প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(শেষ-পর্ব)

আমি কি ভয় পাচ্ছি ? 

মনে হয় পাচ্ছি। সারাক্ষণ কেমন এক নতুন ধরনের শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করেছি। যেন সবকিছুই আছে, তবুও কিছুই নেই। স্বপ্ন দেখার মতাে ব্যাপার। সবকিছুই ঘটছে। অথচ কিছুই ঘটছে না। মনের ভেতর কোথায় যেন চাপা একটি উত্তেজনাও অনুভব করছি। সেই উত্তেজনাটি কী কারণে তাও স্পষ্ট 

নয়। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদগত রাতে অনেকক্ষণ জেগে থেকে ঘুমুতে গেলাম। ঘুমুবার আগে আগে মুখে বসন্তের দাগওয়ালা একজন নার্স এসে বলল, আপনি কি ওষুধ খেয়েছেন? কোন ওষুধের কথা বলেছে বুঝতে পারলাম না। তবু হাসিমুখে বললাম, হঁা। সে বলল, ঘুমিয়ে পড়ুন। জেগে আছেন কেন ? মেয়েটির চেহারা ভালাে নয় কিন্তু এমন মিষ্টি গলার স্বর। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। 

ঘুম আসতে অনেক দেরি হলাে। এবং আশ্চর্য, চমৎকার একটি স্বপ্ন দেখলাম। কে যেন বলেছিল ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমুলে কেউ স্বপ্ন দেখে না। কথাটা সত্যি নয়। এ 

আমি দেখলাম, জেসমিম হাসপাতালে আমাকে দেখতে এসেছে। পিকনিকে যে শাড়ি পরে গিয়েছিল সেই শাড়ি তার গায়ে। গলায় চিকন একটি চেইন। চুল বেণী করে বাঁধা । আমার স্বপ্ন হলাে বাস্তবের চেয়েও স্পষ্ট। ঘুমের মধ্যেই আমি তার গায়ের ঘ্রাণ পেলাম। জেসমিন বলল, আপনাকে দেখতে এলাম।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

অবেলায় ঘুমুচ্ছেন কেন, উঠুন তাে! আমি উঠে বসলাম, সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নটা অন্যরকম হয়ে গেল। দেখলাম হাসপাতাল না, আমি আছি আমার মেসে। জেসমিন চুল আঁচড়াচ্ছে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে, তার চুল এখন আর বেণী করা নয়। খুলে দেয়া । সে চুল হাওয়ায় উড়ছে। 

স্বপ্নে সবকিছুই খুব স্বাভাবিক মনে হয়। হাসপাতাল থেকে মেসে চলে আসার দৃশ্যটিও আমার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হলাে। একবার অবশ্য 

অস্পষ্টভাবে মনে হলাে, এটা সত্যি নয়। এটা নিশ্চয়ই স্বপ্ন ।

হয়তাে এক্ষুণি আমার ঘুম ভেঙে যাবে।

জেসমিন চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল, ইস, আপার শাড়িটা ছিড়ে ফেলেছি।

আপা যা রাগ করবে!

বলতে বলতে সে হাসল। আমিও হাসতে শুরু করলাম। শাড়ি ছেড়ার প্রসঙ্গে দুজনের হাসার ব্যাপারটি মােটেও অস্বাভাবিক বলে মনে হলাে না। যেন এটাই স্বাভাবিক। স্বপ্ন কত অর্থহীনই-না হতে পারে! 

জেগে উঠে দেখি বালিশ ভিজে গেছে। অর্থহীন হাসাহাসির একটি স্বপ্ন দেখেও খুব কেঁদেছি। 

জেসমিন, জেসমিন, তােমার সঙ্গে এ জীবনে বােধহয় আর দেখা হবে না। এ জীবনের পরেও কি অন্য কোনাে জীবন আছে ? অনন্ত নক্ষত্রবীথির কোথাও কি আবার দেখব তােমাকে ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

চুল 

মাথার উপর উজ্জ্বল আলাে।

চারদিকে মুখােশ-পরা সব মানুষ।

সবাই বড় বেশি চুপচাপ।

আমার একটু শীত-শীত করছে।

কে-একজন আমার নাকের উপর কী একটা চেপে ধরে বললেন, সহজভাবে নিঃশ্বাস নিন!

বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি। নেত্রকোনায় আমাদের বাড়ির পাশে বকুলগাছে প্রচুর ফুল ফুটত। সেই বকুলগাছে একবার কে চাকু দিয়ে লিখল- ফরিদ + নীলু। নীলু ফুড কনট্রোলার সাহেবের বড় মেয়ে। বাবা সেই লেখা পড়ে আমাকে উঠোনে চিৎ করে ফেলে পেটে পা দিয়ে চেপে ধরে বললেন, বেশি রস হয়েছে ? গাছে প্রেমপত্র লেখা হচ্ছে ? 

নীলু এখন কোথায় আছে ? কত বড় হয়েছে সে ? সে কি দেখতে আগের মতােই আছে, না বদলে গেছে ? সবাই আমরা বদলে যাই কেন ? 

আবার কে যেন বললেন, সহজভাবে নিঃশ্বাস্ নিন। তার কথা অনেক দূর থেকে আসছে। আমি মনে মনে বললাম, আপনারা আমাকে বাঁচিয়ে তুলুন। একটি খুব জরুরি কথা আমার বলা হয় নি অস্পষ্টভাবে কেউ যেন বলল, কী সেই কথা ? কী কথা সেটা আর মনে পড়ছে না।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

আমি প্রাণপণে মনে করবার চেষ্টা করলাম। বকুল ফুলের গন্ধের সঙ্গে সেই কথা মিশে গেছে। কিছুতেই আলাদা করা যাচ্ছে না। কে যেন গম্ভীর স্বরে বলল, তাড়াতাড়ি মনে করবার চেষ্টা করুন, সময় নেই। হ্যা, মনে পড়েছে। আমি খুব স্পষ্টভাবে বললাম, আমি সবাইকে ভালােবাসি। এই কথাটি কখনাে কাউকে বলা হয় নি। আমাকে বলার সুযােগ দিন, আমার প্রতি দয়া করুন। 

ডাক্তারের কথা শুনতে পাচ্ছি। তিনি বলছেন, আপনি বড় নড়াচড়া করছেন। সহজভাবে শ্বাস নিন। 

আমি শ্বাস নিই। বকুল ফুলের গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *