‘মা অপালা।
‘তুমি একা-একা থাক, তােমার বােধহয় খারাপ লাগে। “না, আমার খারাপ লাগে না।
‘খারাপ না-লাগলেও লােনলি তাে নিশ্চয়ই লাগে। আমি তােমার কাকিমাকে বলেছি, সে এসে থাকবে।
‘কোনাে দরকার নেই। ‘না, দরকার আছে।
‘বেশ, দরকার থাকলে তাঁকে নিয়ে আসুন। তবে আপনি কিন্তু কাকু শুধু-শুধু ভয় পাচ্ছেন। ঐ ছেলে আর এখানে আসবে না।
নিশানাথবাবুকে কোনাে কথা বলার সুযােগ না দিয়ে অপালা উঠে গেল। তার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
ফখরুদ্দিন সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, ‘আমি একটা টেলিফোন করব। দয়া করে ব্যবস্থা করে দিন।
যে-নার্স তাঁর মুখের ওপর ঝুঁকে আছে, সে বলল, ‘আরাে একটু ভালাে হয়ে নাও, তারপর করবে।
‘আমি ভালাে আছি। ‘তুমি মােটেও ভালাে নও। খুবই অসুস্থ। ‘কতটা অসুস্থ? ‘অনেকটা। তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে—ঈশ্বরের অনুগ্রহে ফিরে এসেছ। ‘এখন ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমাকে একটি টেলিফোন করতে দাও।’
‘নিশ্চয়ই করবে। আত্মীয়স্বজনকে খবর দিতে চাও তাে? সে-ব্যবস্থা আমরা করেছি। তােমাদের এম্বাসিকে জানানাে হয়েছে। তারা নিশ্চয়ই প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
আমাদের এ্যাসির কাজকর্ম সম্পর্কে তােমার কোনাে ধারণা নেই। ওরা কিছুই করে নি। যে-নােট তােমরা পাঠিয়েছ, সেই নােট ওরা এখনাে পড়ে নি। খাম খােলা হয় নি বলেই আমার ধারণা।
নার্স কোনাে কথা বলল না। ফখরুদ্দিন সাহেবের বাঁ হাতে একটি ইনজেকশন করল। ফখরুদ্দিন সাহেব আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙল রাত নটায়। টেলিফোনে প্রথম কথা বললেন অপালার সঙ্গে।
‘বাবা, তুমি! সবাই চিন্তায় অস্থির। তােমার কোনাে খোঁজ নেই। মা’র সঙ্গে ঐ দিন কথা হল, মাও তােমার কোনাে খোঁজখবর জানে না। তুমি আছ কেমন?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
খুব ভালাে আছি।
গলার স্বর এমন লাগছে কেন? ‘সর্দি লেগেছে। কথাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এখন তাে তাও কথা বলতে পারছি।
তুমি কথা বলছ কোথেকে? ‘লণ্ডন থেকেই বলছি।
এতদিন ডুব মেরে ছিলে কেন?’ ‘দেখলাম ডুব মেরে থাকতে কেমন লাগে। এক দিন তাে ডুব মারতেই হবে। হা হা হা। তােমার খবর কি?’
‘আমার কোনাে খবর নেই। বসার ঘর ঠিক করা হয়েছে বাবা। এত সুন্দর করে সাজিয়েছে যে, দেখলে তােমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
তােমার কথা বুঝতে পারছি না মা। কিসের ঘর ? ও-মা, ভুলে গেছ! বসার ঘরের ডেকোরেশন বদলানাে হল না? ও, আচ্ছা। ‘তােমার তাে এটা ভুলে যাবার কথা নয় বাবা! তুমি তাে কিছুই ভােল না।
এখন মনে হয় কিছু-কিছু ভুলে যাচ্ছি। বয়স হয়ে যাচ্ছে। গেটিং ওল্ড। বসার ঘরটা খুব সুন্দর হয়েছে বুঝি?
‘খুব সুন্দর! এক বার বসার ঘরে ঢুকলে তােমার বেরুতে ইচ্ছা করবে না।’ ‘তাহলে তাে ডেকোরেশন ঠিক হয় নি। বসার ঘর এমন হবে, যেন কেউ বেশিক্ষণ বসে। যেন খুব অস্বস্তি বােধ করে। চট করে চলে যায়। হা হা হা।
‘বাবা।
কি মা? ‘তােমার হাসিটাও কেমন যেন অন্য রকম লাগছে।
কী-রকম লাগছে? ‘মনে হচ্ছে হাসির তেমন জোর নেই।’ “আচ্ছা, দেখ তাে এখন কেমন মনে হয় হা হা হা।
ফখরুদ্দিন সাহেব টেলিফোন নামিয়ে রেখে ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখ মুছলেন। তাঁর আরাে কয়েকটি কল করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। মনে হচ্ছে শরীর একেবারেই গেছে। দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। দেশের মাটিতে মরতে হবে, এ রকম কোনাে সেন্টিমেন্টাল চিন্তা-ভাবনা তাঁর নেই। এ-রকম চিন্তা-ভাবনা থাকবে। বড়-বড় কবি-সাহিত্যিকদের, দেশপ্রেমিক-রাজনীতিবিদদের। তিনি তাঁদের কেউ নন।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
নিতান্তই এলেবেলে ধরনের এক জন মানুষ। তাঁর কোনাে রােমান্টিক চিন্তা-ভাবনা থাকার কথা নয়। কিন্তু তবু রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি বৃষ্টির শব্দ শুনলেন। ঝমঝম বৃষ্টি। আষাঢ় মাসের প্রবল বর্ষণ। তিনি বেল টিপে নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে নার্স?
নার্স অবাক হয়ে বলল, ‘কই, না তাে।
“হয়তাে হচ্ছে, তুমি বুঝতে পারছ না। দয়া করে একটু বারান্দায় দেখে আসবে? এ-রকম বৃষ্টি শুধু আমাদের দেশেই হয়। তুমি বােধহয় জান না, আমাদের দেশ হচ্ছে বৃষ্টির দেশ।
আমি তাে শুনেছিলাম তােমাদের দেশ হচ্ছে অভাবের দেশ।
Read more