তাঁর ইচ্ছা করছে এখনি তাকে কিছু বখশিস দেন। পাঁচশ টাকা দিয়ে দিলে কেমন হয়? পাঁচশ টাকা এমন কিছু টাকা না। সাত ডলারেরও কম। বিশ ডলার বখশিস তাঁকে প্রায়ই দিতে হয় । টাকাটা এখনি দিয়ে দেয়া দরকার। নামার সময় তড়িঘড়ি করে নামবেন। বখশিস দিতে ভুলে যাবেন।

চেয়ারে বসতে বসতে রশীদ সাহেব বললেন, বাবা, তােমার নাম কি? এটেনডেন্ট বলল, স্যার, আমার নাম বসির। তােমার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তােমার জন্যে পাঁচশ টাকা বখশিস স্যাংসান করেছি। আমার মনে না থাকলেও তুমি চেয়ে নেবে। এতে দোষের কিছু নাই। এই ট্রেনে যাত্রী সর্বমােট কত জন আছে বলতে পারবে? আন্দাজ করে বললেও হবে।
বসির বলল, আন্দাজ করা লাগবে না। সঠিক সংখ্যা বলতে পারব স্যার। সবতাে টিকেটের যাত্রী। টিকেটের হিসাব গার্ড সাহেবের কাছে আছে।
সঠিক সংখ্যাটা বল। একটু সময় লাগবে। ধরেন এক ঘণ্টা। এক ঘণ্টা সময় তােমাকে দিলাম।
স্যার, আপনার কিছু কি লাগবে? চা বা কফি।
চা-কফি কিছু লাগবে না। আমি রাত ন’টার সময় দুই থেকে তিন পেগ হুইস্কি খাব। হুইস্কি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। তুমি একটা গ্লাস দেবে। বরফ কি দিতে পারবে?
পারব স্যার। বুফে কারে ফ্রিজ আছে । ভেরি গুড।
স্যার, আপনার সিগারেট কি লাগবে? আপনার হাতের প্যাকেটটা তাে মনে হয় শেষের দিকে।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)
সিগারেট লাগবে না। সঙ্গে অনেক আছে। আমি রােস্টেড সিগারেটে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। আমেরিকার বাইরে যখন যাই স্যুটকেস ভর্তি সিগারেট নিয়ে যাই। বসির, আমার রুমমেট মেয়েটি কোথায় জান?
বুফে কারে দেখেছিলাম। তাকে কিছু বলব? কিছু বলতে হবে না। বেচারী মনে হয় এক কামরায় আমার সঙ্গে যেতে সংকোচ বােধ করছে। এই কারণেই বাইরে বাইরে ঘুরছে।
উনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে স্যার। তিন নম্বর কামরায়। আপনার সঙ্গে একজন ডাক্তার থাকবেন।
ভেরি গুড। বৃদ্ধ বয়সে হাতের কাছে ডাক্তার পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। রশীদ সাহেব হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে আরেকটা ধরালেন। বসির এখনাে কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে এই মুহূর্তে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুড়াে মানুষটার কাছ থেকে পাঁচশ টাকা সে নেবে না। কিছুতেই
। এমন একটা সিদ্ধান্ত সে কেন নিয়েছে নিজেই বুঝতে পারছে না। কোনাে কারণ ছাড়াই বুড়াে মানুষটাকে তার ভাল লাগছে।
বসির। জি স্যার। আমি একুশ বছর পর দেশে এসেছি। ভালাে করেছেন।
মমাটেই ভালাে করিনি—আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি অচেনা এক দেশে ঘুরছি। এরকম কেন মনে হচ্ছে তাও বুঝছি না।
একা এসেছেন স্যার? ম্যাডামকে নিয়ে আসেন নাই? | বিয়ে করি নি। ম্যাডাম পাব কোথায়? পােস্ট ডক করার সময় স্পেনের এক মেয়ের সঙ্গে মােটামুটি পরিচয় হয়েছিল। মেয়েটিকে প্রপােজ করেছিলাম। সে রাজিও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়নি। মেয়ের নাম ইয়েনডা। সে স্ট্যাটিসটিকসের ছাত্রী ছিল।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)
বসির বলল, বরফের ব্যবস্থা কি স্যার এখন করব? রশীদ সাহেব বললেন, এখন না। রাত ঠিক নটায়। সময়ের ব্যাপারে আমি খুব পার্টিকুলার। যদিও জানি সময় বলে কিছু নেই। সময় আমাদের কাছে একটা ধারণা মাত্র। তার বেশি কিছু না। পাস্ট, প্রেজেন্ট, ফিউচার বলে কিছু নেই।
বসির বলল, স্যার, আমি খোজ নিয়ে আসি ট্রেনে মােট যাত্রী কতজন । যাও।
জানালাটা বন্ধ করে দিন স্যার । ঠাণ্ডা লাগবে। ঠাণ্ডা লাগবে না। আমি ঠাণ্ডার দেশের মানুষ।
ইয়েনডার কথা মনে পড়ায় রশীদ উদ্দিন হঠাৎ সামান্য বিষঃ বােধ করছেন। ইয়েনডার সঙ্গে দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে। এমট্রেকের অবজারভেশন ডেকে মুখােমুখি বসে দু’জন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। পাশ দিয়ে চলে গেছে Rocky mountain. একটা বিখ্যাত গান আছে না রকি মাউন্টেইন নিয়ে-Rocky mountain high. কে গেয়েছে গান টা?
চিত্রা বুফে কারে ডাক্তার আশহাবের মুখখামুখি বসে আছে। সহজ ভাবেই গল্প করে যাচ্ছে। অপরিচিত জনের সঙ্গে কথা বলার অস্বস্থি কাজ করছে না। তাদের টেবিল থেকে একটু দূরে কয়েকজন যুবক প্রাণখুলে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন মনে হয় ওস্তাদ গল্পকার।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)
কিছুক্ষণ পর পর সে একটা গল্প করছে। আশপাশের সব বন্ধুরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। গল্পকার ছেলেটির গায়ে নীল রঙের স্যুয়েটার। টকটকে লাল রঙের একটা মাফলারে সে কান ঢেকেছে। তাকে দেখে থ্রি ডাইমেনশনাল বাংলাদেশের পতাকার মতাে লাগছে। চিত্রার ইচ্ছা করছে বাংলাদেশী ঐ পতাকার কাছে গিয়ে বলে—আপনাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বসতে পারি? গল্প শুনব। অনেকদিন আমি হাসি না। আপনার গল্প শুনে হাসব।
ইচ্ছা করলেও কাজটা তার পক্ষে সম্ভব না। লিলি থাকলে নির্বিকার ভঙ্গিতে ঐ টেবিলে চলে যেত। গম্ভীর ভঙ্গিতে বলত—আমাকে জায়গা দিন তাে। জোকস শুনব। আমি নিজেও শুনাব।
আশহাব বলল, আপনার কি মনে হচ্ছে আমার মা’কে রুমমেট হিসেবে নিতে পারবেন?
চিত্রা বলল, কেন পারব না?
Read more