রশীদ সাহেব বললেন, এই হাইপােথিসিসে বিশ্ব ভ্ৰহ্মাণ্ড একটা হলােগ্রাম ছাড়া আর কিছুই না…
খােলা দরজায় বসির মাথা বের করে বলল, বিরাট এক সমস্যা হয়েছে। আপা আপনি কি ডাক্তার?
চিত্রা বলল, না তাে। আশহাব সাহেব ডাক্তার।
বসির বলল, একজন মহিলা ডাক্তার দরকার। পাঁচ নম্বর কেবিনে এক মহিলার ডেলিভারী পেইন শুরু হয়েছে। উনার হাসবেন্ড মাওলানা । উনি লেডি ডাক্তার ছাড়া তাঁর স্ত্রীকে দেখাবেন না। আমি পুরাে ট্রেইন খুঁজে এসেছি কোনাে লেডি ডাক্তার নেই।
রশীদ সাহেব বললেন, ডাক্তারের আবার পুরুষ মহিলা কি? ডাক্তার হল ডাক্তার। আমি মাওলানার সঙ্গে কথা বলি। উনাকে বুঝিয়ে বলি।
বসির বলল, উনি বুঝ মানার লােক না স্যার। কঠিন মাওলানা ।
রশীদ সাহেব বললেন, নিশ্চয়ই কেউ তাকে ঠিকমতাে লজিক দিতে পারে নি। মানুষ এমন ভাবে তৈরি যে তাকে লজিকের কাছে সারেন্ডার করতেই হয় । উনি যেমন কঠিন মাওলানা, আমিও কঠিন তার্কিক। | বসির বলল, আপনার কথা উনাকে বলে দেখি উনি কথা শুনতে রাজি হন কি-না। | রশীদ সাহেব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ইন্টারমিডিয়েট কারাের প্রয়ােজন দেখছি না। আমি সরাসরি কথা বলব। তুমি আমাকে নিয়ে চল।
চিত্রা বলল, চাচা আমিও আসি। আমি আপনার লজিক শুনব। রশীদ সাহেব বললেন, এসাে।
মাওলানা কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার কপালে ঘাম তবে চোখ মুখ কঠিন। তার একটা হাত পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকানাে। মনে হচ্ছে ওই হাতে তসবি। কেবিনের দরজা বন্ধ। নারী কণ্ঠের চাপা কাতরানি শােনা যাচ্ছে।
রশীদ উদ্দিন এগিয়ে গেলেন। চিত্রা গেল তার পিছু পিছু। মাওলানা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। রশীদ সাহেব বললেন, আসসালামু আলায়কুম।
মাওলানা শীতল গলায় বললেন, ওয়ালাইকুম সালাম।
রশীদ উদ্দিন বললেন, আপনার স্ত্রীর লেবার পেইন শুরু হয়েছে বলে শুনেছি। এইটাই কি আপনাদের প্রথম সন্তান?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
জি। ছেলে না মেয়ে? কি করে বলব। সন্তানতাে এখনাে হয় নাই। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আগে ভাগে জানার ব্যবস্থা আছে।
মাওলানা বললেন, আল্লাহপাক যদি চাইতেন আমরা আগে ভাগে জানি তাহলে মেয়েদের পেটের চামড়া পাতলা কাঁচের মতাে বানাতেন আমরা পেটের ভেতরের সন্তান দেখতে পেতাম।
রশীদ উদ্দিন বললেন, আল্লাহ পাক মানুষকে ক্ষমতা দিয়েছেন যেন সে অজানাকে জানতে পারে। সূরা আল ইমরানে আছে…
মাওলানা বললেন, জনাব আমি আপনার সঙ্গে তর্কে যাব না। আমি বুঝতে পারছি আপনি তর্কে আমাকে পরাস্ত করার আনন্দ পেতে চান। আনন্দ আপনাকে দিলাম—-আগেই পরাজয় মানলাম।
রশীদ উদ্দিন বললেন, একজন পুরুষ ডাক্তার আমাদের সঙ্গে আছেন । আমি আমার স্ত্রীর পর্দা নষ্ট করব না। কোনাে পুরুষ ডাক্তার তাকে দেখাব । | আপনার সিদ্ধান্তের কারণে আপনার স্ত্রী বা সন্তানের সমূহ ক্ষতি কিন্তু হতে পারে। দুর্ঘটনা ঘটে তারাতাে মারাও যেতে পারে।
যদি মারা যায় তাহলে বুঝতে হবে আল্লাহপাক তাদের আয়ু দেন নাই। জনাব আপনার সঙ্গে আর বাক্যালাপ করব না। গােস্তাকি নিবেন না। আমার মন অস্থির। তর্ক করার মতাে অবস্থায় আমি নাই।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানা কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
চিত্রা বলল, চাচাজি উনি কোনাে লজিকই শুনবেন না।
রশীদ উদ্দিন বললেন, এ রকম হয়। এই মাওলানা নিশ্চয়ই লজিকের কারণে অনেক বার আহত হয়েছেন যে কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বড় বড় বিজ্ঞানীদের মধ্যেও এই জিনিস দেখা যায়। অন্য বিজ্ঞানীদের লজিক যাতে শুনতে না হয় তার জন্যে নিজে লজিক থেকে সরে যান।
চিত্রা বলল, আমরা কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব?
রশীদ উদ্দিন বললেন, আমি দাঁড়িয়ে থাকব। মাওলানা আবার যখন বের হবেন তাকে আবার ধরব। ভাল কথা তােমার কাছে কি কোনাে কয়েন আছে।
কেন বলুন তাে! তােমাকে একটা ম্যাজিক দেখাব। এখন দেখাবেন। এইখানে? Why not. চিত্রা হ্যান্ডব্যাগ খুঁজে কোনাে কয়েন পেল না। রশীদ উদ্দিন বললেন, কারাে কাছ থেকে খুঁজে একটা কয়েন নিয়ে এসাে তাে।
বিস্মিত চিত্রা কয়েনের খোঁজে বের হল। মানুষটা কি পাগল? এই অবস্থায় কেউ ম্যাজিক দেখানাের কয়েন খোঁজে? বেশির ভাগ বিখ্যাত মানুষ একসেনট্রিক। এই একসিনট্রিসিটির কতটা সত্যি আর কতটা ভান? ‘আমি আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতাে না। আমি আলাদা আমি অন্য রকম এই ধারণা বিখ্যাত মানুষরাই দিতে চেষ্টা করেন। সাধারণ মানুষদের এই সব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। আমি যা আমি তাই ।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
Take me or leave me.
চিত্রা!
চিত্রা থমকে দাঁড়াল। ডাক্তার আশহাব। তাঁর মুখ চিন্তিত। চিত্রা বিস্মিত। এই ভদ্রলােক এত সহজে তাকে চিত্রা ডাকছে যেন সে তার ঘরের কেউ।
আশহাব বলল, আমার মায়ের মাথা পুরােপুরি গেছে। ব্রেইনের নিউরেনােল কানেকশনের চল্লিশ পার্সেন্ট মনে হয় অফ হয়ে গেছে। পরিচিত জগত সম্পর্কে যেখানে information থাকে সেখানে মনে হয় একটা havoc হয়ে গেছে।
আপনাকে চিনতে পারছেন না? আমাকে এখনাে চিনতে পারছেন তবে কিছুক্ষণ পরে মনে হয় চিনতে পারবেন না।
Read more