জুবায়ের ঘরে ঢুকেই বলল, কেমন আছেন? ‘ছি ভাল। ‘আমার নাম মােহম্মদ জুবায়ের। আপনার নাম কি জানতে পারি। ‘আমার নাম জুলাই। তিনদিন পর নাম বদল হবার সম্ভাবনা আছে।
বসুন। ‘বসব না – দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি। ‘জিজ্ঞেস করুন। তবে আমার মনে হয় আপনার বেশীর ভাগ প্রশ্নেরই জবাব
দিতে পারব না।
‘জবাব দিতে পারবেন না এমন কোন প্রশ্ন আমি আপনাকে করব না। তবে ইচ্ছা করে জবাব না দিলে তাে কিছুই করার নেই।
‘আমি যা জানি আপনাকে বলব। অবশ্যই বলব। ‘পাগল সাজার চেষ্টা করছেন কেন?
কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। ‘শুনলাম চারঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছেন। আপনার এই কাজের পেছনে পাগল সাজার সূক্ষ্ম চেষ্টা লক্ষ্য করছি। কারণটা জানতে চাচ্ছি।” | মিস্টার জুলাই শান্ত গলায় বলল, আপনি বােধ হয় একটা জিনিস জানেন না – পাগলরা কখনাে বৃষ্টিতে ভিজে না। পানি আর আগুন – এই দুটা জিনিসকে পাগলরা ভয় পায়। এই দুটা জিনিস থেকে এরা অনেক দূরে থাকে। কখনাে শুনবেন না কোন পাগল পানিতে ডুবে মারা গেছে বা আগুনে ঝাপিয়ে পড়েছে। জুবায়ের প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলল, আপনি কি সিগারেট খান?
‘একটা খান আমার সঙ্গে। খেয়ে দেখুন কেমন লাগে। | লােকটা সিগারেট নিল। আগুন ধরিয়ে টানতে লাগল। জুবায়ের বলল, আপনার কয়েকটা জিনিস আমি মিলাতে পারছি না। দুয়ে দুয়ে চার হচ্ছে না। আপনি বলছেন আপনার আগের কথা কিছুই মনে নেই। স্মৃতি–বিলুপ্তি ঘটেছে। অথচ পাগল পানি এবং আগুন ভয় পায় এটা মনে আছে। একটা মনে থাকবে, একটা থাকবে না তা কেমন করে হয়।
লােকটা জবাব দিল না। নিজের মনে সিগারেট টানতে লাগল।
জুবায়ের চলে যাবার আগে এষাকে বলে গেল – সাবধান থাকবে। খুব সাবধান। খুবই সন্দেহজনক ক্যারেকটার। তােমার বাবাকে বলবে – অতি দ্রুত তিনি যেন লােকটাকে ডিসপােজ করার ব্যবস্থা করেন। লােকটার কোন একটা বদ মতলব আছে।
এষা হাসতে হাসতে বলল, তােমার কি ধারণা – কি করবে সে? গভীর রাতে আমাদের খুন করে পালিয়ে যাবে?
“বিচিত্র কিছু না। করতেও তাে পারে।
‘লােকটাকে দেখে খুনী খুনী মনে হয় না। ‘ফর ইওর ইনফরমেশন ইয়াং লেডি – খুনীদের আলাদা কোন চেহারা হয়।
‘ফর ইওর ইনফরমেশন ইয়াং ম্যান – রাত পৌনে বারটা বাজে – তােমার .. এখন চলে যাওয়া উচিত।
‘আমি যাচ্ছি – কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি – বি কেয়ারফুল, নেভার ট্রাস্ট এ স্ট্রেঞ্জার।
সুরমা খেতে বসেছেন। খাবার ঘরে শুধু তিনি এবং মতিন সাহেব। সুরমা খাবার সময় কথাবার্তা বিশেষ বলেন না। কেউ কথা বললে, এমনভাবে তাকান যেন বিরক্ত হচ্ছেন। মতিন সাহেব বললেন, মাথাব্যথা কমেছে?
সুরমা তাঁর দিকে না তাকিয়েই বললেন, না।
‘রােজ রােজ মাথা ধরে এটা তাে ভাল কথা না। একজন ডাক্তার দেখাও। সাধারণত চোখের কোন প্রবলেম হলে মাথা ধরে। তােমার কি চোখের কোন সমস্যা আছে।
‘জানি না, থাকতে পারে।” ‘কাল আমার সঙ্গে চল – আমার চেনা একজন চোখের ডাক্তার আছেন। ‘কাল আসুক তখন দেখা যাবে।
সুরমা উঠে পড়লেন। প্লেটে খাবার পড়ে আছে। অল্প কিছু মুখে দিয়েছেন। তাঁর বমি বমি আসছে। বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললেন, তােমার ঐ লােকের কোন গতি করতে পারলে?
‘না।‘ “সে কি স্থায়ীভাবে এই বাড়িতেই থাকবে? ‘না – তা কেন। কয়েকটা দিন দেখে – বিদেয় করে দেব। ‘মিতু ওর সঙ্গে মাখামখি করে, আমার এটা পছন্দ না। ‘মিতুকে নিষেধ করে দিও।
‘তােমার ছেলেমেয়েরা কেউ আমার কথা শুনে না – ওদের কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। হরিপ্রসন্ন বাবু এসেছেন, জান?”
‘এষা বলেছে। ‘কি জন্যে এসেছেন তা জান?” ‘না।
সুরমা কঠিন মুখে বললেন, কোথাও থাকার জায়গা নেই বলে এসেছেন। তাঁর ধারণা তিনি অল্প কিছুদিন বাঁচবেন। সেই অল্প কিছুদিন – এই বাড়িতে থাকতে চান।
‘তুমি না করে দিয়েছ তাে?”
‘আর্মি না করব কেন? অপ্রিয় কাজগুলি তুমি সব সময় আমাকে দিয়ে করাতে চাও। এটা ঠিক না। তােমার যদি কিছু বলার থাকে তুমি বলবে।
হরিপ্রসন্ন বাবুর সঙ্গে মতিন সাহেবের যােগাযােগের একমাত্র সূত্র হচ্ছে – মতিন সাহেবের বড় মেয়ে নিশা। হরিবাবু নিশাকে কিছুদিন অংক শিখিয়েছেন। নিশার কোন শিক্ষকই বেশীদিন পছন্দ হয় না। তাঁকেও পছন্দ হয় নি। সে দু‘মাস অংক করেই বলল, বাবা উনাকে বদলে দাও।
মতিন সাহেব বলেছিলেন, কেন মা? এত ভাল টিচার ... নিশা ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, উনি কেমন করে জানি তাকান আমার ভাল লাগে । মতিন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কেমন করে তাকান? | ‘আমি তােমাকে বলতে পারব না।
মতিন সাহেবের বিস্ময়ের সীমা রইল না। তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেল। তিনি হরিবাবুকে ছাড়িয়ে দিলেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে হরিবাবু কখনাে কোন বিশেষভাবে নিশার দিকে তাকান নি। তাঁর মুখে মা–জননী ছাড়া অন্য কোন ডাকও ছিল না। ষাট বছর বয়েসী একজন বৃদ্ধ ক্লাস টেনের একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে বিশেষ ভঙ্গিতে তাকানাের প্রশ্নও উঠে না। সেই সময় নিশার ধারণা হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর সব পুরুষই তার দিকে বিশেষভাবে তাকায়। তার সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করে।
হরিবাবু চলে গেলেও তিনি এই বাড়িতে আসা–যাওয়া বন্ধ করেন না। প্রায়ই দেখা যায় বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন। নিশাকে খবর পাঠাতেন। সে ঘাড় বাঁকিয়ে বলতাে – আমি যেতে পারব না। কেন আসে শুধু শুধু। ভদ্রলােককে অনেকক্ষণ একা বসে থাকতে হত। শেষ পর্যন্ত নিশা অবশ্যি আসত। শুধু আসতাে না – হাসি মুখে অনেকক্ষণ গল্প করত।
হরিবাবুর নিকট বা দূর কোন আত্মীয়–স্বজন ছিল না। স্ত্রী মারা গেছেন। যৌবনে বিয়ের এক বছরের মাথায়। দুই ভাই পার হয়ে গেছেন ইন্ডিয়ায়। তিনি বাসাবাে এলাকায় টিনের দু’ কামরার একটা ঘরে কুড়ি বছর একাই কাটিয়ে দিয়েছেন। ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষক ছিলেন। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ভয়াবহ সমস্যায় পড়ে গেলেন। প্রাইভেট স্কুল।
পেনসনের ব্যবস্থা নেই। প্রাভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকাও পুরােটা পেলেন না। যা পেলেন তাও দ্রুত শেষ হয়ে গেল। গৃহশিক্ষকতা করার ক্ষমতা নেই। ছাত্র–ছাত্রী কেউ আসেও না। বয়সের নানান আদি ব্যাধিতে পুরােপুরি কাবু হয়ে গেলেন। একমাত্র কাজ দাঁড়াল পুরানাে ছাত্র–ছাত্রীকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে কিছুদিন করে থাকার ব্যবস্থা করা যায় কি না সেই চেষ্টা করা। বাসাবাের বাড়িটি দুমাস আগে ছেড়ে দিয়েছেন। বাসা ধরে রাখার কোন অর্থও নেই। তাঁর হাত শূন্য। অর্থ এবং বিত্তের মধ্যে আছে তাঁর স্ত্রীর কানের একজোড়া দূল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সে দুলজোড়া তিনি নিজের হাতে স্ত্রীর কান থেকে খুলে রেখেছিলেন।
Read more