আপনার বান্ধবীর সঙ্গেও আমার আলাপ হয়েছে। খুব লাজুক মেয়ে, তবু কিছু কথা শেষ পর্যন্ত বলেছে। তবে আমার ধারণা, আপনার সঙ্গে সে বু বকবক করবে। আচ্ছা, আপনি আমাকে কিন্তু একটা ভুল কথা বলেছেন। আপনাদের বিয়ের ব্যাপারে। ভুল আমি ভেঙে দিয়েছি। আপনার বান্ধবী, তার বাবা এবং মা সবাই খুব খুশি। তারা মনে-মনে সুপাত্র হিসেবে আপনাকে কামনা করছিলেন। মনের কথাটা পর্যন্ত বললেন না। আপনার সঙ্গে এই দিকে আমার কিছু মিল আছে।
আমিও নিজের মনের কথাটা কিছুতেই বলতে পারি না। আমার একটা ডাইরি আছে, মাঝে মাঝে তাতে লিখি। এই মুহুর্তে আপনাকে আমার একটা মনের কথা বলি।
আমার মনে হচ্ছে, এখন বললে সেটা খুব দোষের হবে না। কথাটা হচ্ছে, আমি যখন জানলাম—সাপনার এক জল ভালবাসার মানুষ আছে, তখন আমার কেন জানি মন খারাপ হয়ে। গিয়েছিল। মন-খারাপ ভাবটা এখনাে পুরােপুরি কাটে নি। কাটতেই যে হবে, এমন তাে কোনাে কথা নেই। না-কাটাই ভালাে। কী বলেন আপনি? আমি ঠিক বলি নি? কিছু–কিছু কষ্ট আছে সুখের মতাে। আবার কিছু–কিছু কষ্ট খুব কঠিন। এখন আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনি সুস্থ হয়ে উঠলেই আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় বেড়াতে যাব। যেখানে যাব, সেখানে চমৎকার একটা রহস্য আছে। দেখি, আপনি রহস্য ভেদ
করতে পারেন কি না। আমার মনে হয় আপনি পারবেন। কারণ, আপনার খুব বুদ্ধি—অন্তত আমার তাই ধারণা। এই চিঠি আপনি পাবেন কি না বুঝতে পারছি না। কে জানে হয়তাে চিঠি পৌছবার আগেই সুস্থ হয়ে ফিরে যাবেন। আগ্রহ নিয়ে এই চিঠি লিখছি, আপনি তা না পেলে খুব কষ্টের ব্যাপার হবে।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
বিনীতা অপালা।
সারা রাত ফিরােজ ঘুমুতে পারল না।
কত বার যে চিঠিটা পড়ল! প্রতিবারই মনে হল এটা তাে আগে পড়া হয় নি। এ্যাটেনডিং ফিজিশিয়ান এক সময় বললেন, আপনি এমন ছটফট করছেন কেন? কোনাে অসুবিধা হচ্ছে কি?
‘জ্বি হচ্ছে। অস্থির-অস্থির লাগছে।
‘অস্থির-অস্থির লাগার তাে কোনাে কারণ দেখছি না। অসুখ সেরে গেছে, কাল পরশুর মধ্যে রিলিজ অর্ডার হবে। আসুন, আপনাকে একটা ট্রাংকুলাইজার দিয়ে দিই।
একটায় কাজ হবে না, বেশি করে দিন। আপনার কী হয়েছে বলুন তাে? ‘খুব আনন্দ হচ্ছে ডাক্তারসাহেব।
ফিরােজ ঘুমুতে গেল শেষরাতের দিকে। ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। নাশতা নিয়ে এসেছে। দরিদ্র দেশের হাসপাতালের তুলনায় বেশ ভালাে নাশতা। দু’ পিস রুটি, একটা সেদ্ধ ডিম, একটা কলা, এক গ্লাস দুধ। নাশতা যে দিতে আসে, সে টে নামিয়ে দিয়েই চলে যায় না। অপেক্ষা করে। কোনাে রুগী যখন বলে—‘ভালাে লাগছে না, কিছু খাব
’, তখন যে বড় খুশি হয়। ট্রে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আজ তাকে খুশি করা গেল না। ফিরােজের খুব খিদে পেয়েছে। জানালা গলে শীতের রােদ এসেছে। খুবই ভালাে লাগছে সেই রােদের দিকে তাকিয়ে থাকতে। বেড নাম্বার চল্লিশের বুড়াে রুগীটি খুব কষ্ট পাচ্ছে। গােঙানির মতাে শব্দ করছে। গভীর বেদনায় ফিরােজের মন ভরে গেল। তার ইচ্ছে করতে লাগল, রুগীর মাথার কাছে গিয়ে বসে। মাঝে-মাঝে পৃথিবীর সবাইকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে।
ফিরােজ সত্যি-সত্যি বেড নাম্বার চল্লিশের দিকে এগিয়ে গেল। নরম গলায় বলল, আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
দরজা খুলল বড় মেয়েটি।
অপালা এর নাম জানে না। শুধু এর কেন, কারােরই নাম জানে না। আজও হয়তাে জানা হবে না। অপালা ক্ষীণ স্বরে বলল, ভেতরে আসব?’ বড় মেয়েটি হা-না কিছুই বলল না। শুধু দরজা ছেড়ে একটু সরে গেল। অপালা বলল, তােমার নাম কি?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘আমার নাম সােমা।’
‘তােমারই কি বিয়ে হচ্ছে? ‘হা। ‘বিয়েটা যেন কবে? আমার তারিখটা মনে নেই। কার্ড হারিয়ে ফেলেছি। ‘এগার তারিখ। ‘আমি আবার আসায় তুমি কি রাগ করেছ? ‘রাগ করব কেন?
সােমা অপালার কাঁধে হাত রাখল। অপালা বলল, তুমি কি আমার বড়, না ছােট?
সােমা সে-কথার জবাব দিল না। হালকা গলায় বলল, ‘এস, ভেতরে এসে বস। ‘বাসায় কেউ নেই? কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে।’ ‘ওরা বাজারে গিয়েছে। ‘বিয়ের বাজার? ‘া।” ‘তােমার মা? উনি যান নি? ‘মা অসুস্থ, এখন ঘুমুচ্ছে। তুমি আমার সঙ্গে এস।’
তারা ভেতরের দিকে একটা ছােট্ট ঘরে এসে দাঁড়াল। দু দিকে দু’টি চৌকি পাতা। একটা পড়ার টেবিল। সুন্দর করে গােছানাে।
এটা তােমার ঘর?’
কে কে শােয় এখানে? ‘আমরা চার বােন। দু জন দু জন করে। তুমি বস। অপালা বসল। বসতে-বসতে বলল, ‘শাড়িটা কি তােমার পছন্দ হয়েছে?
সােমা এবারও হা–না কিছুই বলল না। সে বসেছে অপালার মুখােমুখি। কিন্তু এক বারও অপালার দিকে তাকাচ্ছে না। মাথা নিচু করে আছে।
যে-ছেলেটির সঙ্গে তােমার বিয়ে হচ্ছে তাকে কি তুমি দেখেছ?
‘ছেলেটিকে তােমার পছন্দ হয়েছে?
“পছন্দ হয় নি কেন?
সােমা উত্তর দিল না। তার মুখ ঈষৎ কঠিন হয়ে গেল। ছােট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে। অপালা বলল, আচ্ছা, আমরা দু’ জন কি যমজ বোন? দু জন দেখতে
অবিকল এক রকম, তাই না?
সােমা এবারও চুপ করে রইল।
‘আমার মনে হচ্ছে, আমরা যমজ বােন। ছােটবেলায় আমাদের বােধহয় একই রকম জামা-জুতাে পরানাে হত। হত না?
অপালা লক্ষ করল, সােমা কাঁদছে। নিঃশব্দ কান্না। মাঝে-মাঝে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। গালে সূক্ষ্ম জলের রেখা।।
‘সােমা।
‘ব।
‘আমার কী নাম ছিল তখন? আমার কী ধারণা, জান? আমার ধারণা, সােমার সঙ্গে মিলিয়ে আমার নাম ছিল রুমা।
সােমা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। সে বােধহয় চোখে কাজল দিয়েছিল, সারা মুখে কাজল লেপ্টে গেল।
তােমার চোখ তাে এমনিতেই সুন্দর, কাজল দিতে হবে কেন ?
Read more