ফখরুদ্দিন সাহেব হাসতে-হাসতেই বললেন, ‘নাথিং। এ্যাবসলুটলি নাথিং। পানি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। ব্রিং মি সাম ওয়াটার।
হেলেনা হাসপাতালের বেডে শুয়ে পুরনাে কথা ভাবেন। স্মৃতি রােমন্থনের জন্যে নয়, সময় কাটানাের জন্যে। বইপত্র ম্যাগাজিন স্কুপ হয়ে আছে। বেশিক্ষণ এ-সব দেখতে ভালাে লাগে না। টিভির অনুষ্ঠানও একনাগাড়ে দেখা যায় না। কথাবার্তা বােঝা যায় না। সবাই কেমন ধমক দেয়ার মতাে করে ইংরেজি বলে। পুরােটাও বলে না। অর্ধেক গলার মধ্যে আটকে রাখে। যেন কথাগুলি নিয়ে গার্গল করছে।
হেলেন। তিনি তাকালেন। সিস্টার মেরি এসে দাঁড়িয়েছে। এরা সবাই তাঁকে হেলেন ডাকে,
যদিও তিনি অনেক বার বলেছেন, তাঁর নাম হেলেনা—হেলেন নয়।
‘তােমার একটি টেলিফোন এসেছে। কানেকশন এ-ঘরে দেয়া যাচ্ছে না। টেলিফোন সেটটায় গণ্ডগােল আছে। তুমি কি কষ্ট করে একটু আসবে?
“নিশ্চয়ই আসব।’ | তিনি বিছানা থেকে নামলেন। এই হাসপাতালে সিস্টার মেরিই একমাত্র ব্যক্তি, যার প্রতিটি কথা তিনি বুঝতে পারেন। এই মহিলার গলার স্বরও সুন্দর। শুনতে ইচ্ছে করে। সে কথাও বলে একটু টেনে-টেনে।।
টেলিফোন ঢাকা থেকে এসেছে। অপালার গলা। ‘মা, কেমন আছ?” ‘ভালাে। ‘আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে না তাে?
কেমন আছিস? ‘ভালাে। আমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে জিজ্ঞেস কর।
পরীক্ষা কেমন হচ্ছে? ‘ভালাে না। মাঝারি ধরনের। ‘বলিস কি তুই এমন সিরিয়াস ছাত্রী, তাের পরীক্ষা মাঝারি ধরনের হবে কেন?
এখন হলে আমি কী করব? ‘তুই কি আমার কথা ভেবে-ভেবে পরীক্ষা খারাপ করলি ?
হতে পারে। তবে কনশাসলি ভাবি না। অবচেতন মনে হয়তাে ভাবি। সেটা বুঝলি কীভাবে?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘প্রায়ই স্বপ্নে দেখি, তােমার অপারেশন হচ্ছে। অপারেশনের মাঝখানে ডাক্তাররা গণ্ডগােল করে ফেলল…… এইসব আর কি।
সেকেও অপারেশনটা আমার বােধহয় লাগবে না। ‘তাই নাকি। এতবড় একটা খবর তুমি এতক্ষণে দিলে? ‘এখনাে সিওর না। ডাক্তাররা আরাে কী-সব টেস্ট করবে।
কবে নাগাদ সিওর হবে? ‘এই সপ্তাহটা লাগবে। তাের বাবা কেমন আছে? ‘জানি না। ভালােই আছে বােধহয়। একটা ভালাে খবর দিতে পারি না।’ ‘দিতে পারলে দে।
এখন থেকে ঠিক আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে বাবার সঙ্গে তােমার দেখা হবে। বাবা সিঙ্গাপুর থেকে ইংল্যাণ্ড যাচ্ছে।
‘ভালো ।’ ‘তুমি মনে হচ্ছে তেমন খুশি হও নি। ‘খুশি হয়েছি।’ ‘গলার স্বর কিন্তু কেমন শুকনাে-শুকনাে লাগছে।
এই বয়সে কি আর খুশিতে নেচে ওঠা ঠিক হবে? ‘খুশি হবার কোনাে বয়স নেই মা, যে-কোনাে বয়সে খুশি হওয়া যায়। ‘তা যায়।’
‘তুমি বাবার সঙ্গে চলে এসাে। ‘যদি সব ঠিকঠাক থাকে, তাহলে চলে আসব। ‘সব ঠিকঠাকই থাকবে।
থাকলেই ভালাে। ‘মা, তােমার শরীর কি সত্যি-সত্যি সেরেছে? ‘হ্যা। ‘কিন্তু এমন করে কথা বলছ কেন? যেন কোনাে উৎসাহ পাচ্ছ না। একটু হাস তাে মা।
তিনি হাসলেন। বেশ শব্দ করেই হাসলেন। আজ সারা দিনই তিনি খানিকটা বিষন্ন বােধ করছিলেন। সেই ভাবটা কেটে গেল। তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। সুন্দর রােদ উঠেছে। আকাশ অসম্ভব পরিষ্কার। রােদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে তাঁর ভালাে লাগছে। বাতাস অবশ্যি খুব ঠাণ্ডা। সুচের মতাে গায়ে বেঁধে। ভেতর থেকে ওভারকোটটি নিয়ে এলে ভালাে হত। কিন্তু ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
চোখ মেলতেই প্রিয় দৃশ্যটি দেখা গেল।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
জানালার কাছে চায়ের কাপ। একটি চড়ুই পাখি কাপের কিনারায় বসে ঠোঁট ডুবিয়ে চা খাচ্ছে। মাঝে-মাঝে তাকাচ্ছে ফিরােজের দিকে। এই ব্যাপারটি প্রথম ঘটে। ডিসেম্বর মাসের ১১ তারিখে। চায়ের দোকান থেকে যথারীতি জানালার পাশে গরম চা রেখে ডাক দিয়েছে স্যার উঠেন। ফিরােজ ঘুম-ঘুম চোখে দেখেছে। হাত বাড়াতে বাড়াতে আবার ঘুম। ঘুম ভাঙল এগারটার দিকে কিচিরমিচির শব্দে। চায়ের কাপ ঘিরে পাঁচ-ছটা চড়ুই পাখি। মহানন্দে কাপে ঠোঁট ডুবিয়ে কিচিরমিচির করছে। সেই থেকে রােজ হচ্ছে। পাখিগুলি মনে হয় অপেক্ষা করে থাকে কখন চা আসবে। সেই চা ঠাণ্ডা হবে। রােজ তাদের সে-সুযােগ হয় না। বিছানায় আধশােয়া হয়ে ফিরােজ কাপ টেনে নেয়। চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত। তিক্ত, কষা ও মধু—এই তিন স্বাদের সমাহার। ভােরের প্রথম শারীরিক আনন্দ।
আজ ফিরােজের কোনােই কাজ নেই। কোথাও যেতে হবে না। দেনদরবার করতে হবে না। সাধারণত যে-দিন কোনাে কাজ থাকে না, সে-দিন সূর্য ওঠার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। কাজের দিনে কিছুতেই ঘুম ভাঙতে চায় না। মনে হয় আরাে খানিকক্ষণ শুয়ে থাকি। আজ উল্টো ব্যাপার ঘটল। কোনাে কাজকর্ম নেই, তবু বেশ খানিকক্ষণ ঘুমুনাে গেল। চড়ুই পাখিটি কৃতজ্ঞ চোখে তাকাচ্ছে।
তার সঙ্গীরা আজ কেউ আসে নি। এলেও চা-পর্ব সমাধা করে চলে গিয়েছে। এই ব্যাটা যাচ্ছে না। হিন্দি ভাষায় ফিরােজ পাখিটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালাল। পশু পাখিরা বাংলা ভাষাটা তেমন বােঝে না। | ‘কেয়া ভাই চিড়িয়া, হালত কেয়া?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘চিকির চিকির চিক।
‘চিনি উনি সব ঠিক থা? ‘চিকির চিকির। ‘আউর এক দফা হােগা কেয়া নেহি? ‘চিক চিকির চিকির।
ফিরােজের ধারণা, পাখিরা মাের্স কোডে কথা বলে। চিকির এবং চিক এই দু’টি শব্দই নানান পারমুটেশন কম্বিনেশনে বেরিয়ে আসছে। এই বিষয়ে একটা গবেষণা হওয়া উচিত। সময় থাকলে দু-একজন পক্ষীবিশারদের সাথে কথা বলা যেত। পশু পাখিদের ভাষাটা জানা থাকলে নিঃসঙ্গ মানুষদের বড় সুবিধে হত।।
ফিরােজ টুথপেস্ট হাতে বারান্দায় এল। তার ঘর দোতলায়। একটি শােবার ঘর। জানালাবিহীন অন্য একটি কামরা এক শ’ ওয়াটের বাতি জ্বাললেও অন্ধকার হয়ে থাকে। সেই ঘরের উল্টো দিকে বাথরুম, যা অন্য এক জন ভাড়াটে রমিজ সাহেবের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যখনি ফিরােজের বাথরুমে যাবার দরকার হয়, তখনি রমিজ সাহেবকে বাথরুমের ভেতর পাওয়া যায়। ভদ্রলােকের ব্যাপার সব অদ্ভুত। বাথরুমে এক বার ঢুকলে আর বেরুবেন না।
Read more