সেন্ট্রি গভীর মনযােগে দাঁত খোচাচ্ছে। দাত খোচানো শেষ হলে নিশ্চয়ই কান। খোচাবে। খোঁচাখুঁচি যাদের স্বভাব তারা স্থির থাকতে পারে না। তাদের সবসময় কিছু না কিছু খোচাতে হয়।
রানা আবার করুণ গলায় ডাকল – পুলিশ সাহেব ! ব্রাদার। একটু শুনবেন?
মনিরুজ্জামান ওসি সাহেবের সামনে বসে আছে। মনিরুজ্জামানের গায়ে থ্রী পিস স্যুট, লাল টাই। কোটের বাটন হােলে পাতাসহ গোলাপের কুঁড়ি। গোলাপটা ঠিক আছে – পাতা দুটি মরে গেছে। মনিরুজ্জামানের মুখে তেলতেলে ভাব হাসি। সে আজ সারা দিনে প্রচুর পান খেয়েছে বলে মনে হয়। দাত খয়েরি বর্ণ ধারণ করেছে। ঠোট দুটিও লাল। মনিরুজ্জামানের হাতে সাদা রুমাল। কিছুক্ষণ পরপর ঠোট মােছার জন্যে রুমাল ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মনিরুজ্জামানের পাশে আছে হারুনুর রশীদ। হারুনুর রশীদের কাজ হচ্ছে মনিরুজ্জামানকে ছায়ার মতাে অনুসরণ করা। হারুনুর রশীদ পাতলা একটা পাঞ্জাবি পরে আছে। নিচে গেঞ্জি নেই বলে পাঞ্জাবির ভেতর দিয়ে তার লোমভর্তি বুক দেখা যাচ্ছে। হারুনুর রশীদের মুখ খুব গম্ভীর। সেই তুলনায় মনিরুজ্জামানের মুখ হাসি হাসি।
মনিরুজ্জামান বলল, তারপর ওসি সাহেব, ভাই, কেমন আছেন বলেন দেখি। ‘জ্বি, ভাল আছি।
‘সকালে চলে আসতাম – ফাস্ট ফ্লাইট পেলাম না। গাড়িতে রওনা হলে পেছতে পৌছতে বিকাল হবে। সেকেড ফ্লাইটে এসেছি।
‘ভাল করেছেন।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১
‘আমি এসেই আপনার বিষয়ে খোঁজখবর করেছি। খবর যা পেয়েছি তাতে মনটা ভাল হয়েছে। আমি হারুনুর রশীদকে বললাম, এরকম অফিসার যদি দশটা থাকে, তাহলে দেশ ঠিক হয়ে যায়। কী হারুন, বলি নাই?”
হারুন হঁ–সূচক মাথা নাড়ে। মনে হচ্ছে সে কথা কম বলে। কিংবা মাথা নাড়াই তার চাকরি।
‘দেশের আজ যে অবস্থা তা কিন্তু দেশের জনগণের জন্যে না। খারাপ অফিসারের জন্যে। জনগণ কখনো ভুল করে না।
আপনি আমার বিষয়ে কী খােজ পেয়েছেন?” ‘সব খোজই পেয়েছি ভাই। প্রদীপ জ্বলে উঠলে দূর থেকে টের পাওয়া যায় – আলো দেখা যায়। বুঝলেন রহমান সাহেব, আমি খবর পেয়েছি, আপনি অত্যন্ত
অনেস্ট অফিসার। ঘুষ খান না। অন্যায় করেন না। ঠিক শুনি নাই রহমান সাহেব ?”
‘জ্বি, ঠিকই শুনেছেন। ‘আপনার নাম রহমান তাে ? ‘আব্দুর রহমান আমার নাম।
‘এতবড় একটা কাজ যে আপনি করলেন, অনেস্ট অফিসার বলেই করতে পারলেন। ঘুষ–খায় অফিসারের আত্মা থাকে ছোট – সাহস থাকে না। কী হারুন, আমি এই কথা বলি নাই ?”
হারুন আবার ই–সূচক ঘাড় নাড়ল।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১
মনিরুজ্জামান গলা নিচু করে বলল, এত বড় একটা কাজ সুন্দরভাবে করার জন্যে আমি ছোটভাই হিসাবে আপনাকে সামান্য উপহার দিতে চাই। না করবেন না। না করলে মনে ব্যথা পাব।
মনিরুজ্জামান হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। হারুনুর রশীদ ব্রীফকেস খুলে ব্রাউন পেপারের একটা মােটা মোড়ক ওসি সাহেবের ফাইলের কাছে রেখে ভারী গলায় বলল – ফিফটি আছে।
ওসি সাহেব বললেন, ফিফটি কি ? ‘ফিফটি থাইজেন্ড স্যার।
মনিরুজ্জামান বলল, উপহার কী কিনব, কী আপনার পছন্দ, তা তাে জানি না। এই জন্যেই ক্যাশ। পছন্দমত একটা–কিছু কিনে নেবেন ভাই সাহেব। ছােট ভাইয়ের উপর মনে কিছু নিবেন না।
“আচ্ছা।
“বুঝলেন ভাই সাহেব, খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। আপনি রাগই করেন কি না। উপহার এক জিনিস আর ঘুষ ভিন্ন জিনিস।
‘তা তাে বটেই। ‘এখন ভাই সাহেব, মেয়েটাকে বের করে দেন – ঢাকায় নিয়ে যাই। ‘মেয়েটাকে বলছেন কেন? বলুন স্ত্রীকে বের করে দিন। ‘ও হা হা। অল্পদিন হয়েছে বিয়ে, এখনো অভ্যস্ত হইনি। যাই হােক, আমি স্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার স্ত্রীর যে বড় চাচা উনিও আসছেন। বাই রােডে আসছেন।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১
ওসি সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ব্যাপারটা আপনি যত সহজ ভাবছেন তত সহজ না। সামান্য জটিলতা আছে।
কী জটিলতা ? মনিরুজ্জামান চোখ সরু করে বলল। ‘আপনার স্ত্রী জবানবন্দি দিয়েছেন, আপনার সঙ্গে বিয়ে হয়নি। যে রাতে বিয়ে
হবার কথা সেই রাতে উনি পালিয়ে গেছেন। | ও বললে তো হবে না। ও তাে এখন এরকম বলবেই। আরাে যে জঘন্য কিছু বলে নাই সেটাই আমার সৌভাগ্য। বিয়ে যে হয়েছে তার কাগজপত্র আছে। দেখতে পারেন। হারুন, কাবিননামাটা দেখাও তাে।
হারুন ব্রীফকেস খুলে কাবিননামা বের করল। | মনিরুজ্জামান বলল, খুব ভাল করে দেখেন। আমার স্ত্রীর দস্তখত আছে। দেখতে পচ্ছেন?
‘চারজন সাক্ষি আছে। সাক্ষি কারা এইটাও একটু লক্ষ করুন। আপনারা পুলিশের লােক, কিছুই আপনাদের চোখ এড়াবে না। তবু মনে করিয়ে দেয়া। একজন আছেন মিনিস্টার, প্রতিমন্ত্রী না, আসল মন্ত্রী। একজন আর্মির ব্রিগেডিয়ার, একজন হচ্ছেন ইউনিভার্সিটির ফুল প্রফেসর। আরেক জন বিশিষ্ট শিল্পপতি এ আর খান। নাম শুনেছেন আশা করি।
‘বলেন কী! এঁরা সবাই কি আপনার আত্মীয়? ‘জ্বি না। তবে পরিচিত।
সাধারণত দেখা যায়, বিয়েতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা সাক্ষি হয়। আপনার বেলাতেই ব্যতিক্রম দেখলাম।
‘আমার সবই ব্যতিক্রম। দেখলেন না – বৌকে বিয়ের পরেই ভাগিয়ে নিয়ে চলে চেলি। তবে হজম করতে পারে নাই – বদহজম হয়ে গেছে। হা–হা–হা।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১
আপনাকে খুব আনন্দিত মনে হচ্ছে। ‘অবশ্যই আনন্দিত। আম ছালা সব ধরা পড়ে গেছে। সাথের বদগুলােকে মাইল্ড পিটন দিয়েছেন তাে?
‘জ্বি না, দেই নাই। ভদ্রলােকের ছেলেপুলে, পিটন দিয়ে শেষে কোন বিপদে পড়ি !’
কোনাে বিপদে পড়বেন না। আমি তাে আছি আপনার পিছনে। আমি মানুষটা ছােটখাট কিন্তু আল্লাহর দয়ায় আমার যোগাযােগ ভাল।
‘সেটা বুঝতে পারছি।
‘অনেকেই বুঝতে পারে না। প্রয়ােজন বােধ করলে হেভি পিটন দিয়ে দেন। এদের চুরির মামলায় ফেলে নাকানি–চুবানি খাওয়ানো যায় ন? আমার স্ত্রীর গায়ে চার লাখ টাকার জড়োয়া গয়না ছিল এই মামলা ... ধান দেখেছে, বুলবুলি দেখে নই। এইবার বুলবুলি দেখবে। ছােট্ট বুলবুলি।
হারুনর রশীদ বলল, স্যার, আপনি কাইন্ডলি বেগম সাহেবকে রিলিজ করে
দেন। আমরা ঢাকার দিকে রওনা হয়ে যাই। বেলাবেলি পৌছতে হবে। | ‘এত সহজে তাে ভাই হবে না। মামলা করেছেন, আমরা আসামী কোর্টে চালান। দেব। কোট যা করার করবে।
সে কী ? ‘আপনি মামলা করেছেন ঢাকায় – আমরা আসামী ঢাকা পাঠাব।‘
‘তা হলে এত যন্ত্রণার প্রয়ােজন নাই। মামলা তুলে নিব। আপনি আমার স্ত্রীকে শুধু রিলিজ করে দিন।
‘সেটাও সম্ভব না। একটা বেড়াছেড়া লেগে যাবে বলে মনে হয়। “কী বেড়াছেড়া ?” ‘যাদের থানা হাজতে আটকে রেখেছি তারা এত সহজে ছেড়ে দেবে তা মনে হয়।
‘যারা আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে ওদের উপর আমার কোনাে রাগ নাই। ছেলেমানুষ ভুল করেছে। মানুষমাত্রই ভুল করে। তা ছাড়া সমস্যাটা মূলত তৈরি। করেছে আমার স্ত্রী। কাজেই শাস্তি যা দেবার আমি আমার স্ত্রীকেই দেব। আপনি। ওদের ছেড়ে দিন। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাই।
(চলবে)
Read more