আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৪)

‘অপা, কি করছ তুমি? ‘পড়ছি কাকিমা, আজ আমার ফিফথ পেপার পরীক্ষা। ‘ও-মা! কই, আমি তাে জানি না।’ ‘আপনি জানবেন কেন? আপনার তাে জানার কথা নয়। ‘পরীক্ষা কখন? 

বিকেলে দু’টার সময় আরম্ভ হবে, শেষ হবে পাঁচটায়। ‘তাহলে তাে তােমার দুপুরের খাবার ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করতে হয়।’ 

আকাশ জোড়া মেঘ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না কাকিমা, পরীক্ষার আগে আমার খুব টেনশান থাকে, আমি কিছু খেতে পারি না। 

‘সে কী কথা! কিছুই খাবে না? ‘একটু চা খাব , একটা স্যাণ্ডউইচ খাব। ঐ নিয়ে আপনি ভাববেন না। 

‘দৈ আছে কি না ঘরে, কে জানে। দৈ খেলে পেটটা ঠাণ্ডা থাকবে। দাঁড়াও, আমি দৈয়ের ব্যবস্থা করছি। ঘরে-পাতা দৈ। তােমার ম্যানেজারকাকু ঘরে-পাতা দৈ ছাড়া খেতে পারে না।’ 

‘আপনাকে কোনাে ঝামেলা করতে হবে না।’ ‘ঝামেলা কিছু না। যাব আর নিয়ে আসব। গাড়ি তাে আছেই। 

অপালা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনি যখন বেরুচ্ছেন, তখন একটা কাজ করতে পারবেন? 

‘পারব না মানে! কী কাজ? 

‘দামি একটা শাড়ি কিনে আনতে পারবেন? যেন খুব ভালাে হয়। ‘তােমার জন্যে। 

না, আমার জন্যে না। আমি একজনকে উপহার দেব? কাকে? 

অপালা মনে-মনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। এই মহিলাকে কিছু বলাই বােকামি। এক লক্ষ প্রশ্ন করবে। বিরক্ত করে মারবে। 

‘কাকে দেবে শাড়ি? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘এক ভদ্রলােক তাঁর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিয়ে গিয়েছেন। ভদ্রলােককে আমি চিনি না। খুব আগ্রহ করে দাওয়াত দিয়েছেন। খুব মায়া লেগেছে। তা ছাড়া বাবা এখানে থাকলে নিশ্চয়ই কিছু-একটা দিতেন। 

উনি যখন নেই, তখন তােমার এত মাথাব্যথা কেন?” ‘আপনি না-পারলে ম্যানেজারকাকুকে বলুন। ‘পারব না কেন? কত টাকার মধ্যে কিনব?’ ‘আগেই তাে বলেছি, দামি একটা শাড়ি। 

একেক জনের দামি তাে একেক রকম মা। আমার কাছে তাে তিন শ’ টাকা দামের শাড়িই মনে হয় অনেক দামি। 

‘আপনি পছন্দ করে কিনুন। আর কাকিমা, এখন যান। আমি পড়ছি, একটা চ্যাপ্টার এখনাে বাকি। 

মেয়েটা কেমন, ফর্সা না কালাে? শাড়ি তাে সেইভাবেই কিনতে হবে। ‘আমি মেয়েটাকে দেখি নি। বাঙালি মেয়ে যে-রকম হয়, সে-রকম হবে। খুব বেশি ফর্সা নয়, কালােও নয়। কাকিমা, আপনি এখন যান। 

ভাপা পিঠা খাবে? ভাপা পিঠা বানাচ্ছি। ‘আমি এখন কিছু খাব না। 

আজ অপালার ফিফথ পেপার। এই পেপারেই তার প্রিপারেশন সবচেয়ে কম। পরীক্ষা খুব খারাপ হবে। একটা চ্যাপ্টার এখনাে পুরাে বাকি। পরীক্ষার ঠিক আগে আগে পড়বে ভেবেছিল, যাতে মনে থাকে, এলােমেলাে না-হয়ে যায়। কিন্তু সকাল থেকেই একটার পর একটা ঝামেলা। বই নিয়ে বসার সঙ্গে-সঙ্গে একটা মেয়ে ফোন করল। অপালা ‘হালাে’ বলমাত্র একনাগাড়ে কথা বলতে লাগল-নমি, আজ কী হয়েছে শােন্। ভাই, আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। এত অপমানিত হয়েছি। আমি আমার জীবনে এত অপমানিত হই নি বিশ্বাস কর, এক ঘন্টা কেঁদেছি। রিকশায় কাঁদতে-কাঁদতে এসেছি। রাস্তার সমস্ত লোেক আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। রিকশাওয়ালা পর্যন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেছে……. 

অপালা বলবার সুযোেগই পেল না যে এটা রং নাম্বার, আর তার নাম নমিতা নয়। মেয়েটা নিজের কথা বলতে-বলতে ফোঁপাতে শুরু করল। কী অস্বস্তিকর অবস্থা! অপালা বলল, ‘শুনুন, আমার নাম নমিতা নয়। আপনার রং নাম্বার হয়েছে।’ 

ফোনের ওপাশে মেয়েটি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, আপনি কে? 

‘আমার নাম অপালা। 

‘ও, আচ্ছা। আপনি আমার এইসব কথা কাউকে বলবেন না, প্লীজ। 

কী অদ্ভুত কথা! অপালা কাকে এ-সব কথা বলবে? আর বললেই-বা কী? কে চিনবে এই মেয়েকে? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

ফোন রেখে বই নিয়ে বসেও মেয়েটির কথা মনে হতে লাগল। বইয়ে মন বসছে না। পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু পড়াটা মনে ধরছে না। তখন টঙ্গির কারখানা থেকে টেলিফোন। মিজান বলে কে এক লােক! সুপারভাইজার। তাকে অপালা কোনাে দিন চোখেও দেখে নি। লােকটি তাকে ম্যাডাম ডাকছে। অপালা কঠিন স্বরে বলল, আমাকে ফোন করেছেন কেন? আমার সঙ্গে আপনার কী দরকার? 

‘ম্যাডাম, একটা খুব বড় ঝামেলা হয়েছে। “কি ঝামেলা? 

‘অফিসার লেভেলের সবাইকে শ্রমিকরা একটা ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিয়েছে। ঘেরাও। 

‘আমাকে এটা জানাচ্ছেন কেন? আমি কী করব? 

‘না, মানে, আপনার কিছু করার নেই। আমরা পুলিশে খবর দিয়েছি। শুধু আপনাকে জানিয়ে রাখলাম। 

‘আমাকে জানিয়ে রাখার কোনাে দরকার নেই। প্লীজ, আমাকে শুধু-শুধু বিরক্ত করবেন না।’ 

‘ম্যাডাম, তেরি সরি। 

অপালা টেলিফোন নামিয়ে রাখল। এত ঝামেলা নিয়ে কিছু করা যায়? বারটা পর্যন্ত একনাগাড়ে পড়বে ভেবেছিল সে। এগারটা বাজতেই উঠে পড়ল। বাগানে রােদে খানিকক্ষণ হাঁটল। মালী বলল, ‘ফুল দেব আপা?’ বলেই সে অপেক্ষা করল না, বিরাট বড় একটা গােলাপ ছিড়ে দিল। এত সুন্দর একটা গােলাপ হাতে নিলে কেমন মন খারাপ হয়ে যায়। 

আরাে দেব আপা?’ ‘না, আর লাগবে না। 

অপালা গােলাপ হাতে নিয়ে বাগানে হাঁটছে। অরুণা এবং বরুণা অলস পায়ে তার পিছনে-পিছনে হাঁটছে। শীতের দিনের ঝকঝকে সােনালি রােদে এদের তিন জনকে চমৎকার লাগছে। মালী কাজ ভুলে এদের দিকে তাকিয়ে আছে। 

ফিরােজের জ্বর তৃতীয় দিনে নেমে গেল। তার ধারণা হয়েছিল ব্রংকাইটিস, নিউমােনিয়া 

এইসব কিছু-একটা হয়েছে। তা নয়, ঠাণ্ডা লেগেছিল। তা তাকে তেমন কাবু করতে। পারল না। এই তাে আজ বেশ উঠে বসতে পারছে। সিগারেটের তৃষ্ণা হচ্ছে। সিগারেটের তৃষ্ণা হবার মানে-রােগ সেরে গেছে। সে সিঁড়ি বেয়ে-বেয়ে নিচে নেমে গেল। – হাজি সাহেব নিড়ানি হাতে বাগানে। ফুলের বাগান নয়, টমেটো গাছ। লাগিয়েছিলেন। বাজারভর্তি পাকা টমেটো, কিন্তু হাজি সাহেবের গাছে সবে ফুল ফুটছে। 

ফিরােজের ধারণা, অতিরিক্ত যত্নের কারণে এই অবস্থা। 

‘হাজি সাহেব, কেমন আছেন?’ ‘ভালাে। আপনার জ্বর সেরে গেছে নাকি ?

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৫) 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *