রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২২)

আপনি বিকেলে আসুনবিকেলে আসব কেন?আমি আসতে বলছি এইজন্যে আসবেনওসি সাহেব, আপনি তাে ঝামেলা করছেনআমি ঝামেলা পছন্দ করি না

রূপালী দ্বীপ ঝামেলা আমিও পছন্দ করি নামহিলাকে আমি ছেড়ে দিলাম, আপনিও গাড়িতে করে জোর করে নিয়ে গেলেন, পরে দেখা গেলাে আসলেই আপনাদের বিয়ে হয়নি। 

কাগজপত্র দেখালাম না ? কাগজপত্রের দাম নাই। 

মনিরুজ্জামান হতভম্ব হয়ে বলল, কাগজপত্রের দাম নাই কী বলেন আপনি! | মনিরুজ্জামান সাহেব, পুলিশে কাজ করছি দশ বছর ধরে এই দশ বছরে একটা জিনিস শিখেছি মানুষের চেয়ে বেশি মিথ্যা বলে কাগজ। 

সিগনেচার আপনি বিশ্বাস করেন না?ছি না‘ 

আমি কিন্তু জানি কী করে বিশ্বাস করাতে হয়বিশ্বাস করাবার মতাে ব্যবস্থা নিয়ে আসব। 

আসুনবিশ্বাস করাতে পারলে আমি ওনাকে ছেড়ে দেবআপনি নিয়ে চলে যাবেন | শাস্তি দিতে চাইলে দেবেনপথেই কোথাও গলা টিপে মেরে ফেলতে পারেনআপনার সমস্যা হবে নাডাক্তাররা পােস্টমর্টেম রিপাের্ট আপনার কথামত দেবেপুলিশও ফাইন্যাল রিপাের্ট যা চাইবেন তাই দেবে। 

শুধু আপনি দিবেন না ?জ্বি না।” কেন দিবেন না

কারণ আমি মানুষটা খারাপআমি ঠিক এক ঘণ্টা পরে আসব। 

এক ঘণ্টা পরে এলে হবে নাআপনাকে বিকেলে আসতে বলেছি আপনি বিকেলে আসবেন। 

হাতি ঘােড়া গেল তল, চার পয়সার ওসি বলে কত জল?” 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২

ওসি সাহেব হাই তুললেনমনিরুজ্জামান বলল, মেয়েটা কোথায়? আমি মেয়েটার সঙ্গে কথা বলবনাকি আমাকে কথাও বলতে দেবেন না

দেবকথা বলতে দেব‘ 

মনিরুজ্জামান হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। 

হারুনুর রশীদ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্রাউন পেপারের প্যাকেট হাতে নিয়ে ঝট করে ব্রীফকেসে ভরে ফেললকাজটা সে করল দেখার মতো দ্রুততায়। 

পাগলী নতুন শাড়ি পরেছেমাথায় চুল আঁচড়েছেতাকে আর চেনা যাচ্ছে নাসে নিজেও মনে হয় হকচকিয়ে গেছেচুপচাপ বসে আছে, কোনােরকম হৈচৈ করছে 

কিছুক্ষণ পরপর নিজের দুটা হাত তার চোখের সামনে ধরে গভীর মনােযােগের সঙ্গে কী যেন দেখছেজরী বলল, তুমি কী দেখ

পাগলী হাসলনাম কী তােমার

পাগলী জবাব দিল না‘তােমার কি শাড়িটা পছন্দ হয়েছে

পাগলী হাসূচক মাথা নাড়ল এবং আবারও তার দুটা হাত চোখের সামনে মেলে ধরল। 

মুনা বলল, জরী আপা, মেয়েটাকে কী সুন্দর লাগছে দেখছেন? , দেখছি। 

এত সুন্দর একটা মেয়ে পথে পথে ঘােরে! আশ্চর্য

নইমা শুয়ে আছেকম্বল বিছানাে হয়েছেকম্বলের উপর ফুলতােলা নতুন চাদরনতুন বালিশসবই কিনে আনানাে হয়েছেনইমা বালিশে মাথা রেখেই ঘুমুচ্ছেতার জ্বর এসেছেমুনা বসে আছে নইমার মাথার কাছে। 

আনুশকা বলল, ওর জ্বর কি বেশি মুনা

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২

সমস্যা হয়ে গেল তাে

আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না আপা কোনাে সমস্যা আছেশান্তমুখে বসে আছেন” 

আনুশকা হাসলমুনা বলল, আপা, আমাদেরকে কি ওরা এখানে রাতেও আটকে রাখবে

না, ছেড়ে দেবেসন্ধ্যার আগেই ছেড়ে দেবে” 

কীভাবে বলছেন?” 

আমাদের সঙ্গে শুভ্র আছে না? শুভ্রর কোনাে সমস্যা তার বাবামা হতে দেবেন না। 

ওনারা তাে আর জানেন না এখানে কী হচ্ছে” 

ইতিমধ্যে জেনে গেছেন বলে আমার ধারণাতারা তাদের ছেলের উপর লক্ষ রাখবেন না, তা হয় না। 

আনুশকার কথার মাঝখানেই মনিরুজ্জামান এসে দাড়ালজরী হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছেভূত দেখলেও কেউ এত চমকায় না। 

মনিরুজ্জামান বলল, খেল তাে ভাল দেখালেযাই হােক, এখন সমস্ত খেলার অবসান হয়েছেবিকেলে তােমাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হব। 

আমাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হবেন মানে? আমি আপনার সঙ্গে ঢাকা যাব 

কেন?” 

স্বামীর সঙ্গে কোথাও যাবে না, এটা কেমন কথা? আপনি আমার স্বামী ? অবশ্যইবিয়ের কাবিননামাও নিয়ে এসেছিওসি সাহেবকে দেখালামবিয়ের কাবিননামা ?” 

এক লাখ এক টাকা কাবিনের কাবিননামাবিকেলের মধ্যে তােমার বড় চাচাও চলে আসবেন। 

জরীর মুখে কথা আটকে গেলকীএকটা কথা অনেক বার বলতে গিয়েও বলতে পারল না। 

মনিরুজ্জামান হৃষ্ট গলায় বলল, আচ্ছা যাই দেখা হবে বিকেলে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২

জরী তাকাল আনুশকার দিকেআনুশকা হাসছেআনুশকার হাসি দেখে পাগলীও হাসতে লাগলএতে নইমার ঘুম ভেঙে গেলােসে উঠে বসল এবং আনন্দিত গলায় বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে? | মনিরুজ্জামান আর দাঁড়াল নাতার অনেক কাজ বাকি আছেকাজ শেষে করতে হবেনষ্ট করার মতো সময় হাতে নেইওসির ক্রু টাইট দিতে হবে, তবে যাবার আগে দলের ছেলেগুলিকে দেখে যাওয়া দরকার। 

রানা দেখল, থ্রী পিস স্যুটপরা এক ভদ্রলোক আসছেনসে উৎসাহের সঙ্গে উঠে বসলমনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কেউ আসছেতাদের মুক্তির ব্যবস্থা হচ্ছেরানাই আগ বাড়িয়ে বলল, স্নামালিকুম। 

মনিরুজ্জামান বলল, ওয়ালাইকুম সালামআপনারা ভাল ? জি স্যার, আছি মােটামুটিকষ্ট হয়নি তাে?” 

মােতালেব বলল, কোনাে কষ্ট হয়নিঅত্যন্ত আনন্দে সময় কাটছেসময় কি ব্যাপার আগে জানতাম নাএখন জানিআরো বৎসরখানেক এখানে থাকতে পারলে সায়েন্সের অনেক কিছু শিখতামআপনাকে তাে ভাই চিনতে পারছি না আপনার পরিচয়

আমার নাম মনিরুজ্জামানআমি জরীর হাসবেকার হাসবেন্ড

জরীরআমি তাকে নিতে এসেছিবিকেলে ওকে নিয়ে চলে যাবআপনারা যেখানে যাচ্ছেন চলে যানআপনাদের উপর আমার কোনাে রাগ নেইআপনাদের একটু সমস্যা হল তার জন্যে আমার স্ত্রীর হয়ে আমি আপনাদরে কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২

রানা বলল, কী বললেন? আপনি কে? জরীর হাসবেন্ডশুভ্র বিস্মিত হয়ে বলল, জরী তাে বিয়ে করেনি । 

মনিরুজ্জামান হাসিমুখে বলল, আপনাদের তাই বুঝিয়েছে, ঘটনা ভিন্নবিয়ে হয়েছে, কাবিন হয়েছেএক লক্ষ এক টাকা মােহরানাযাই, কেমন? খােদা হাফেজ। 

মনিরুজ্জামান হনহন করে এগুচ্ছে! তার পেছনে হারুনুর রশীদহারুনুর রশীদ যে এতটা লম্বা তা আগে বােঝা যায়নিএখন বােঝা যাচ্ছেতাকে দেখে মনে 

হচ্ছে, একটা তালগাছ ব্রীফকেস হাতে কুঁজো হয়ে দাড়িয়ে আছে| দলের সবাই খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলসঞ্জু বলল, অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে 

শুভ্র, তুই কি একটা কাজ করবি

কী কাজ

তুই তাের বাবাকে টেলিফোন করে ঘটনাটা বলবি? জরীকে একটা লােক জোর করে ধরে নিয়ে চলে যাবে আর আমরা যাব দারুচিনি দ্বীপে! তা কী করে হয়

শুভ্র চুপ করে আছেসঞ্জু বলল, কথা বলছিস না কেন ? বাবাকে কী বলব?” 

তাের কিছু বলতে হবে নাতাের বাবাই তাের ভেতর থেকে সব কথা টেনে বের করে নিয়ে আসবেন। 

শুভ্র অস্বস্তির সঙ্গে চুপ করে আছেরানা রাগী ভঙ্গিতে বলল, তুই এমন স্টোনফেস হয়ে গেলি কেন? বাবার সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগছে

শুভ্র বলল, বাবাকে কিছু বলার দরকার নেই‘বলার দরকার নেই কেন?আমার ধারণা বাবা সবই জানেন। 

গাধার মতাে কথা বলবি না শুভতাের বাবা কোনো পীরফকির না যে সব জানেতোকে টেলিফোন করতে বলা হয়েছে, তুই টেলিফোন করবি এবং কাদো কাদো গলায় বলবি, আমাদের রক্ষা করােএস এসবঁাচও বাঁচাও। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২

এরা কি আমাদের টেলিফোন করতে দেবে? এইটা একটা টেকনিক্যাল কথা বলেছিসতােকে টেলিফোন করতে দেবে কি না সেটা হচ্ছে কথাসম্ভবত দেবে না তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে‘ 

বন্টু বলল, প্রয়ােজনে আমি ওসি সাহেবের পা চেপে ধরবঅনেক ধরনের মানুষের পা ধলেছি, পুলিশের পা কখনো ধরিনিপা ধরে সবচেবেশি মজা কখন পেয়েছিলাম জানিস? একবার এর পীর সাহেবের পা ধরেছিলাম কী মােলায়েম পা ! ধরলে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। 

শুভ্র ওসি সাহেবের সামনে বসে আছেওসি সাহেব টেলিফোন সেট তার দিকে বাড়িয়ে বললেন, নিন, টেলিফোন করুন। 

শুভ্র বিব্রত মুখে বলল, আমি নাম্বার ভুলে গেছিনাম্বার ভুলে গেছেন মানে? নিজের বাসার নাম্বার মানে নেই

জ্বি নাবাসায় তাে কখনাে টেলিফোন করা হয় নাতবে আমার হ্যান্ডব্যাগের পকেটে একটা ডায়েরি আছে সেখানে নাম্বার লেখা আছে। 

আচ্ছা, হ্যান্ডব্যাগ আনিয়ে দিচ্ছি। 

শুভ্র ডায়েরির জন্যে অপেক্ষা করছেওসি সাহেব কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে শুভ্রকে দেখছেন

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *