কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১০)

রশীদ সাহেব ধাক্কার মতাে খেয়েছেন। ডাক্তার ছেলেটা যে এত ওস্তাদ তিনি কল্পনাও করে নি। তাঁর মতাে সজাগ চোখের একজন মানুষকে বােকা বানানাে সম্পূর্ণ অসম্ভব। অথচ এই ছেলে তাই করেছে। চোখের সামনে পাঁচ টাকার 

কিছুক্ষণএকটা কয়েন অদৃশ্য করেছে। কোটের হাতায় লুকিয়ে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। কোটের হাতা সে গুটিয়ে নিয়েছে। একটা বস্তু হঠাৎ অদৃশ্য হতে পারে না। Volatile কোনাে বস্তু অদৃশ্য হলে বলা যেত যে হাতের মুঠোর উত্তাপে বস্তুটা বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। পাঁচ টাকার কয়েন কোনাে ভলাটাইল বস্তু না।। 

আশহাব বলল, স্যার, আপনার মনে হয় ম্যাজিকটা খুব পছন্দ হয়েছে। 

রশীদ সাহেব বললেন, পছন্দ হবার কিছু না। এটা নতুন কেনা শার্ট না যে পছন্দ হবে। আমি বিভ্রান্ত হয়েছি। কেন বিভ্রান্ত হয়েছি এটা বের করতে হবে । আমি অল্প বুদ্ধির মানুষ না যে যাই দেখব তাতেই বিভ্রান্ত হব। 

অতিবুদ্ধিমানরাই সহজে বিভ্রান্ত হয়। Don’t talk nonsense. 

আশহাব চুপ করে গেল। বৃদ্ধের হতচকিত অবস্থাটায় সে খুবই মজা পাচ্ছে। কাউকে ম্যাজিক দেখিয়ে এত আরাম এর আগে সে পায়নি। 

স্যার, আরেকটা খেলা কি দেখাব? রুমালের কালার চেঞ্জ । লাল রঙের রুমাল প্রথমে হবে সবুজ তারপর শাদা। | যেটা দেখিয়েছ সেটার রহস্য আগে বের করি। সম্পূর্ণ নতুন দিক থেকে চিন্তা শুরু করেছি। এতে মনে হয় কাজ হবে। 

রশীদ সাহেব গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললেন, তােমাকে কি আরেক পেগ দেব? | দিন। 

তােমার দু’টা হয়েছে। এটা নিলে হবে থার্ড। মেজাজ ফুরফুরে করার জন্যে তিনটার বিকল্প হয় না। ইংরেজিতে এই কারণেই বলে থ্রি ইজ কোম্পানি। 

সেটাতাে মানুষের জন্যে। মানুষের জন্যে যেটা সত্যি, হুইস্কির জন্যেও সত্যি। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১০)

আশহাব নিজের গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল, ম্যাজিকটার রহস্য উদ্ধারে নতুন কোন দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছেন একটু কি বলবেন? 

বৃদ্ধ বললেন, অবশ্যই বলব। যখন চিন্তা শুরু করব তখন বলব। এখনাে চিন্তা শুরু করিনি। এখন ব্রেইনকে রেস্ট দিচ্ছি। 

কি ভাবে রেস্ট দিচ্ছেন? সম্পূর্ণ অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করছি। অন্য বিষয়টা কি জানতে চাও? 

চাই। | বৃদ্ধ সিটে পা তুলে আরাম করে বসতে বসতে বললেন, এই ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা আমার কাছে আছে। সর্বমােট যাত্রী সংখ্যা ৬২২ যােগ ১৮ যােগ ৪ যােগ ২ যােগ ৩ অর্থাৎ ৬৪৯। 

আশহাব বলল, এর মধ্যে কিছু বিভিন্ন স্টেশনে নামবে, কিছু উঠবে। তা ঠিক। তবে গড় সংখ্যা ৬৪৯। জি। এই যাত্রীদের মধ্যে একজন মৃত। জি। একজন আছে যে সবচে জ্ঞানী। আশহাব বলল, সবচে জ্ঞানী আপনি হওয়া সম্ভব। 

বৃদ্ধ বললেন, তা সম্ভব। তবে আমার চেয়েও জ্ঞানী কেউ থাকতে পারে । আমার সাফল্য বেশি, সাফল্য এবং জ্ঞান এক না। 

আশহাব বলল, মানলাম। একজনকে পাওয়া যাবে সবচে বােকা, একজন থাকবেন সবচে ধার্মিক। 

এক মাওলানা সাহেব যাচ্ছেন। সারাক্ষণ তসবি টানছেন। উনি হবেন সবচে ধার্মিক।। 

বৃদ্ধ বললেন, মাওলানাকে আমিও দেখেছি। হ্যা সে হতে পারে। একজন হবে সবচে ক্ষমতাধর। 

আশহাব বলল, সেটা কে আমি জানি। এই ট্রেনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যাচ্ছেন। তিনি সেলুন কারে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১০)

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কি সবচে ক্ষমতাধর? জি স্যার। বৃদ্ধ বললেন, উনার নামটা জানা দরকার। নাম দিয়ে কি করবেন? 

বৃদ্ধ বলল, নাম দিয়েও একটা খেলা করা যাবে। ধরাে উনার নাম যদি হয় জলিল তাহলে আমরা দেখব যাত্রীদের মধ্যে কতজন জলিল আছে। এই জলিলদের মধ্যে সামাজিক অবস্থা কার কি। তাদের জন্ম তারিখ যদি বের করা যায় তাহলে আমরা হিসাব করব একই দিনে জন্মেও সামাজিক অবস্থানে এখকে কোথায়? 

আশহাব বলল, লাভ কি?

বৃদ্ধ বললেন, লাভ লােকসান নিয়ে চিন্তা করছ কেন? আমরা কি ট্রেনে ব্যবসা করতে এসেছি। আমাদের কি ব্যালেন্স শীট তৈরি করতে হবে? তুমি চেষ্টা করে দেখতে মন্ত্রীর নামটা জোগাড় করা যায় কি-না। গ্লাসটা শেষ করে তারপর যাও। লাষ্ট একটা কি খাবে? নাম্বার ফোর। | এখনই মাথা ঘুরছে! আর খাওয়া ঠিক হবে না। 

পিথাগােরাসের ধারণা, চার একটি magical number। সংখ্যার ধারায় চার হচ্ছে প্রথম সংখ্যা যার বর্গমূল হয়। বর্গমূল আবার প্রাইম নাম্বার। দিক আছে চারটা পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ । | আশহাব বলল, আপনি যে ভাবে ব্যাখ্যা করলেন তাতে চার পর্যন্ত যাওয়া যায়। চার পর্যন্ত না গেলে পিথাগােরাসের প্রতি অসম্মান করা হবে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১০)

ঠিক বলেছ। তুমি মন্ত্রীর নাম জেনে আস। ততক্ষণ আমি তােমার ম্যাজিকের রহস্যটা চিন্তা করি। তারপর আমরা মহান পিথাগােরাসকে সম্মান দেখাব। 

আশহাব কামরা থেকে বের হয়েই চিত্রার সামনে পড়ে গেল। চিত্রা বলল, আপনাকেই তাে খুঁজছি। 

আশহাব বলল, কেন? আপনার মা আপনার জন্যে ব্যস্ত হয়ে আছেন। 

আশহাব বলল, তাঁকে আরাে ব্যস্ত হতে বলুন। উনি আমার জন্যে ব্যস্ত কিন্তু আমি এই মুহূর্তে অন্য কাজে ব্যস্ত। 

চিত্রা বলল, অন্য কাজটা কি? 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *