রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৩)

দলের সবাই চোখ বড় বড় করে মুনার দিকে তাকিয়ে আছেকেউ কথা বলছে নাবিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কাটাতে সময় নিচ্ছেট্রেনের অন্য যাত্রীরাও ব্যাপারটা বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে

রূপালী দ্বীপমুনাকে তেমন বিচলিত মনে হচ্ছে নাদৌড়ে ট্রেনে এসে ওঠার পরিশ্রমে সে ক্লান্তবড় বড় করে নিঃশ্বাস নিচ্ছেসারা মুখে ঘামওড়নার প্রান্ত দিয়ে সে মুখের ঘাম মুছলসে এখন দাঁড়িয়ে আছে রানার সামনেবসার জায়গা 

আছেইচ্ছে করলে বসতে পারে, বসছে নাছেলেরা সিগারেট খাবে বলে আলাদা বসেছেমুনা মেয়েদের দেখতে পারছে নাসে দাড়িয়ে আছে মেয়েদের দিকে পেছন ফিরে। 

সবার প্রথমে নিজেকে সামলাল রানসে থমথমে গলায় প্রায় তােতলাতে তোতলাতে বলল, তুই কী মনে করে ট্রেনে লাফিয়ে উঠলি? চুপ করে আছিস কেন? জবাব দেআনসার মিএরকম ইডিওটিক একটা কাজ করলি কীভাবে? | মুনা কিছু বলল নাসে তার বড় ভাই সঞ্জুর দিকে তাকালসঞ্জু জানালা দিয়েমুখ বের করে আছেমনে হচ্ছে ট্রেনের কামরায় এতবড় নাটকীয় ঘটনা যে ঘটে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সঞ্জুর কোনো যােগ নেইসে বাইরের অন্ধকার দেখতেই পছন্দ করছেভাবটা এরকম যেন অন্ধকারে অনেক কিছু দেখার আছেমুনা নামের ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী এই মেয়েটিকে সে চেনে না। 

রানা এবার হুঙ্কার দিল, কথা বলমুখ সেলাই করে রেখেছিস কেন? কী মনে করে তুই লাফ দিয়ে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়লি? পা পিছলে চাকার নিচে গিয়ে মরেও 

তো যেতে পারতিস। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৩

মরিনি তোবেঁচে আছি। 

ভাগ্যক্রমে বেঁচে আছিসকেন উঠলি এখন বল। 

মুন সহজ গলায় বলল, আমি নিজেও জানি না কেন উঠেছি। জানলে বলতামঝোকের মাথায় উঠেছিএখন আমাকে কী করতে হবে? মা চাইতে হবে ? কারকাছে ক্ষমা চাইব? তােমাদের কাছে, না ট্রেনের কাছে

কথা ঘােরাচ্ছিস কেন? স্ট্রেইট কথার স্ট্রেইট জবাব দে।’ 

আনুশকা বলল, রানা, আপাতত তােমার জেরা বন্ধ রাখেমেয়েটা হাঁপাচ্ছেশান্ত হােকমুনা, তুমি এখানে বসো। 

আমি বসব নাবসবে না কেন?” 

আমি তেজৰ্গা স্টেশনে নেমে যাবআমাকে নিয়ে আপনাদের কাউকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। 

রানা গম্ভীর গলায় বলল, তেজ নেমে যাবি মানে? এই ট্রেন তেজগা থামে নাফার্স্ট স্টপেজ ভৈরব। 

আমি চেইন টেনে ট্রেন থামাবতারপর বেবিট্যাক্সি নিয়ে বাসায় চলে যাব‘ 

রানা হুংকার দিয়ে বলল, তাের সাহস বেশি হয়ে যাচ্ছে মুনাতুই টু মাচ সাহস দেখাচ্ছিসমেয়েদের টু মাচ কারেজ ভয়ংকর। 

মুনা ঝাঝালো গলায় বলল, তুমি উল্টাপাল্টা ইংরেজি বলবে না তো রানা ভাই, অসহ্য লাগে। 

আমি উলটাপাল্টা ইংরেজি বলি ?

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৩

হ্যা, বল আর অকারণে ধমক দাওশুধু শুধু আমাকে ধমকাচ্ছ কেন? আমি কী করেছি ?” 

কথা নেই, বার্তা নেই, তুই লাফ দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লি আর এখন বলছিস, আমি কী করেছি

বলেছি তাে, নেমে যাববলার পরেও ধমকাচ্ছ কেন?‘ 

মুলার গলা ভারী হয়ে এলনিজেকে সামলানাের আগেই চোখে পানি এসে গেলঅয়ন ভাই দেখে ফেলছে না তাে? সে বিবর্ণ মুখে অয়নের দিকে তাকালযা ভয় করেছিল, তাইঅয়ন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেমুন কান্না চাপতে গিয়ে আরাে সমস্যায় পড়লসমস্ত শরীর ভেঙে কান্না আসছে। 

রানা বিব্রত গলায় বলল, কান্না শুরু করলি কী মনে করে ? স্টপ ক্রাইংশেষে ধাবড়া খাবি। 

মুনা আরাে শব্দ করে কেঁদে উঠল। 

ট্রেনের গতি কমে আসছেতেজগা চলে এল বােধহয়ট্রেন থামবে না, তবে ধীরগতিতে এগুবেমুনা দরজার দিকে এগুচ্ছেরানা বলল, তুই যাচ্ছিস কোথায় ? মুনা জবাব দিল নাআনুশকা উঠে এলমুনার পিঠে হাত রেখে কোমল গলায় বলল, মুনা, তুমি আমার পাশে এসে বসােতুমিও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছ। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৩

মুনা ফেঁপাতে ফেঁপাতে বলল, আমি আপনাদের সঙ্গে গিয়ে কী করব? আপনারা বন্ধুরা গল্প করতে করতে যাবেনআমি কী করব? আমি কার সঙ্গে গল্প করব

আনুশকা মুনার কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমার কিন্তু ধারণা, গল্প করার মানুষ তােমারও আছেতােমাকে কাঁদতে দেখে সে খুব 

অস্থির হয়ে পড়েছেতুমি যদি তেজগা স্টেশনে নেমে পড় সেও নেমে পড়বে। 

আপা, আপনি চুপ করুন তো

বেশ, চুপ করলামতুমিও শান্ত হয়ে বসােআমার পাশে বসতে ইচ্ছা না হলে যেখানে ইচ্ছা বসেবসবে আমার পাশে ?

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *