আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

লতিফা সঙ্গে-সঙ্গে উঠে চলে গেল। ফিরােজ একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস চেপে ফেলল। তার ইচ্ছে করছে, বলে—পাত্র হিসেবে আমাকে আপনার কেমন লাগে? বলা হল না। আধুনিক সমাজে বাস করার এই অসুবিধে। মনের কথা খােলাখুলি কখনাে বলা যায় না। একটি মেয়েকে ভালাে লাগলেও তাকে সরাসরি সেই কথা বলা যাবে না। অনেক ভণিতা করতে হবেঅনেক চড়াই-উত্রাই পার হতে হবে। 

আকাশ জোড়া মেঘহাজি সাহেব বললেন, ‘আমার মেয়েটা বড় আদরের। ফিরােজ কিছু বলল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটার একটা আলাদা মজা আছে। যে-কোনাে দিকে যাওয়া যায়, যেখানে ইচ্ছে সেখানে থেমে যাওয়া যায়। এই সৌভাগ্য ক’জনার হয়? সবাই ব্যস্ত। সবাই ছুটছে। এর মধ্যে দু’-এক জন অন্য রকম থাকুক না, যাদের ছােটার ইচ্ছে নেই, প্রয়ােজনও নেই। | এখন প্রায় বিকেল। হাঁটতে-হাঁটতে অপালাদের বাড়ির সামনে চলে যাওয়া যায়।

কেন জানি এই অহঙ্কারী মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তার কঠিন মুখ, চোখের তীব্র দৃষ্টিও কেন জানি মধুর। এর ব্যাখ্যা কী? কোনাে ব্যাখ্যা নেই। এই রহস্যময় পৃথিবীর অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না। কবি, দার্শনিক, শিল্পীরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টা কত যুগ আগে শুরু হয়েছে, এখনও চলছে। ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয় নি। 

‘ফিরােজ সাহেব, কী ভাবছেন? ‘কিছু ভাবছি না। শরীরটা খারাপ লাগছে। 

সে কী! আজ আর চা-টা কিছু খাব না। ডাক্তারের কাছে যাববমি-বমি লাগছে।” ফিরােজ বমির ভঙ্গি করে চোখ-মুখ উল্টে দিয়ে বলল, ‘কাল রাতেও চার বার বমি হয়েছে। আমি উঠলাম। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

অপালাদের বাড়ির সামনে ফিরােজ দাঁড়িয়ে আছে। এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন তাকে দেখা না-যায়। মানুষের অদৃশ্য হবার ক্ষমতা থাকলে বেশ হত। মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যেত সে কী করছেএই মুহূর্তে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। চেইনে বাঁধা ভয়াবহ কুকুর দুটি চেইন ছিড়ে ফেলবার একটা কসরত করছে। মালীকে নিড়ানি হাতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া সব ফাঁকা।। 

‘স্যার। ফিরােজ চমকে উঠল। 

‘আপনাকে ডাকে স্যার‘কে ডাকে?’ ‘আপা আপনাকে যাইতে বলছে। 

‘কোন আপা? ‘অপালা আপা। ‘সে কী। কোথায় তিনি? 

অপালাদের দারােয়ান তার উত্তর দিল না। দারােয়ান-শ্রেণীর লােকেরা কথা কম বলে। 

মেয়েটিকে সম্পূর্ণ অন্য রকম লাগছে। ফিরােজ ভেবে পেল না একই মেয়েকে একেক দিন একেক রকম লাগে কেন। এর পিছনের রহস্যটা কী? সাজগােজের একটা ব্যাপার থাকতে পারে। তার ভূমিকা কতই-বা আর হবে? চোখে কাজল দিয়ে চোখ দুটিকে টানা-টানা করা যায়। চুল মাঝখানে সিথি না-করে বাঁ দিকে করে খানিকটা বদলানাে যায়। পার্ম করে চুলে ঢেউ খেলানাে নিয়ে আসা যায়, কিন্তু তার পরেও তাে মানুষটি ঠিকই থাকবে। 

‘বসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? 

ফিরােজ বসল। বসতে-বসতে মনে হল অপালার গলার স্বরও এখন অন্য রকম লাগছে। একটু যেন ভারী। আগেকার তরল কণ্ঠস্বর নয়। 

‘আপনি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এর আগেও একদিন এসে ছিলেন। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যান। কেন বলুন তাে? 

ফিরােজ কী বলবে ভেবে পেল না। কিছু এই মুহূর্তেই বলা উচিত। মেয়েটি জবাব শােনবার জন্যে অপেক্ষা করছে। জবাবের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। জবাব যদি তার পছন্দ হয়, তাহলে সে ফিরােজের সামনের চেয়ারটায় বসবে, পছন্দ না হলে বসবে না। অহঙ্কারী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে। 

অপালা বলল, আপনার যদি আপত্তি থাকে তাহলে বলার দরকার নেই। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

‘না, কোনাে আপত্তি নেই। আপনার সঙ্গে দেখা হবে এই আশাতেই দাঁড়িয়ে থাকি। দু’ দিন মাত্র নয়, তার আগেও কয়েক বার এসেছি। 

ফিরােজ লক্ষ করল, মেয়েটির চেহারা কঠিন হতে শুরু করেছে। কী প্রচণ্ড রাগ এই মেয়ের! গাল কেমন টকটকে লাল হয়ে গেল—ঠোঁট কাঁপছে। মেয়েটি নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছে। সামলাতে পারছে না। মানুষের সঙ্গে কথা বলে এই মেয়ের তেমন অভ্যাস নেই। অভ্যাস থাকলে খুব সহজেই নিজেকে সামলাতে পারত। ফিরােজ বলল, আমার সব কথা না শুনেই আপনি রেগে যাচ্ছেন। সবটা আগে শােনা ভালাে নয় কি? 

‘বলুন, শুনছি। 

‘আপনি বসুন, তারপর বলছি। আপনি দাঁড়িয়ে থাকবেন আর আমি বসে-বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলব, তা তাে হয় না। আর আপনি যদি মনে করেন যে আমার স্তর আর আপনার স্তর আলাদা, তাহলে অবশ্যি ভিন্ন কথা। 

অপালা বসল। সে তাকিয়ে আছে ফিরােজের দিকে, এক বারও চোখ ফিরিয়ে 

নিচ্ছে না। এটিও একটা মজার ব্যাপার। এই বয়সের অবিবাহিত মেয়েরা দীর্ঘ সময় পুরুষমানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। অসংখ্য বার তারা চোখ নামিয়ে নেয়। 

‘কি বলবেন, বলুন। 

‘আমি নিজের মতাে করে আপনাদের একটা ঘর সাজিয়ে দিয়েছি। সেটা আপনাদের পছন্দ হয়েছে কি হয় নি আমাকে কিছু বলেন নি। আমার জানতে ইচ্ছা করে। জানবার জন্যেই আসি।’ 

‘আসেন তাে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন? 

‘আপনাদের দু’টি বিশাল কুকুর আছে। আমি কুকুর ভয় পাই। ছােটবেলায় আমাকে দু’ বার পাগলা কুকুরে কামড়েছে। 

অপালার কঠিন মুখ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। গালের লাগ রঙ এখন অনেকটা কম, নিঃশ্বাস সহজ। 

‘আপনার কাজ আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি ম্যানেজারকাকুকে বলেছিলাম, চিঠিতে আপনাকে জানানাের জন্যে। তিনি বােধহয় জানাতে ভুলে গেছেন। 

‘চিঠিতেই যখন জানানাের জন্যে বলেছেন, আপনি নিজেও তাে জানাতে পারতেন। পারতেন না? 

‘হা, পারতাম। ‘কাজ আপনার ভালাে লেগেছে শুনে খুশি হলাম। এখন তাহলে উঠি। 

ফিরােজ উঠে দাঁড়াল। মনে ক্ষীণ আশা, মেয়েটি বলবে, বসুন, চা খেয়ে যান। সন্ধ্যাবেলা এইটুকু ভদ্রতা সে কি করবে না? 

অপালা বলল, আপনি বসুন। আমার সঙ্গে চা খান। 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *