রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৮)

এরা আমাদের দুজনকে আশা করে পাঠিয়েছে। এর নাম শুভ্র। অতি ভাল ছেলে। শুভ্রর প্রেস্টিজের একটা ব্যাপারও আছে। চা নিয়ে যেতে না পারলে মেয়েগুলির সামনে শুভ্রর মান থাকবে না। 

রূপালী দ্বীপএক কথা কয়বার বলব? আপনারা কেন বিরক্ত করছেন? তা হলে কি এদের নিয়ে উঠে চলে যাব ?” ‘সেটা আপনার ইচ্ছা। 

ভাইজান, আমরা কিন্তু মানুষ ভাল না। এখন আমরা দুইজন আপনার গায়ে থুথু দেব। থু করে একদলা থুথু ফেলব। 

হতভম্ব ম্যানেজার বলল, কি বললেন ? ‘আপনার গায়ে থুথু ফেলব। ‘ফাজলামি করছেন নাকি?” 

জ্বি না ব্রাদার, ফাজলামি করছি না। শুভ্র, এর গায়ে থুথু ফেল তাে। 

শুভ্র সঙ্গে সঙ্গে থু করে থু থু ফেলল। এবং থুথু ফেলে তার নিজেরই বিস্ময়ের সীমা রইল না। এটা সে কি করল ? কীভাবে করতে পারল ? 

ম্যানেজার লােকটা কী অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে! শুভ্র করুণ চোখে তাকাল মােতালেবের দিকে। | মােতালেব সহজ গলায় বলল, এখন আমরা যাই। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে যাই। আরাে পনেরাে মিনিট অপেক্ষা করব। পনেরাে মিনিটের মধ্যে যদি চা না আসে তা হলে ট্রেনের দরজা খুলে ধাক্কা দিয়ে তােকে নিচে ফেলে দেব। আমার ভাল নাম মােতালেব। বন্ধুরা বলে মোতা মিয়া। একবার এক পাজীর গায়ে পিসাব করে দিয়েছিলাম। সেই থেকে মােতা মিয়া নাম। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৮

মােতালেবরা জরীদের কাছে ফিরে গেল। জ্বরী বলল, চা আসছে? 

মােতালেব বলল, বুঝতে পারছি না। তবে সম্ভাবনা আছে। অষুধ দিয়ে এসেছি। অষুধে কাজ হবে কি না জানি না। হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। আবার উল্টা অ্যাকশানও হতে পারে। 

‘অষুধটা কী? 

‘মাই ডােজের সালফা ড্রাগ দেয়া হয়েছে। সালফা ড্রাগে কাজ না হলে অ্যান্টিবায়ােটিক দেয়া হবে। ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়ােটিক।। 

জরী বলল, শুভ্রর মুখটা এমন মলিন লাগছে কেন? কী হয়েছে শুভ্র ? শুভ্র জবাব দিল না। চোখ নিচে নামিয়ে নিল। লজ্জায় সে মাথা তুলতে পারছে 

আনুশকা বলল, আচ্ছা শুভ্র, এই লাইন দু‘টা কোথায় আছে বলতে পারবে? 

“পায়ে ধরে সাধা 

রা নাহি দেয় রাধা।” শুভ্র ক্ষীণ গলায় বলল, গল্পগুচ্ছে আছে।। ‘গল্পের নাম কী ? ‘গুপ্তধন। 

Thank you learned কানাবাবা। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। 

প্রশংসাবাক্যেও শুভ্রের কিছু হল না। তার মুখ মলিন হয়েই রইল। তার শুধু মনে * হচ্ছে, যদি কোনােদিন মা এই ঘটনা জানতে পারেন তার কেমন লাগবে? মা 

অবশ্যই জানতে চাইবেন সে কেমন করে এই কাজটা সে করল? তখন সে কী বলবে? কিংবা মা হয়তাে কিছুই জানতে চাইবেন না। শুধু শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকবেন। সে তাে আরাে ভয়াবহ। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৮

শুভ্রর মা রাহেলার ব্লাডপ্রেশার হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে দাঁত মাজছিলেন, হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠল। তিনি দেয়াল ধরে টাল সামলালেন। এরকম অবস্থায় কোথাও বসে যাওয়া উচিত। আশেপাশে বসার কিছু নেই। বসতে হলে মেঝেতে বসতে হয়। রাহেলা ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, মধুর মা, মধুর মা ! 

মধুর মা একতলায় ছিল। রাহেলার গলার স্বর এতদুর পৌছানাের কথা না, কিন্তু মধুর মার কান খুব পরিষ্কার। সে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল। রাহেলা প্রায় ফিসফিস করে বললেন, বেতের চেয়ারটা এনে দাও। বসব। আমার মাথা ঘুরছে। 

মধুর মা বেতের চেয়ার এনে দিল। বরফ মিশিয়ে আমাকে ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দাও।” শরীর বেশি খারাপ আম্মা? ডাক্তার খবর দিব।?” ‘ডাক্তার লাগবে না। শুভ্রের ঘরে বাতি জ্বলছে কেন? বাতি জ্বালাল কে? যাও, বাতি নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে আসাে। পানি পরে আনবে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৮

দরজায় তালা দিমু আম্মা?” ‘হঁ্যা, তালা দাও। | মধুর মা শুভ্রের ঘরে ঢুকল। রাহেলা অস্বস্তি বােধ করতে লাগলেন। শুভ্রের ঘরে কেউ ঢুকলে তার ভাল লাগে না। শুভ্র বাড়ি ছেড়ে গেছে তিন ঘণ্টাও হয়নি। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল পার হয়ে গেছে। এই প্রথম শুভ্রের বাড়ি ছেড়ে বাইরে। যাওয়া। শুভ্র আর দশটা ছেলের মতো হলে তিনি এতটা বিচলিত হতেন না।

সে আর দশটা ছেলের মতাে নয়। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললে সে কিছুই দেখে না। একজনকে সারাক্ষণ তার চশমা খুঁজে দিতে হয়। তার ওপর শুভ্রের চশমা–ভাঙা রােগ আছে। অকারণে হোঁচট খেয়ে পড়ে চশমা ভেঙে ফেলবে। তিনি অবশ্যি শুভ্রের ব্যাগে দু’টি বাড়তি চশমা দিয়ে দিয়েছেন। প্রয়ােজনের সময় সেই চশমা দুটি শুভ্র কি খুঁজে পাবে? 

মধুর মা গ্লাসে করে হিমশীতল পানি নিয়ে এল।

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *