারেন। যেটা ভালাে মনে করেন । 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদবাড়ি বানানােই ভালাে। একটা স্থায়ী ঠিকানা দরকার। বাবুলও তাে দেশে বেড়াতে-টেড়াতে আসবে। উঠবে কোথায় ? ওঠার জায়গা দরকার তাে। 

তা ঠিক। 

আর কিছু থাক আর না থাক, একটা বাড়ি সবার থাকা দরকার । একটা ঠিকানা থাকে। মানুষের একটা ঠিকানা দরকার। 

ফিলসফারের মতাে কথা বলছেন আমাদের বাবা–ফিলসফার অ্যান্ড ফ্রেন্ড। আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। সে মুখে বিস্ময় এবং আনন্দ! যেন চমৎকার একটি স্বপ্ন দেখছেন। এবং বুঝতে পারছেন এটা স্বপ্ন! যে-কোনাে মুহূর্তে ভেঙে যাবে। আমি হালকা স্বরে বললাম, বাবা, অনুকে আপনাদের বাড়িতে এনে রাখবেন! ওর অনেক কষ্ট । বাবা অবাক হয়ে বললেন, ওর আবার কিসের কষ্ট ? টাকা-পয়সা আছে, ঘরবাড়ি আছে। দুইটা নতুন দোকান কিনেছে। উত্তরায় প্লট কিনেছে। 

অভাবের কষ্ট ছাড়াও আরাে সব কষ্ট আছে বাবা। আমি জানি ও খুব কষ্টে আছে। 

তিনি ছােট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন।। 

আমি বললাম, বাবা, আপনি কি চা-টা কিছু খাবেন ? ফ্লাস্কে চা আছে। দে, খাই একটু চা। বড় পরিশ্রম হয়েছে। শুয়ে থাকবেন ? নাহ। 

বাবা আগ্রহ নিয়ে চা খেতে লাগলেন। বড় মায়া লাগল। এতটা বয়স হয়েছে তার বােঝাই যায় না। 

তাের এখানে আরেকজন থাকে না? 

ওনার আজ সকালে অপারেশন হয়েছে। ভালাে আছেন। বেশ ভালাে। ডাক্তাররা যা ভেবেছিলেন তা না দ্রলােক সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবেন। 

তাের অপারেশন কবে? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৮)

এখনাে ডেট দিতে পারে নি। আরাে সপ্তাহখানেক লাগবে বােধহয়। আপনি আর কিছু খাবেন ? এখানে মঞ্জু বলে একজন আছে, তাকে বললেই সে এনে দেবে। খিদে লাগছে ? 

কী খাবেন ? ভালাে প্যাটিস আছে। আনাব ? আনা । 

বাবা চেয়ারে পা উঠিয়ে বসে রইলেন। আমি বললাম, টাকাটা ক্যাশ হলেই করিম সাহেব আমাকে খবর দেবেন। তাঁদের ব্যাংকেই জমা দিয়েছি। করিম সাহেবকে চেনেন তাে ? আমার পাশের ঘরে থাকেন। 

চিনি। 

অপারেশনে আমার যদি ভালাে-মন্দ কিছু হয়ে যায় তাতেও অসুবিধা হবে । করিম সাহেব ব্যবস্থা করে দেবেন। আপনার নামে চেক লিখে ওনার কাছে। দিয়ে রেখেছি। 

বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। যেন আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছেন । এমন কোনাে রহস্যময় কথা তাে আমি বলছি না। 

তাের অসুখটা কী ? আপনি জানেন না ? না, তুই তাে ভালাে করে কিছু বলিস নি। 

আমার পেটের নালিতে টিউমার হয়েছে। টিউমারটা খারাপ ধরনের হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। পেট না কাটলে ডাক্তাররা বুঝতে পারবেন না । 

বাবা উঠে দাঁড়ালেন । থেমে থেমে বললেন, কাল আবার আসব। দরকার নেই, কেন শুধু শুধু কষ্ট করবেন ? 

বাবা অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকালেন। আমি নরম স্বরে বললাম, আমার কোন মাসে জন্ম হয়েছিল আপনার মনে আছে ? ডিসেম্বর না জানুয়ারি ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৮)

, এমনি। কোনাে কারণ-টারণ নেই। ১১ তুই কি কোনাে কারণে আমার উপর রাগ করেছিস ? রাগ করব কেন ? টাকা চেয়েছিলি, দিই নি ২৩ ছিল না, তাই দেন নিরাগ করব কেন ? 

বাবা অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ছিল, আমার কাছে ছিল । 

আমার অপারেশন ডেট দিয়েছে। বুধবার সকাল নটায়। যে প্রফেসর অপারেশন করবেন তিনি একদিন দেখা করতে এলেন। হাসতে হাসতে বললেন, কী ভাই, কেমন আছেন? 

ভালােই আছি। ভয় লাগছে নাকি? জি-না। 

দ্যাটস ভেরি গুড। আচ্ছা, আমি কি আপনাকে ঐ গল্পটা বলেছিলাম, ঐ যে অপারেশন… 

জি, এই গল্পটা বলেছেন। 

এই দেখেন, একই গল্প আমি দুবার-তিনবার করে বলি । আরেকটা শােনেন, হাতির পেটে অপারেশন হবে। যন্ত্রপাতি সব পেট কেটে ভেতরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। দুজন নার্সও ঢুকেছে পেটে। ডাক্তার সাহেব অপারেশন শেষ করে স্টিচ করবার পর আঁতকে উঠে বললেন— আরে, নার্স দুজন কোথায় ? 

আমি হাসলাম। ডাক্তার সাহেবও প্রাণ খুলে হাসলেন। বেশ লাগল ভদ্রলােককে । আমি বললাম, ডাক্তার সাহেব, আপনি কি সব রােগীর সাথে অপারেশনের আগে দেখা করেন ? 

হ্যা, করি। কেন ? 

রােগীরা সাহস পায়। আমি নিজেও কেন জানি সাহস পাই। আসলে আমি একজন ভীতু মানুষ। সার্জারি পড়াটা আমার ঠিক হয় নি। 

তিনি আবার ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন। বেশ মানুষ। আমার পাশের বেডের নতুন রােগী বারাে-তেরাে বছরের একটি বাচ্চা ছেলে। সে ডাক্তার সাহেবের সাথে হাসল। ডাক্তার সাহেব বললেন, তােমার নাম কী খােকা? 

টগর। 

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *