সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১২)

আমার মায়েরও তাই ধারণামা বলেন, বুড়াে বয়সে কোনাে ধনী মহিলার উচিত নয় তার মেয়েকে কাছে রাখাবিশেষ করে সে মেয়ে যদি তােমার মত ইন্টেলিজেন্ট হয়। 

সবাই গেছে বনেকফি কেমন হয়েছে মালিশা ? ভালআরেক কাপ নেবে? দাওতােমার নাম কিন্তু আমি জানি না। 

আনিসতুমি কি ইন্ডিয়ান

বাংলাদেশ হচ্ছে আমার দেশ সেটা আবার কোথায় ? ইন্ডিয়ার পাশে ছােট একটা দেশসেখানেও কি ইন্ডিয়ার মত লক্ষ লক্ষ মানুষ থালা হাতে খাবারের জন্য ঘুড়ে বেড়ায় ? কোথায় শুনেছ এসব

আগে বল সত্যি কিনাডাস্টবিনের পাশে ছােট ছােট ছেলেমেয়েরা বসে থাকেকখন কেউ এসে খাবার ফেলবে সেই আশায়বল সত্যি নয় ? নাকি তােমার স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে

আনিস ইতস্তত করে বললাে, সত্যি নয়বড় বড় অভাব হয়েছেসেতাে পৃথিবীর সব দেশেই হয়েছেইউরােপে হয় নি ? আমেরিকাতেও তাে ডিপ্রেসন হয়েছে। 

আনিস তুমি রেগে যাও কেন ? তােমাকে রাগাবার জন্যে আমি বলি নিতােমরা যা ভাব দেশটি মােটেই সে রকম নয়মালিশা ঠোট চেপে হাসলােপরমুহূর্তে ভাল মানুষের মত বললাে, ইলেকট্রিসিটি আছে ? এসব জিজ্ঞেস করছাে কেন? কারণ জানতে ইচ্ছে হচ্ছেবলতে ইচ্ছা না হলে বলবে নাআনিস গম্ভীর মুখে বললাে, মালিশা ইলেকট্রিসিটি ফিটি নেইগাড়ি ফাড়িও নেইশহরে বাস সার্ভিসের বদলে আছে এ্যালিফেন্ট সার্ভিসহাতির পিঠে চড়ে যাওয়া আসা । 

ঠাট্টা করছ

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ

তা করছি কেউ আমার সঙ্গে ঠাট্টা করলে আমার ভাল লাগে নাপ্লীজ আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবে না এবং আমি সরি। 

সরি কী জন্যে

তােমাকে দেশের কথা বলে হার্ট করেছি সেই জন্যেআমার যখন টাকা হবে তখন আমি তােমার দেশ দেখতে যাব। 

বেশ তােদেশে তােমার কি বউ আছে

কোন সুইট হার্ট

তাও নেইআমি মনে মনে আশা করছিলাম তুমি বলবে নাবিবাহিত লােকদের আমার ভাল লাগে না| টুনটুন করে ঘন্টা বাজছেযে এসেছে সে যদিও ডাের বেল বাজাচ্ছে তবু লােকটি অপরিচিতএরকম করে ঘণ্টা কেউ বাজায় নাছােট বাচ্চাদের মত অনবরত টিপেই যাচ্ছেআনিস দরজা খুলে অবাক হয়ে গেলনিশানাথ বাবু| নিশানাথ বাবু ঘরে ঢুকেই মুগ্ধ কণ্ঠে বললেন, এই মেয়েটি বড় সুন্দর তাে ? দুর্গা প্রতিমার মত চোখ মালিশা বললাে, আপনি কি আমাকে নিয়ে কিছু বলছেন ? আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন তাই জিজ্ঞেস করছি। 

নিশানাথ বাবু হাসি মুখে বললেন, আমি বলছি এই মেয়েটি কে ? আমাদের এক গডেসএর চোখের মত অপূর্ব চোখ। 

মালিশা হাসি মুখে বললাে, আমার নাম মালিশাআজ আমার জন্মদিনজন্মদিন উপলক্ষে আপনি কি আমার সঙ্গে দয়া করে ডিনার খাবেন

খাবাে না কেন ? নিশানাথ বাবুর ভাব দেখে মনে হলাে তিনি খুব অবাক হয়েছেন প্রশ্ন শুনে। 

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদআমার সঙ্গে কিন্তু মাত্র চল্লিশ ডলার আছেমেক্সিকান রেস্টুরেন্টে গেলে মনে হয় এতেই তিনজনের হয়ে যাবে কী বলেন

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ

টেকো খেতে আর কয় পয়সা লাগবে ? হয়েও থাকবে দেখবেনিশানাথ বাবু ঠিকানা যােগাড় করে কীজন্যে হঠাৎ করে আনিসের সঙ্গে দেখা করে আসতে হবে কেন নিশানাথ বাবু বুঝতে পারেন নি। অনেক কিছুই তিনি বুঝতে পারেন নাআসতে বলা হয়েছে তিনি এসেছেন, ব্যাসআনিস বললাে, বাংলাদেশের স্টল কেমন দেখলেন

চমকারটম ছােকরা কী সব কায়দা কানুন করে দিয়েছে আমি স্তম্ভিত টেবিলটাতে হার্ডবাের্ড ফোর্ড লাগিয়ে রং টং দিয়ে এমন করেছে দেখে মনে হয় একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগারছােকরার গুণ আছে। 

মালিশা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললাে, আপনার নামটা কী দয়া করে বলবেন

আমার নাম নিশানাথএই নামের মানে কী? এর মানে হলাে গড অব দ্যা ডার্কনেসবাহু মজার নাম তাে

নিশানাথ বাবু সিগারেট ধরিয়ে বললেন, টম ছােকরার গুণ আছেহুলুস্থুল করছেবুঝলেন নাকি আনিস সাহেবপেছনে হার্ডবাের্ডের উপর বৃষ্টির ছবি এঁকেছেছবির দিকে তাকালেই বৃষ্টি পড়ার শব্দ শােনা যায়মনে হয় ব্যাঙ ডাকছে চারদিকে। 

মালিশ বললাে, ব্যাঙ ডাকছে মানে

আমাদের দেশে বৃষ্টি হলেই ব্যাঙ ডাকেসেই শব্দ জগতের মধুরতম ধ্বনির একটিতুমি না শুনলে বুঝতেই পারবে না। 

ব্যাঙের ডাক তাে আমি শুনেছিওর মধ্যে মধুরতার কী আছে?এইসব তুমি কী বলছ ? মালিশা তােমাকে বুঝানাে যাবে না। 

নিশানাথ বাবু ছােট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেনমালিশা অবাক হয়ে বললাে, আপনি অদ্ভূত লােক! সত্যি অদ্ভুত

মালিশার বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হল। 

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ

মেট্রোপলিটন বাসে উঠতে গিয়ে দেখে একটার উপর বাজেফাকা বাসসে ছাড়া অন্য কেউ নেইএকটি নব্বই বছরের বুড়ি ছিল সে টুয়েলভ স্ট্রীটে নেমে গেলনামবার সময় বুড়িটি বললাে, আমাকে একটু হাত ধরে নামিয়ে দেবে? | মালিশা এমন ভাব করল যেন সে শুনতে পায় নিবুড়ি দ্বিতীয়বার কিছু না বলে নিজে নিজেই নামলােএই বয়সেও রাত দুপুরে একা একা বাসে চড়া চাইখোজ নিলে দেখা যাবে পাস বই ভর্তি ডলারতবু পাঁচ ডলার খরচ করে ক্যাব ডাকবে নাদেশে একটা ফেডারেল আইন থাকা দরকারযে আইনে সত্তুরের উপর বয়স হলে সব টাকা পয়সা সরকারের কাছে সারেন্ডার করে নির্বাসনে যেতে হবে। 

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *