কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২২)

মাওলানা সাহেবের স্ত্রী আফিয়ার ৩৫ সপ্তাহ মাত্র চলছে। শিশু চল্লিশ সপ্তাহ মায়ের পেটে থেকে বড় হবে। এই চল্লিশ সপ্তাহ সে তার জগতে নিজের মত বড় হবে। সব শেষে তৈরী হবে তার ফুসফুস। ফুসফুস তৈরী হয়ে যাবার পর শিশু সিগন্যাল পাঠাবে মায়ের শরীরে—আমি এখন তৈরি। পৃথিবী দেখব। আমাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দাও। মায়ের শরীর ব্যবস্থা নেবেন।কিছুক্ষণ

এখানে কোনাে একটা সমস্যা হচ্ছে। সময়ের আগেই শিশু বন্দিদশা থেকে মুক্তি চাচ্ছে। আফিয়া বলল, পানি ভাঙছে। পানি। 

মাওলানা বললেন, আল্লাহর নাম নাও। 

আফিয়া বলল, ডাক্তার লাগবে ডাক্তার। মাওলানা বললেন, আমি খোজ নিয়েছি ট্রেনে লেডি ডাক্তার নেই। 

আমি মরে যাব না-কি? 

আহারে চিৎকার করছ কেন। মেয়েদের গলার স্বর বাইরের পুরুষের শােনা ঠিক না। পর্দার বরখেলাফ হয় । 

আফিয়া গােংগাতে গােংগাতে বলল, মরে গেলাম। আমি মরে গেলাম। মাগাে আমি মরে গেলাম। 

মাওলানা বিরক্ত গলায় বললেন, আল্লাহর নাম নাও, মা মা করছ কেন? এখানে যা করার আল্লাহপাক করবেন । তােমার মা কি করবেন? 

আপনি সামনে থেকে যান। কোনাে একজন মহিলাকে ডাকেন। যে কোনাে মহিলা। আমার সন্তান বের হয়ে আসতেছে। আমি বুঝতেছি। মাগাে তুমি কোথায় মা।। 

মাওলানা দরজা খুলে বের হয়েই দেখলেন দরজার বাইরে চিত্রা এবং রশীদ সাহেব। মাওলানা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিত্রাকে বললেন, আপনি কি একটু ভেতরে যাবেন? 

চিত্রা বলল, আমি ভেতরে গিয়ে কি করব? উনার দরকার একজন ডাক্তার। আমাদের সঙ্গে ডাক্তার আছে। উনাকে ডেকে নিয়ে আসি? 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

 মাওলানা বললেন, পুরুষ ডাক্তার আমি দেখাব না। অসম্ভব । কোনদিনও না। 

চিত্রা বলল, আমি ভেতরে যাচ্ছি। বােকার মতাে বসে থাকা ছাড়া আমি কিছু করতে পারব না। | চিত্রা ঢুকে গেল। রশীদ উদ্দিন সিগারেটের প্যাকেট বের করে বললেন, সিগারেট খাবেন। এতে টেনশান কিছু কমবে। নিকোটিনের নার্ভ সুদিং ক্ষমতা আছে। 

আমি ধুমপান করি না। গুড। ভেরি গুড । আমি আপনার দুই মিনিট সময় নিতে পারি? দুই মিনিটে আমি আপনাকে একটা গল্প বলব। গল্প শেষ করে আমি চলে যাব। আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্যে আপনি আমাকে দুই মিনিট সময় দিন। 

মাওলানা কঠিন গলায় বললেন, আপনাকে দুই মিনিট সময় দিলাম। 

রশীদ সাহেব গল্প শুরু করলেন, দেশে একবার বন্যা শুরু হয়েছে। ঘরবাড়ি সব ডুবে যাচ্ছে। উদ্ধারকারী লােকজন নৌকা নিয়ে এসেছে। 

সবাই নৌকায় উঠে আশ্রয় কেন্দ্রে চলে গেলেন। এক মাওলানা শুধু গেলেন না। উনি আল্লাহ ভক্ত মানুষ। উনি বললেন আল্লাহর উপর আমার ভরসা। আল্লাহপাক ব্যবস্থা করবেন। 

বন্যার পানি ঘরের চাল পর্যন্ত উঠল। মাওলানা চালে উঠে বসলেন। তখন উদ্ধারকারী লঞ্চ এল। মাওলানা লঞ্চে উঠলেন না। উনার এক কথা, ‘আল্লাহপাক ব্যবস্থা করবেন। বন্যার পানি আরাে বাড়ল। মাওলানার বুক পর্যন্ত উঠল। এল উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার । মাওলানা তাতেও উঠলেন না। হেলিকপ্টার ফিরে গেল। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

পানিতে ডুবে মাওলানা মারা গেলেন। মৃত্যুর পর আল্লাহকে গভীর আফসােসের সঙ্গে বললেন, আমি সারাজীবন একনিষ্ঠভাবে আপনাকে ডেকেছি আপনার উপর ভরসা করেছি আর আজ আমাকে কিনা ডুবে মরতে হল। কোনাে সাহায্য আপনার কাছ থেকে এল না। 

আল্লাহ বললেন, তােমাকে সাহায্য করার জন্যে আমি তিনবার ব্যবস্থা নিয়েছি। একবার নৌকা পাঠানাে হয়েছে। তারপর গেল লঞ্চ। সর্বশেষে হেলিকপ্টারও পাঠালাম। বল আর কি করতে পারতাম? 

আমার গল্প শেষ । আমি এখন বিদায় নেব। মাওলানা বললেন, আপনার গল্পটা সুন্দর। গল্প কিন্তু গল্পই। আল্লাহপাক ইচ্ছা করলেই বন্যার পানি নামিয়ে দিতে পারতেন। 

রশীদ উদ্দিন বললেন, তা অবশ্যই পারতেন। তিনি আপনার সন্তানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারেন কিন্তু মাওলানা সাহেব আপনি কি একটা হাদিস জানেন? এই হাদিস অনুযায়ী আল্লাহপাক বলেছেন, তুমি যখন রােগগ্রস্ত হবে তখন একজন ভাল চিকিৎসকের কাছে যাবে সেই সঙ্গে রােগমুক্তির প্রার্থনা করবে। 

মাওলানা বললেন, আমি এই হাদিসের কথা জানি না। | রশীদ উদ্দিন বললেন, আমি জানি। আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন। আমার প্রাথমিক পড়াশােনা মাদ্রাসায়। আপনি আমার কথা শুনুন, আমি ডাক্তার ছেলেটিকে ডাকি। সে আপনার স্ত্রীকে ‘মা’ সম্বােধন করে কামরায় ঢুকুক। 

মা ডাকলেই মা হয় না। 

রশীদ উদ্দিন বললেন, তাও ঠিক। কোরান শরীফেই আছে পালক পুত্র পুত্র নয়। তারপরেও এই ডাক্তারের কল্যাণে হয়ত আপনার সন্তান তার মাকে মা ডাকবে। জগতের মধুরতম শব্দ আপনার স্ত্রী শুনবে। 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *