ছাপ্পান্ন মিনিট পার হল। ফিরােজ বসে আছে। কারাে কোনাে খোঁজ নেই। ঘুমন্ত রাজপুরীর মতাে অবস্থা। কোনাে শব্দটব্দও পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে ধারণা করা যায় এ-বাড়িতে জীবিত লােজন আছে। সে যে এসেছে, এ-খবরটি ছাপ্পান্ন মিনিট আগে পাঠানাে হয়েছে। বেঁটেখাটো এক জন মহিলা বলে গেল—আফা আসতাছে। ব্যস, এই পর্যন্তই। ফিরােজ অবশ্যই আশা করে না যে, সে আসামাত্র চারদিকে ছােটাছুটি পড়ে যাবে। বাড়ির কর্তা স্বয়ং নেমে আসবেন এবং এনাকে চা দিতে এত দেরি হচ্ছে কেন? বলে চেচামেচি শুরু করবেন। তবে এক ঘন্টা শুধুশুধু বসে থাকতে হবে, এটাও আশা করে না। সময় এখনাে এত সস্তা হয় নি।
আপনি কি আমাকে ডাকছিলেন?
পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ফিরােজ মনে-মনে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল । চমৎকার মেয়েগুলি সব এমন-এমন জায়গায় থাকে যে, ইচ্ছা করলেই হুট করে এদের কাছে যাওয়া যায় না। দূর থেকে এদের দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে হয় এবং মনে-মনে বলতে হয়—আহা, এরা কী সুখেই না আছে। | ফিরােজ উঠে দাঁড়াল। সালামের মতাে একটা ভঙ্গি করল। এটা করতে তার বেশ কষ্ট হল। উনিশ-কুড়ি বছরের একটি মেয়েকে এ-রকম সম্মানের সঙ্গে সালাম করার কোনাে মানে হয়!
ফিরােজ বলল, আমি আপনার বাবার কাছে এসেছি।’ ‘বাবা তাে দেশে নেই, আপনাকে কি এই কথা বলা হয় নি?”
হয়েছে। ‘তাহলে? মেয়েটির চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। যেন কৈফিয়ত তলব করছে, কেন তাকে
ডাকা হল। ফিরােজ ঠাণ্ডা গলায় বলল, আপনার বাবা নেই বলেই আপনাকে খবর। দিতে বলেছি। গল্পগুজব করার উদ্দেশ্যে খবর দেয়া হয় নি।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
অপালা পর্দা ছেড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। লােকটিকে চট করে রেগে যেতে দেখে তার বেশ মজা লাগছে। বয়স্ক মানুষেরা মাঝে-মাঝে খুবই ছেলেমানুষি করে।
আপনার বাবা আমাকে কমিশন করেছেন বসার ঘরটি বদলে নতুন করে সাজিয়ে দিতে। এই সাজ তাঁর পছন্দ নয়।
আপনি কি একজন আর্টিস্ট?
না। আর্টিস্টরা মানুষের ঘর সাজায় না। তারা ছবি আঁকে। আমার কাজ হচ্ছে আপনাদের মতাে পয়সাওয়ালাদের ঘর সাজিয়ে দেয়া।
বেশ, সাজিয়ে দিন।
আপনি জানেন তাে, আপনার বাবা ড্রইংরুমটা বদলাতে চাচ্ছেন? ‘না, জানি না। বাবার মাথায় একেকটা খেয়াল হঠাৎ করে আসে, আবার হঠাৎ করে চলে যায়। আপনি বসুন।
ফিরােজ বসল। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। এইসব পরিবারের মেয়েরা অসম্ভব অহঙ্কারী হয়। এক জন হাউস ডেকোরেটরের সঙ্গে এরা বসবে না। এতে এদের সম্মানের হানি হবে।
‘আমি ভাবছিলাম আজই কাজ শুরু করব।’ ‘করুন।”
‘আপনার বাবা আমাকে টাকাপয়সা কিছু দিয়ে যান নি। জিনিসপত্র কিনতে আমার কিছু খরচ আছে।
‘আপাতত খরচ করতে থাকুন। বাবা এলে বিল করবেন।
এত টাকা তাে আমার নেই। আপনি কি কোনাে ব্যবস্থা করতে পারেন? আমি কী ব্যবস্থা করব? | ‘আপনার বাবা বলেছিলেন, যে-কোনাে প্রয়ােজনে আপনাদের এক জন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে-নিশানাথবাবু। কিন্তু তাঁর ঠিকানা আমাকে দিয়ে যান। নি।
‘আপনি অপেক্ষা করুন, আমি ম্যানেজার কাকুকে খবর দিয়ে নিয়ে আসছি। আপনাকে কি ওরা চা দিয়েছে?
‘চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
আপনার অসীম দয়া।
অপালা হেসে ফেলল। অসীম দয়া বলার ভঙ্গির জন্যে হাসল, না অন্য কোনাে কারণে, তা বােঝা গেল না। সে দোতলায় উঠে ম্যানেজার সাহেবকে টেলিফোনে আসতে বলল। নিশানাথবাবুকে এ-বাড়িতে সবাই ম্যানেজার ডাকে, তবে ম্যানেজারি ধরনের কোনাে কাজ উনি করেন না। উনি বসেন মতিঝিল অফিসে। গুরুত্বহীন কাজগুলি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করেন। টাটকা মাছ কেনার জন্যে প্রায়ই ভােররাতে দাউদকান্দি চলে যান। এই জাতীয় কাজে তাঁর সীমাহীন উৎসাহ।।
Read more