অয়ন নিচু গলায় বলল, চাচা, আমি যাচ্ছি না। যাচ্ছ না কেন?‘ ‘টাকা জোগাড় করতে পারিনি। একজনের দেয়ার কথা ছিল, সে শেষ পর্যন্ত ...‘ গার্ড বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে। ট্রেন নড়তে শুরু করেছে। অয়ন ছােট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।
মুনার চোখে পানি এসে গেছে। সে ভেজা চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
সােবাহান সাহেব পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে শান্তগলায় বললেন, বাবা, এই নাও, এখানে ছয় শ‘ টাকা আছে। তুমি যাও। দৌড়াও।
অয়ন ধরা গলায় বলল, বাদ দিন চাচা। আমি যাব না।
অয়নের খুব কষ্ট হচ্ছে। সে কখনােই কোথাও যেতে পারে না, সে জন্যে খুব। কষ্ট তাে তার হয় না। আজ কেন হচ্ছে? | সােবাহান সাহেব বললেন, এক থাপ্পড় দেব। বেয়াদব ছেলে। দৌড় দাও। দৌড় দাও।
মুনা বলল, যান অয়ন ভাই, যান। প্লীজ! অয়ন টাকা নিল।
সে দৌড়াতে শুরু করেছে। তার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে মুনা। কেন ছুটছে তা সে নিজেও জানে না। :
দলের সবাই জানালা দিয়ে মুখ বের করে তাকাচ্ছে। মােতালেব এবং সঞ্জু হাত বের করে রেখেছে — কাছাকাছি এলেই টেনে তুলে ফেলবে। এই তাে আর একটু। আর একটু ...।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২
সােবাহান সাহেব চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছেন – “হে মঙ্গলময় ! এই ছেলেটিকে দারুচিনি দ্বীপে যাবার ব্যবস্থা তুমি করে দাও।”
ট্রেনের গতি বাড়ছে।
গতি বাড়ছে অয়নের। আর ঠিক তার পাশাপাশি ছুটছে মুন। সে কিছুতেই অয়নকে ট্রেন মিস করতে দেবে না। কিছুতেই না।
এখন থেকেই শুরু হল আমাদের নতুন গল্প ,..
বেঁটে মানুষ ভাল দৌড়তে পারে না। বেঁটে মানুষের পা থাকে খাটো। খাটো পায়ে লম্বা স্টেপ নেয়া যায় না। কিন্তু বন্টু প্রায় উড়ে যাচ্ছে। সে অসাধ্য সাধন করল, ছুটন্ত ট্রেন প্রায় ধরে ফেলল। তার বন্ধুরা ট্রেনের দরজা–জানালায় ভিড় করে আছে। রানা হাত বের করে আছে। একবার বুদ্বুর হাত ধরতে পারলেই টেনে তুলে ফেলবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে– বন্টুর পাশাপাশি ছুটছে মুন। ট্রেনের কামরা থেকে মুখ বের করে যারা উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তাদের সবার মনে প্রশ্ন – এই মেয়েটা পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে কেন?
এর তো দারুচিনি দ্বীপে যাবার কথা না। মুনাও যে শেষ মুহূর্তে বন্টুর সঙ্গে দৌড়াতে থাকবে এবং অবিকল বন্দুর মতােই ট্রেনের দরজার হাতল চেপে ধরবে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পেরেছে। তখন আর সময় নেই। ট্রেনের চাকায় গতির কাপন। বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এখন প্লাটফর্মে নেমে যাবার উপায় নেই।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২
প্ল্যাটফর্মে হতভম্ব মুখে মুনার বাবা সােবাহান সাহেব পঁড়িয়ে আছেন। তিনি এখনো পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা হঠাৎ তার পাশ থেকে এমন ছুটতে শুরু করল কেন? কেনই–বা দৌড়ে ট্রেনে উঠে পড়ল? ট্রেনে তার বড় ভাই আছে, এটা একটা ভরসা। অবশ্যি সঞ্জু না থাকলেও সমস্যা হত না।
এই ছেলেমেয়েরা তার মেয়েটার কোনো অনাদর করবে না। এরা সঞ্জুর বন্ধু, তিনি এদের খুব ভাল করেই চেনেন। মুনা ট্রেনের জানালা থেকে মুখ বের করে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। সোবহান সাহেব এত দূর থেকে সেই হাসি দেখলেন না। তবে তিনি হাত নাড়লেন। হাত নেড়ে একধরনের অভয় দিলেন, বলার চেষ্টা করলেন, “সব ঠিক আছে।”
বাবার দিকে তাকিয়ে মুনার কান্না পাচ্ছে। একা একা দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে কী অসহায় দেখাচ্ছে! যেন একজন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মানুষ, যার সব প্রিয়জন একটু আগেই ট্রেনে করে অনেক অনেক দূরে চলে গেছে, যাদের আর কখনােই ফিরে পাওয়া যাবে না।
মুনার মনে হচ্ছে, তার বাবা কঁদছেন। তিনি অল্পতেই কঁাদেন। মূনা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিতে গেল সেদিনও তিনি কাঁদলেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
আহা!, দেখতে দেখতে মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল! আজ এসএসসি দিচ্ছে। দু‘দিন পরে বিয়ে দিতে হবে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২
যেদিন এসএসসির রেজাল্ট হল সেদিনও কঁদলেন। রুমাল চোখে চেপে ধরে গঢ়ি স্বরে বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি মা, খুবই খুশি। সেকেড ডিভিশন এমন খারাপ কিছু না, ম্যাট্রিকের সেকেন্ড ডিভিশনও খুব টফি। বাবা তার জন্য রাজশাহী সিল্কের শাড়ি কিনে আনলেন। পরীক্ষা পাসের উপহার। মুনার জীবনের প্রথম শাড়ি। সারা জীবনে মুনা নিশ্চয়ই অনেক জামাকাপড় কিনবে। অনেক শাড়ি কিনবে – কিন্তু জীবনের প্রথম শাড়িটার কথা কখনাে ভুলবে না। আচ্ছা, এই তথ্য কি বাবা
জানেন ?
বাতাসে মুনার চুল উড়ছে, গায়ের ওড়না উড়ছে। আর সে মনে মনে বলছে, কেন আমার বাবা এত ভালমানুষ হলেন? কেন? কেন?
Read more