আনিস চুপ করে রইলাে। এডারসন আবার বললাে, তুমি প্রসটিটিউটের সঙ্গে ঘুরলেও কিছু যায় আসে না। কিন্তু মাঝে মাঝে বড় রকমের ঝামেলা হয়। হঠাৎ একদিন হয়ত মেয়েটি তােমাকে এসে বলবে আমার পেটে তােমার বাচ্চা। এবরশনের জন্যে হাজার দশেক ডলার দরকার।
আনিস গম্ভীর মুখে বললাে, জানলে কী করে মেয়েটি একটি প্রসটিটিউট ? আমি জানি। মেয়েটির নাম নিশ্চয়ই মালিশা। ঠিক না ? আনিস জবাব দিল না।
জোসেফাইন পঞ্চমবারের মত সফিকের চাকরি নট করে দিলাে। | তােমার মত মিনমিনে শয়তান, ফাজিল আর অকর্মাকে ছাড়াও আমার চলবে। শুক্রবার এসে পাওনা গণ্ডা বুঝে নেবে।
বুড়ির রেগে যাওয়ার কারণ সফিক একজন কাস্টমারের নাকে গদাম করে ঘুসি মেরেছে। বেচারার দোষ হচ্ছে সে নাকি সফিকের দেশ বাংলাদেশ শুনে কোমরে হাত দিয়ে হায়নার মত হেসেছে। জোসেফাইন চোখ লাল করে বলেছে, হেসেছে বলেই ঘুসি মারবে?
খুশি হয়ে বেচারা হেসেছে।
খুশি হয়ে হেসেছে মানে ? এই হাসি খুশি হওয়ার হাসি ? কীসের হাসি সেটা ? বল তুমি কীসের হাসি ? কীসের যে হাসি তা অবশ্যি সফিকও জানে না। হয়তাে বিনা কারণে হেসেছে। কিন্তু সফিকের মেজাজ সকাল থেকেই খারাপ যাচ্ছিল। সকাল বেলাতেই খবর পাওয়া গেছে জেমসটাউনের রকিবউদ্দিন একটি রেস্টুরেন্ট দিচ্ছে।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
মন খারাপ করার মত খবর নয়। কিন্তু রেস্টুরেন্টের নাম দিয়েছে ইন্ডিয়া হাউস‘। সফিককে টেলিফোন করে বললাে, বাংলাদেশের নামতাে কেউ জানে না। কিন্তু ইন্ডিয়ান ফুডের নাম জগৎ জোড়া, কাজেই নাম দিলাম ইন্ডিয়া হাউস। আপনি ভাই ফার্গোর সব বাঙালিদের খবর দেবেন। ইনশাআল্লাহ্ আগামী মাসেই খুলবাে।
সফিক মেঘস্বরে বললাে, “ইন্ডিয়া হাউস‘ নাম দিয়েছেন ? এখনাে ফাইনাল করি নাই। ইন্ডিয়া ফুড’ও দিতে পারি। অর্থাৎ ইন্ডিয়া থাকবেই? হ্যা তা তাে থাকতেই হবে ।
শুনেন ভাই আপনাকে যদি আমি ফার্গোতে দেখি তাহেল আপনাকে আমি খুন করে ইলেট্রিক চেয়ারে বসবাে বুঝেছেন।
আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। চুপ শালা।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
সফিক টেলিফোন রেখে নিক্স প্লেসে এসেই কাস্টমারের নাকে ঘুসি বসালাে। জোসেফাইন এবার সত্যি সত্যি রেগেছে। এ পর্যন্ত তিনবার বলেছে।
সফিক তােমাকে যেন আর না দেখি। যথেষ্ট হয়েছে।
সফিক নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখে ইমিগ্রেশন থেকে চিঠি এসেছে, সে যেন চিঠি পাওয়ার সাত দিনের ভেতর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাচারাইলেজেশন অফিসার টি রবার্টসনের সঙ্গে দেখা করে।
সফিককে এ নিয়ে চিন্তিত মনে হলাে না। তার মাথায় ঘুরছে কী করে হারামজাদা রহমানকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়া যায়। একটা বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট দিয়ে ফেললে কেমন হয়? খুব কি কঠিন ব্যাপার? নাম দেয়া যেতে পারে ‘দি মেঘনা‘–এ প্লেস ফর এক্সোটিক বাংলাদেশী ফুড । কিন্তু ফুড কি এক্সোটিক হবে ? শব্দটা ঠিক আছে নাকি ? এইসব ব্যাপারে রুনকি একজন ছােট খাটো বিশেষজ্ঞ। সফিক টেলিফোন করলাে তৎক্ষণাৎ। টেলিফোন ধরলেন রাহেলী।।
আমি সফিক। বুঝতে পারছি। কী ব্যাপার ? খালা আমরা একটা রেস্টুরেন্ট দিচ্ছি। নাম হচ্ছে আপনার ‘দি মেঘনা‘।
কী দিচ্ছ ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
রেস্টুরেন্ট। বাংলাদেশী সব খাবার টাবার পাওয়া যাবে। আজ সন্ধ্যায় বাসায় এসে সব আলাপ করব।
রাহেলা গম্ভীর গলায় বললেন, সন্ধ্যাবেলা আমরা থাকব না। ও আচ্ছা রুনকিকে একটু দেন। ওর সঙ্গে কথা বলি। রুনকি তাে নেই। নেই মানে ? রাহেলা থেমে থেমে বললেন, তুমি কি কিছু জান না?
নব ? রুনকি এখন আর আমাদের সঙ্গে থাকে না । কোথায় থাকে তাহলে ? রাহেলা ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, আমি জানি না কোথায় থাকে। সফিক অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাে, কই আমাকেতাে কিছুই বলেন নাই। তােমাকে বলতে হবে কেন? তুমি কে?
রাহেলা টেলিফোন নামিয়ে রেখে ছেলেমানুষের মত কেঁদে উঠলেন। এই শহরে আর থাকতে পারবেন না। অনেক দূরে চলে যেতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে যেতে হবে আড়ালে যাতে কেউ কখনাে রুনকির খোঁজে টেলিফোন করতে না পারে।
রুনকি গিয়ে উঠেছে টমের ওখানে। দুটি অবিবাহিত ছেলেমেয়ের এক সঙ্গে বাস করা এমন কিছু অবাক হওয়ার মত ঘটনা নয়। বিয়ের মত এমন একটি প্রাচীন ব্যবস্থা কী আর এত সময় পর্যন্ত ধরে রাখা যায়। এখন হচ্ছে লিভিং টুগেদার। যতদিন ইচ্ছে একসঙ্গে থাকা। যখন আর ভাল লাগছে না তখন দূরে সরে যাওয়া। কারাে কোনাে দায়িত্ব নেই। দায়িত্ব থাকলেই ভালােবাসা শিকলে আটকে যায়।
Read more