আনুশকা মােটেই চমকাল না। সে এত স্বাভাবিকভাবে তার ব্যাগ ঠিক করছে যে রানা মুগ্ধ হয়ে গেল। একেই বােধহয় বলে ইস্পাতের নার্ভ। এই নার্ভ কতক্ষণ ঠিক থাকে তা দেখার ব্যাপার।
বেশি টেনশানে ইস্পাতের নার্ভেরও ছিড়ে যাবার কথা। আনুশকার নার্ভ কখন ছিড়বে ? রানা সেই দৃশ্য দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছে না। তার বাথরুমে না গেলেই নয়। সে বাথরুমের সন্ধানে রওনা হল।
পুলিশ অফিসার বললেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে থানায় যাবেন ? আনুশকা বলল, হ্যা, যাৰ।
‘তা হলে চলুন।
এখন তাে যেতে পারব না। হাত–মুখ পােব, চা খাব, তারপর যাব। আপনারা এতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?‘
‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
শুভ্র এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। সে অবাক হয়ে বলল, কথাবার্তা কী হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
পুলিশ অফিসার বললেন, থানায় চলুন। থানায় যাওয়ামাত্রই সব জলের মতাে পরিষ্কার বুঝে যাবেন। পুলিশের অনেক কথাই বাইরে অর্থহীন মনে হয়। থানা হাজতে ঢােকার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শব্দের অর্থ পরিষ্কার হয়ে যায়।
থানায় যেতে হবে কেন?” ‘সেটাও থানায় গেলেই জানতে পারবেন।
এতক্ষণে গাড়ি থেকে সবাই নেমে এসেছে। পুলিশের কথাবার্তা যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে শুনে যাচ্ছে। জরীর চোখে–মুখে হতভম্ব ভাব। রান তা হলে ভুল বলেনি। সমস্যা কিছু একটা হয়েছে। জরী বলল, ব্যাপার কী রে আনুশকা? উনি আমাদের থানায় যেতে বলছেন কেন?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮
আনুশকা সহজ গলায় বলল, ওনার ধারণা, আমরা মনিরুজ্জামান নামের এক ভদ্রলােকের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছি। এই জন্যেই আমাদের থানায় যেতে বলছেন।
জরী আগের চেয়েও অবাক গলায় বলল, মনিরুজ্জামানের স্ত্রীটি কে? | ‘মনে হচ্ছে তুই। যে বদমাশটার সঙ্গে তাের বিয়ে হবার কথা ছিল ওর নামই তাে মনিরুজ্জামান, তাই না?
জরীর মুখে কোনাে কথা ফুটল না। সে বড়ই অবাক হয়েছে। আনুশকা বলল, তােরা সবাই হাত–মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নে। আমরা থানায় যাচ্ছি। চা ওখানেই খাব।
নীরা ভীত গলায় বলল, এসব কী হচ্ছে? শুধু শুধু থানায় যাব কেন? পুলিশ অফিসার অমায়িক ভঙ্গিতে হাসলেন।।
আনুশকা বলল, আমরা আমাদের মালপত্র কী করব? এখানে রেখে যাব, না সঙ্গে নিয়ে যাব?
‘সেটা আপনাদের ব্যাপার। আপনারা ঠিক করবেন। দেরি করবেন না, চলুন।
আনুশকা উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে বলল, রানা কোথায় গেল? ও হচ্ছে আমাদের টীম লীডার। মালপত্রের ব্যাপারে ওর ডিসিশান লাগবে।
রানা টয়লেট খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিপদের সময় কিছুই পাওয়া যায় না। এ পর্যন্ত দু’জনকে জিজ্ঞেস করল, টয়লেট কোথায়? দু’জনই এমনভাবে তাকাল যেন এই
শব্দটা জীবনে প্রথম শুনছে। টয়লেট শব্দের মানে কী জানে না। স্টেশনের কাউকে ধরা দরকার। এরাও সব উধাও। নইমাকে দেখা যাচ্ছে। বেশ হাসি–হাসি মুখে আসছে। হাতে পত্রিকা। নাইমা বলল, এই রানা, যাচ্ছ কোথায় ?
‘টয়লেট খুঁজছি। টয়লেটটা কোথায় জান? ‘আমি কী করে জানব?
না জানলে বলাে, জানি না। রেগে যাচ্ছ কেন? | ‘মেয়েদের টয়লেট সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করাই অভদ্রতা। এই জন্যে রেগে যাচ্ছি। তােমার কি ইমারজেন্সি?”
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮
হ্যা, ইমারজেন্সি। ‘বড় টয়লেট, না ছােট টয়লেট ?” ‘কী যন্ত্রণা! ছােট। ‘তা হলে কোনাে একটা ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়লেই হয়। ছুটে বেড়াচ্ছ
বিপদের সময় সব এলােমেলাে হয়ে যায়, এটা খুবই সত্যি। সাধারণ ব্যাপারটা তার মাথায় আসেনি কেন? রানা লাফ দিয়ে সামনের একটা ট্রেনের কামরায় উঠে
নইমা অপেক্ষা করছে। রানা নামলে তাকে একটা মজার জিনিস দেখাবে। রানা রাজি থাকলে তাকে নিয়ে আরেক কাপ চা খাবে। ওরা নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ টেনশানে ভূগুক। হু কেয়ারস? | রানা নামতেই নইমা বলল, চাটগার লােকরা ‘ঘুমুচ্ছি‘–কে কী বলে জান? তারা বলে, ‘ঘুম পাড়ি। ঘুম কি ডিম নাকি যে ডিম পাড়ার মত ঘুম পড়বে? হি–হি–হি।
রানা ধমকের সুরে বলল, হাসি বন্ধ করাে। ‘হাসি বন্ধ করব মানে?” ‘কেলেংকেরিয়াস ব্যাপার হয়ে গেছে। পুলিশ আমাদের অ্যারেস্ট করেছে। ‘তুমি এত ফালতু কথা বল কেন? ‘মােটেও ফালতু কথা বলছি না। অবস্থা সিরিয়াস। উই আর আন্ডার অ্যারেস্ট। ‘আমরা কী করেছি? ডাকাতি করেছি?
‘তােমরা ডাকাতির চেয়েও বড় জিনিস করেছ। অন্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছ।
‘রানা, তােমার ব্রেইনের নাট–বল্ট সব খুলে পড়ে গেছে। তুমি ঢাকায় গিয়েই ধােলাইখালে চলে যাবে। নাট বন্টু লাগিয়ে নেবে। তােমার যা সাইজ, রেডিমেড পাওয়া যাবে না। লেদ মেশিনে বানাতে হবে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮
রানা আগুন–চোখে তাকাল। সে ভেবে পাচ্ছে না পুরুষ এবং মেয়ের মস্তিষ্কের। ঘিলুর পরিমাণ সমান হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা পৃথিবীর কিছুই বােঝে না কেন?
যে বাস ওদের টেকনাফ নিয়ে যাবে বলে এসেছে সেই বাসে করেই ওরা থানায় যাচ্ছে। পুলিশের দু‘জন লোক বাসে আছে। একজন বসেছে ড্রাইভারের পাশে, অন্যজন আনুশকাদের সঙ্গে। নইমা সেই পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে করুণ। গলায় বলল, আচ্ছ, চিটাগাং–এর লোকরা ‘ঘুমাচ্ছি না বলে ঘুম পাড়ি’ বলে কেন? ঘুম কি ডিম যা পাড়তে হয় ? সবাই হাে হো করে হাসছে। পুলিশ অফিসারটি হাসছে না।
সে তাকিয়ে আছে শুভ্রের দিকে। শুভ্র বলল, আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন?
‘হ্যা, বলব। আপনার নাম শুভ্র ?”
‘আপনার বিরুদ্ধে আলাদা স্পেসিফিক অভিযােগ আছে। গুণ্ডামির অভিযােগ। আপনি রশীদউদ্দিন ভূঁইয়া নামে বুফে কারের কেয়ারটেকারকে মারধাের করেছেন। চাকু দিয়ে ভয় দেখিয়েছেন এবং এক পর্যায়ে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ঠেলে নিচে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছেন।‘
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮
শুভ্র শুধু একবার বলল – আমি?
বলেই সে চুপ করে গেল। অন্য সবাই চুপ। শুধু নইমা এখনাে হেসে যাচ্ছে। চিটাগাং–এর লােকেরা ঘুমিয়ে পড়াকে কেন ‘ঘুম পাড়ি’ বলে – এটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না।
অয়ন বাসের বড় ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুনার পাশে খালি জায়গা আছে । সে যেখানে দাড়িয়ে সেখান থেকে মুনার পাশের জায়গাটাই সবচে‘ কাছে। কাজেই অয়ন যদি সেখানে গিয়ে বসে কেউ অন্য কিছু মনে করবে না। সে ঠিক ভরসাও পাচ্ছে না। মুনা যদি ফট করে কিছু বলে বসে।
রানা বলল, তুই হাঁদার মত দাড়িয়ে আছিস কেন? বসাে না।
অয়ন মুনার পাশে বসতে গেল। মুনা বলল – আপনার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছে। অন্য কোথাও গিয়ে বসুন।
অয়ন আগের জায়গায় ফিরে গেল।
ওসি সাহেব তাদের থানার লকআপে ঢুকিয়ে দিলেন। ছেলে এবং মেয়েরা আলাদা হয়ে গেল। এই ওসি সাহেবকে স্টেশনে দেখা যায়নি। তিনি স্টেশনে যাননি। ভদ্রলােকের বয়স বেশি না। ভদ্র চেহারা। পুলিশের ভদ্র চেহারা হলে অস্বস্তি লাগে। মনে হয় কিছু একটা ঝামেলা আছে। তা ছাড়া ভদ্রলােক পাঞ্জাবি পরে আছেন। পুলিশের লােক থানার ভেতরে পাঞ্জাবী পরবেন কেন? জেনানা ওয়ার্ডে এক অল্পবয়স্ক পাগলীকে রাখা হয়েছে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮
সে বমি করে পুরোটা ভাসিয়ে ফেলেছে। সে শুধু বমি করেই ক্ষান্ত হয়নি – মনের আনন্দে নিজের বমিতে গড়াগড়ি করছে। ভয়ংকর গন্ধ। কোনো স্বাভাবিক মানুষ এর মধ্যে থাকতে পারে না। প্রথমে নইমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ফিসফিস করে বলল, এখানে এক ঘণ্টা থাকলে আমি মরে যাব। আমি সত্যি মরে যাব। কেন আমি তােদের সঙ্গে এলাম ! কেন এলাম? কেন এলাম? নইমার হিস্টিরিয়ার মতো হয়ে গোল।
আনুশকা বলল, ন্যাকামি করবি না। এখন ন্যাকামির সময় না। ‘আমি ন্যাকামি করছি ? আমি করছি ন্যাকামি ? আমি ন্যাকামি করছি ?” “চুপ কর। এক কথা বারবার বলবি না।’
(চলবে)
Read more