যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

যদিও সন্ধ্যা

রেবেকা বলবে, ভালাে। তারপরই শওকত আরাে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলবে, মিস্টার অ্যান্ডারসন কেমন আছেন ? ……….এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রেবেকা একটু হলেও থতমত খাবে আগের স্বামীর মুখে বর্তমান স্বামীবিষয়ক প্রশ্ন কোনাে মেয়েরই সহজভাবে নেবার কথা

সরি, তােমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছিরেবেকা পেছন দিক থেকে কখন ঘরে ঢুকেছে শওকত বুঝতেই পারে নিসে চট করে উঠে দাঁড়ালউঠে দাড়াতে গিয়ে সামনের টেবিলের কোনায় হাঁটুরখোঁচা লাগল পিরিচে রাখা চায়ের কাপটা পিরিচে পড়ে কাত হয়ে পড়ে গেলকাপে চা ছিল নাচা থাকলে চা গড়িয়ে বিশ্রী কাণ্ড হতাে। 

শওকত বলল, কেমন আছ রেবেকা ? রেবেকা বসতে বসতে বলল, ভালাে আছি। ……..শওকতের এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটা করার কথাখুবই আশ্চর্যের ব্যাপার রেবেকার স্বামীর নাম এখন আর মনে পড়ছে নাশওকত নিশ্চয়ই বলতে পারে , রেবেকা, তােমার আমেরিকান স্বামী কেমন আছেন ? শওকতের স্মৃতিশক্তি দুর্বল না, রেবেকার স্বামীর নাম সে জানে নিউজার্সিতে এই ভদ্রলােকের পুরনো বইয়ের একটা দোকান আছেদোকানের নাম All gone! বাংলা করলে হয় সব চলে গেছে

যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

ভদ্রলােক এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসথেটিকস পড়াতেনরেবেকার সঙ্গে সেখানেই তার পরিচয়ছাত্র পড়াতে ভালাে লাগে না বলে তিনি পুরনাে বইয়ের দোকান দিয়েছেনতাঁর এখন সময় কাটছে পুরনাে বই পড়েশওকতের সব কিছু মনে পড়ছেভদ্রলােকের নামটা শুধু মনে পড়ছে নাতার সাময়িক ব্ল্যাক আউট হয়েছে। 

রেবেকা বলল, তােমার কি শরীর খারাপ নাকি ? শওকত বলল, না তাে! রেবেকা বলল, কেমন কপাল টপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছএকটা কথা মনে করার চেষ্টা করছিকিছুতেই মনে পড়ছে না। ..রেবেকা বলল, চেষ্টা বেশি করলে মনে পড়বে নারিলাক্সড থাকমনে পড়বে। 

শওকত এই প্রথম রেবেকার দিকে তাকালযেসব বাঙালি মেয়ে দেশের বাইরে থাকে তাদের চেহারায় আলগা এক ধরনের লালিত্য দেখা যায়গায়েররঙও হয় উজ্জ্বলরেবেকাকে অন্যরকম দেখাচ্ছেমনে হচ্ছে তার বয়স কমে গেছেচেহারায় কেমন যেন বিদেশিনী বিদেশিনী ভাব চলে এসেছেএরকমহয়েছে চুলের কারণেরেবেকার চুল ছিল লম্বা এবং কোকড়ানােকোকড়ানাে। 

ভাব এখন আর নেইচুল কেটে সে ছােটও করেছেতবে এতে তাকে দেখতে খারাপ লাগছে নাবরং আগের চেয়েও সুন্দর লাগছে। 

যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

শওকত বলল, তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছরেবেকা বলল, থ্যাংক য়ুশওকত বলল, মিস্টার অ্যান্ডারসন কেমন আছেন? বলেই সে খুব তৃপ্তি বােধ করলনামটা শেষপর্যন্ত মনে পড়েছে। ..রেবেকা বলল, সে ভালাে আছেএই নামটাই কি তুমি মনে করার চেষ্টা করছিলে

শওকত বলল, হ্যারেবেকা বলল, চা খাবে ? চা একবার খেয়েছি। ……..আরেকবার খাওআমি সকালে কোনাে নাশতা করি নাএক কাপ চা আরেকটা টোস্ট বিস্কিট খাইআজ এখনাে খাওয়া হয় নিতােমার সঙ্গে খাব বলে অপেক্ষা করছিলাম। 

চা দিতে বলােতুমি নাশতা খেয়ে এসেছ ? হ্যাকী নাশতা করলে ? পরােটা আর বুটের ডালরেস্টুরেন্টের রান্না ? হঁ্যাখাওয়াদাওয়া কি সব হােটেল থেকে আসে ? ……একবেলা ঘরে রান্না হয়একবেলাটা কখন ? রাতে। 

কে রাঁধে ? আমি নিজেই রাঁধিভাত ডিম ভাজি ডালসিম্পল ফুডবাসায় কাজের কোনাে লােক নেই ? ……..একজন ছিলমায়ের অসুখ বলে দেশে গিয়েছিল, আর ফেরে নি। 

রেবেকা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি চায়ের কথা বলে আসিচায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবে ? …..তােমাকে অতি ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্ন যে করলাম, তার পেছনে কারণ আছেতােমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার এখন আগ্রহ দেখানাের কিছু নেই

যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

কারণটা কী ? …….আমি দেশে এসেছি পনের দিনের জন্যসঙ্গে করে ইমনকে নিয়ে এসেছিসে তার এবারের জন্মদিন তােমার সঙ্গে করতে চায়আমি ঠিক করেছি চার পাঁচদিন একনাগাড়ে তাকে তােমার সঙ্গে থাকতে দেব । 

আমার কথা কি তার মনে আছে ? …….মনে থাকবে না কেন ? তােমার সঙ্গে যখন আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তখন ইমনের বয়স পাঁচ বছর তিন মাস। চার বছর থেকেই শিশুদের সব স্মৃতি থাকে । 

ইমন কোথায় ? ………..সে তার নানুর কাছে গিয়েছেতার শরীরটা ভালাে নাকী হয়েছে ? জ্বর বমি এইসবদেশের ওয়েদার তাকে স্যুট করছে নাশওকত আগ্রহ নিয়ে বলল, ইমনকে কবে নিয়ে যাব ? রেবেকা বলল, ওর জন্মদিন কবে তােমার কি মনে আছে ? ………..ভুলে গেছিআমারাে তাই ধারণা ওর জন্মদিন এই মাসের নয় তারিখতুমি পাঁচ তারিখ এসে ওকে নিয়ে যাবেতুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি চা নিয়ে আসছি। 

ড্রয়িংরুমে শওকত এখন একাসে আগেও একা বসেছিল, তখন নিজেকে একা একা মনে হয় নিএখন মনে হচ্ছেসবচেবিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে রেবেকা যখন বলল, আমি সঙ্গে করে ইমনকে নিয়ে এসেছি, তখন সে বুঝতেই পারে নি ইমনটা কে? যখন বুঝতে পারল তখন হঠাৎ সব জট পাকিয়ে গেলসে ভুলে গেল এই মাসের নয় তারিখে ইমনের জন্মদিনসে কখনাে এই দিন ভুল করে না

যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

দিন সে একটা সাদা ক্যানভাসে মনের সুখে হলুদ রঙে মাখায় লেমন ইয়েলােকারণ শওকত তার ছেলের নাম রেখেছিল লেমন ইয়েলাে রঙের নামে নামছেলের জন্ম হলাে মিডফোর্ট হাসপাতালেছেলেকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে বলেছিলএকী! এই ছেলে দেখি সন্ধ্যার আকাশের সমস্ত লেমন ইয়েলাে রঙ নিয়ে চলে এসেছেআমি এই ছেলের নাম রাখলাম লেমন ইয়েলাে

লেমন ইয়েলাে দেশে এসেছেসে তার বাবার সঙ্গে কয়েকদিন থাকবে । ……..রেবেকা চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকেছেশওকত আবারাে উঠে দাঁড়িয়েছেএবার উঠে না দাঁড়ালেও চলতকেন দাঁড়াল সে নিজেও জানে না। ……..রেবেকা বলল, তুমি এখন কী করছ

 

Read more

যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *