কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৪)

তুমি রেলের কাউকে কিছু বলতে পার না? আচ্ছা দেখি। কি করতে পারি আপনাকে জানাব। দশ মিনিট পর আমি টেলিফোন করি? হেলাল উদ্দিন বললেন, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি জানাব।কিছুক্ষণ

আবুল খায়ের সাহেব চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন । তিনি নিশ্চিত হেলাল উদ্দিন আর টেলিফোন করবে না। নিজের মােবাইলও অফ করে রেখে দেবে। হেলালকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তিনি নিজে অসংখ্যবার এই কাজ করেছেন। অন্যদের করতে দোষ কি? মহা বিপদে পড়ে কতবার লােকজন তাকে টেলিফোন করেছে তিনি বলেছেন, দেখি কি করা যায়। কিছু করতে পারলে জানাব আমাকে টেলিফোন করার দরকার নেই। বলেই লাইন কেটে দিয়েছেন। 

ব্যান্ডদলের পরিচালকের নাম কাউসার। সে নিজের নাম লেখে ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে—Cowসার। নামের অর্থ জিজ্ঞেস করলে বলে গরুর সার অর্থাৎ গােবর। Cowসার ডাকতে যদি সমস্যা হয় আমাকে গােবর ডাকতে পারেন, গােবর ভাইয়া ডাকতে পারেন কোনাে অসুবিধা নেই। 

কাউসারের রসবােধে তার ব্যান্ডের লােক যেমন মােহিত, বাইরের লােকজনও মােহিত। এই মুহূর্তে তার মধ্যে রসবােধের কোনাে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছে। টেনশানে তার পেট নেমে গেছে। কাউসার আবুল খায়েরের দিকে এগিয়ে এল। খায়ের সাহেব বললেন, কিছু বলবে? | কাউসার বলল, বিনাকারণে আমরা ক্যাচালের মধ্যে পড়েছি। আমরা ঠিক করেছি সামনের স্টেশনে নেমে যাব। সঙ্গে অনেক টাকার ইনস্ট্রমেন্ট। নষ্ট হলে পথে বসব। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

খায়ের সাহেব বললেন, সামনের ষ্টেশনে নামবে কি ভাবে? ট্রেন তাে আর কোথাও থামবে না। ময়মনসিংহ থামবে। 

তাহলে স্যার আমরা চেইন টেনে ট্রেন থামায়ে নেমে পড়ব। জঙ্গলের মধ্যে কোথায় নামবে? ভাওয়ালের জঙ্গল। 

কাউসার বলল, ভাওয়ালের জঙ্গলেই নামব। আপনি তাে এখন কোনাে প্রটেকশান দিতে পারবেন না। কোন ভরসায় থাকব? 

যমুনার স্বামী ফয়সল বলল, আমি কাউসার সাহেবের সঙ্গে একমত। আমার মতে আমাদের সবারই নেমে যাওয়া উচিত। | খায়ের সাহেব বললেন, জঙ্গলে নেমে যে আরাে বড় বিপদে পড়বে না কে বলল? 

সুরমা রাগী গলায় বললেন, বােকার মতাে কথা বলবে না। জঙ্গলে কিসের বিপদ? জঙ্গলে কি সিংহ আছে যে আমাদের খেয়ে ফেলবে? 

কাউসার বলল, তাহলে ডিসিন কি হল? আমরা চেইন টেনে ট্রেন থামাব? 

খায়ের সাহেব কিছু বলার আগেই ফয়সল বলল, অবশ্যই। এখন দেখা যাবে চেইন টেনেও ট্রেন থামানাে যাবে না। টানতে টানতে চেইন ছিড়ে 

ফেললাম ট্রেইন থামল না।। 

ফয়সলের কথা শেষ হবার আগেই বাতি আবার নিভে গেল। কাউসার চেইন ধরে ঝুলে পড়ল। 

আঁকুনি খেতে খেতে ট্রেন থেমে গেল।

অস্বাভাবিক দক্ষতায় কাউসার দলবল নিয়ে নেমে পড়ল।

ফয়সল নামল যমুনাকে নিয়ে।

সুরমা স্বামীর হাত ধরে কিছুক্ষণ টানাটানি করে নিজেও ঝাঁপ দিয়ে পড়ে পা মচকে ফেললেন। 

ট্রেনের ভিতর ছােটাছুটি ব্যস্ততা। অনেকেই চিৎকার করছে ডাকাত ডাকাত। রেল পুলিশ ঘন ঘন হুইসেল দিচ্ছে। ট্রেনের কয়েকটা কামরা থেকে টর্চের আলাে দু’পাশের জঙ্গলে ফেলা হচ্ছে। একদল যাত্রী চেঁচাচ্ছে ঐ যে জঙ্গলে ঢুকে। জঙ্গলে ঢুকে। মেয়েছেলে নিয়ে পালায়ে যাচ্ছে। রেল পুলিশ দু’বার রাইফেলে ফাঁকা আওয়াজ করল।

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

রেল পুলিশের রাইফেলের গুলির আওয়াজের সঙ্গে নবজাত শিশুর কান্না মিশল। আশহাব বাচ্চাটাকে পা ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। বাচ্চা একেকবার ফুসফুস ভর্তি করে বাতাস নিচ্ছে এবং চিৎকার করে কাঁদছে। অসময়ে চলে এলেও এই শিশু প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সে তার উপস্থিতি সবাইকে জানান দেবেই। চিত্রা বলল, ছেলে না মেয়ে? 

আশহাব বলল, ছেলেই হােক মেয়েই হােক একটি শয়তানই যথেষ্ট। আহা বলুন না। ছেলে না মেয়ে? আশহাব বলল, মেয়ে হয়েছে। চিত্রা দরজা খুলে বের হল আনন্দে সে ঝলমল করছে। মনে হল সে তার জীবনের সবচে আনন্দের সংবাদটা দিচ্ছে। 

মাওলানা সাহেব! আপনার একটা পরীর মতাে সুন্দর মেয়ে হয়েছে। মাওলানা কিছু বলার আগেই রশীদ উদ্দিন বললেন, অতি সুসংবাদ। নবী 

এ করিম বলেছেন যার প্রথম সন্তান কন্যা সে মহা সৌভাগ্যভান। আজান দেয়া প্রয়ােজন। মেয়েটার কানে আল্লাহর নাম ঢুকুক। 

মাওলানা বললেন, মেয়েটার চেহারা দেখে তারপর আজান দেই? রশীদ উদ্দিন বললেন, আগে আজান তারপর চেহারা ।। মাওলানা আজান দিলেন। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার…

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

শিশুটিকে শাড়ি দিয়ে জড়িয়ে মায়ের বুকের কাছে দেয়া হয়েছে। মা এই হাসছেন, এই কাঁদছেন। হঠাৎ তিনি চমকে উঠে বললেন, ডাক্তার আপনি না বললেন মেয়ে। এতাে ছেলে। 

আশহাব হাসতে হাসতে বলল, একটু ঠাট্টা করলাম। 

ছেলের মা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসে বললেন, ডাক্তার তুমি এত দুষ্ট কেন? 

মাওলানাকে আসল খবর দেয়ার পর তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে রশীদ উদ্দিনকে জড়িয়ে ধরলেন। মনে হচ্ছে কন্যা সন্তানের আনা ভাগ্যের তাঁর প্রয়ােজন নেই। তার জন্যে ছেলেই যথেষ্ট। 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *