রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৪)

মুনা করিডাের ধরে এগুচ্ছেরানা যাচ্ছে তার পেছনে পেছনেএই মেয়েকে চোখের আড়াল করা ঠিক হবে নাডেঞ্জারাস মেয়েকী করে বসে কে জানে? হয়ত ফট করে লাফ দিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে গেলযে চলন্ত ট্রেনে উঠতে পারে, সে নামতেও পারে

রূপালী দ্বীপরানা নরম গলায় বলল, মুনা শােন, আমার উপর রাগ করিস নাএতগুলি লােক নিয়ে যাচ্ছি, টেনশানে মেজাজ হট হয়ে থাকে যাচ্ছিস কোথায় ? বােস জানালার কাছে একটা সীট খালি আছে। 

মুনা বসলরানা তার পাশে বসতে বসতে বলল, তাের পাশে কিছুক্ষণ বসি, তাের রাগ কমলে উঠে যাব। 

আমার রাগ কমেছেতুমি উঠে যেতে চাইলে উঠে যেতে পারএতগুলি মানুষকে গাইড করে নিয়ে যাওয়ার টেনশান তুই বুঝবি না। 

তুমি গাইড করে নিচ্ছ মানে? গাইড করে নেয়ার এর মধ্যে কী আছে? সবাই ট্রেনে উঠেছে ট্রেন যাচ্ছে‘ 

ব্যাপারটা এত সােজা না রে মুনাএকটা দলকে নিয়ে বেড়াতে যাবার কী সমস্যা তা শুধু দলপতিই জানেআর কেউ জানে নাদলপতি হল একটা দলের সবচেলােনলি মানুষনিঃসঙ্গ শেরপা। 

তুমি বুঝি দলপতি

বলতে বলতে মুনা ফিক করে হেসে ফেললরানার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলবড় ফিচেল টাইপ মেয়েএই মেয়ে ভােগাবে বলে মনে হয়

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৪

তেজগা স্টেশনে চেইন টেনে তাকে নামিয়ে দেয়াই ভাল ছিলরানা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, টিকেট চেকার এলে কী বলব বুঝতে পারছি নাদুজন যাচ্ছে উইদাউট টিকেটতুই আর জরীএকজনেরটা হলে সামাল দেয়া যেতদুজনেরটা কীভাবে সামলাব ? জরী আপার টিকেট নেই

ওর টিকেট থাকবে কেন? ওর কি যাওয়ার কথা ? ওকে স্টেশনে দেখে তাে আমার আক্কেল গুড়ুমটেনশানে ব্রহ্মতালু শুকিয়ে গেছেঅথচ সবাই নির্বিকারযেন কিছুই হয়নিএদের নিয়ে বের হওয়টাই চূড়ান্ত বোকামি হয়েছেভেরি গ্রেট মিসটেকমিসটেক অব দ্য সেনচুরি। 

জরী বসেছে জানালার পাশেসে জানালা দিয়ে মুখ বের করেছেনিজেকে আড়াল করার জন্যে বড় করে ঘোমটাও দিয়েছেতাকে লাগছে নতুন বৌয়ের মতােইআর আসলেই তো সে নতুন বৌআজ তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলসব ঠিকঠাক মতাে হলে এতক্ষণে সে থাকত বাসরঘরে, স্বামীর সঙ্গেস্বামীর অধিকার ফলাবার জন্যে লোকটা হয়ত এতক্ষণ তাকে নিয়ে চটকাচটকি শুরু করত। 

জরী বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছেতার দুহাতে মেহেদির সুন্দর ডিজাইনগায়ের শাড়িটি লাল বেনারসীগয়না যা ছিল সে খুলে হাতব্যাগে রেখেছেশাড়ি বদলানাে হয়নিআনুশকার একটা শাড়ি নিয়ে ট্রেনের বাথরুমে গিয়ে বদলে এলে হয়ইচ্ছা করছে নাবেনারসী পরে ট্রেনের জানলায় মাথা রেখে চুপচাপ বসেথাকতে ভাল লাগছেঅনেক দিন পর নিজেকে মুক্ত লাগছে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৪

জরী তার বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞ বােধ করছেতার বন্ধুরা কেউ এখনো জিজ্ঞেস করেনি, কেন জরী বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে এলসবাই এমন ভাব করছে যেন এটাই স্বাভাবিকএখানে জিজ্ঞেস করার কিছু নেইজরী ঠিক করেছে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না, সে নিজ থেকেই বলবেকিছুই সে গোপন করবে না, কারণ তারা যাচ্ছে দারুচিনি দ্বীপতারা ঠিক করে রেখেছে, দারুচিনি দ্বীপে তাদের মধ্যে কোনাে আড়াল থাকবে নাতারা তাদের মধ্যকার সব ক্ষুদ্রতাতুচ্ছতা দূর করবে

জরীর পাশে বেশ কিছু খালি জায়গামনে হচ্ছে, ইচ্ছে করেই সবাই মিলে জরীকে আলাদা থাকতে দিচ্ছেসবচেভাল হত সে যদি অন্য কোনাে কামরায় খানিকক্ষণ বসে থাকতে পারততা সম্ভব নাবিয়ের সাজে সাজা একটি মেয়ে কোনাে এক কামরায় সঙ্গীহীন একা বসে আছে, এই দৃশ্য কেউ সহজভাবে নিতে পারবে না, বরং এইভালসে আছে বন্ধুদের মাঝেবন্ধুরা তাকে আলাদা থাকতে দিচ্ছেকেউ তার দিকে তাকাচ্ছেও নাএখন তারা চা খাচ্ছেট্রেনের বুফে কারের কুৎসিত চাকিছুক্ষণ পরপর তাই খাওয়া হচ্ছেমহানন্দে খাওয়া হচ্ছেসেই খাওয়ারও একেক সময় একেক কায়দা, এখন খাওয়া হচ্ছে পিরিচেদশজন 

ছেলেমেয়ে পিরিচে ঢেলে শব্দ করে চা খাচ্ছেমােটামুটি অদ্ভুত দৃশ্যকামরার অন্য যাত্রীরা কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছেকেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে নাকুড়িএকুশবছরের একদল ছেলেমেয়েকে সবসময়ই বিপজ্জনক ধরা হয়এদের কেউ ঘটাতে চায় নাযাত্রীদের মধ্যে একজনের কৌতুহল প্রবল হওয়ায় সে বিপজ্জনক কাজটি করে ফেলল। মােতালেবকে বলল, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৪

মােতালেব তৎক্ষণাৎ অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলল, আপনি অত্যন্ত জটিল প্রশ্নকরেছেনমানব সম্প্রদায় কোথায় যাচ্ছে তা সে জানে নাজানলে মানব সম্প্রদায়ের আজ এই দুর্গতি হত না। 

যাত্রীদের বেশির ভাগই হাসছেশুধু প্রশ্নকর্তা এবং মােতালের এই দুজন গম্ভীর মুখে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছেমােতালেবের অনেক দায়িত্বের একটা হচ্ছে পুরাে দলটাকে হাসাতে হাসতে নিয়ে যাওয়াসে এই দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করছে

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *