রেবেকা বলবে, ভালাে। তারপরই শওকত আরাে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলবে, মিস্টার অ্যান্ডারসন কেমন আছেন ? ……….এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রেবেকা একটু হলেও থতমত খাবে । আগের স্বামীর মুখে বর্তমান স্বামীবিষয়ক প্রশ্ন কোনাে মেয়েরই সহজভাবে নেবার কথা।
সরি, তােমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। রেবেকা পেছন দিক থেকে কখন ঘরে ঢুকেছে শওকত বুঝতেই পারে নি। সে চট করে উঠে দাঁড়াল। উঠে দাড়াতে গিয়ে সামনের টেবিলের কোনায় হাঁটুর। খোঁচা লাগল । পিরিচে রাখা চায়ের কাপটা পিরিচে পড়ে কাত হয়ে পড়ে গেল। কাপে চা ছিল না। চা থাকলে চা গড়িয়ে বিশ্রী কাণ্ড হতাে।
শওকত বলল, কেমন আছ রেবেকা ? রেবেকা বসতে বসতে বলল, ভালাে আছি। ……..শওকতের এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটা করার কথা। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার রেবেকার স্বামীর নাম এখন আর মনে পড়ছে না। শওকত নিশ্চয়ই বলতে পারে , রেবেকা, তােমার আমেরিকান স্বামী কেমন আছেন ? শওকতের স্মৃতিশক্তি দুর্বল না, রেবেকার স্বামীর নাম সে জানে । নিউজার্সিতে এই ভদ্রলােকের পুরনো বইয়ের একটা দোকান আছে। দোকানের নাম All gone! বাংলা করলে হয় সব চলে গেছে‘।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
ভদ্রলােক এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসথেটিকস পড়াতেন। রেবেকার সঙ্গে সেখানেই তার পরিচয়। ছাত্র পড়াতে ভালাে লাগে না বলে তিনি পুরনাে বইয়ের দোকান দিয়েছেন। তাঁর এখন সময় কাটছে পুরনাে বই পড়ে। শওকতের সব কিছু মনে পড়ছে। ভদ্রলােকের নামটা শুধু মনে পড়ছে না। তার সাময়িক ব্ল্যাক আউট হয়েছে।
রেবেকা বলল, তােমার কি শরীর খারাপ না–কি ? শওকত বলল, না তাে! রেবেকা বলল, কেমন কপাল টপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছ। একটা কথা মনে করার চেষ্টা করছি। কিছুতেই মনে পড়ছে না। ..রেবেকা বলল, চেষ্টা বেশি করলে মনে পড়বে না। রিলাক্সড থাক। মনে পড়বে।
শওকত এই প্রথম রেবেকার দিকে তাকাল। যেসব বাঙালি মেয়ে দেশের বাইরে থাকে তাদের চেহারায় আলগা এক ধরনের লালিত্য দেখা যায়। গায়ের। রঙও হয় উজ্জ্বল। রেবেকাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার বয়স কমে গেছে। চেহারায় কেমন যেন বিদেশিনী বিদেশিনী ভাব চলে এসেছে। এরকম। হয়েছে চুলের কারণে। রেবেকার চুল ছিল লম্বা এবং কোকড়ানাে। কোকড়ানাে।
ভাব এখন আর নেই। চুল কেটে সে ছােটও করেছে। তবে এতে তাকে দেখতে খারাপ লাগছে না। বরং আগের চেয়েও সুন্দর লাগছে।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
শওকত বলল, তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছ। রেবেকা বলল, থ্যাংক য়ু। শওকত বলল, মিস্টার অ্যান্ডারসন কেমন আছেন? বলেই সে খুব তৃপ্তি বােধ করল। নামটা শেষপর্যন্ত মনে পড়েছে। ..রেবেকা বলল, সে ভালাে আছে। এই নামটাই কি তুমি মনে করার চেষ্টা করছিলে?
শওকত বলল, হ্যা। রেবেকা বলল, চা খাবে ? চা একবার খেয়েছি। ……..আরেকবার খাও। আমি সকালে কোনাে নাশতা করি না। এক কাপ চা আরেকটা টোস্ট বিস্কিট খাই। আজ এখনাে খাওয়া হয় নি। তােমার সঙ্গে খাব বলে অপেক্ষা করছিলাম।
চা দিতে বলাে। তুমি নাশতা খেয়ে এসেছ ? হ্যা। কী নাশতা করলে ? পরােটা আর বুটের ডাল। রেস্টুরেন্টের রান্না ? হঁ্যা। খাওয়া–দাওয়া কি সব হােটেল থেকে আসে ? ……একবেলা ঘরে রান্না হয়। একবেলাটা কখন ? রাতে।
কে রাঁধে ? আমি নিজেই রাঁধি। ভাত ডিম ভাজি ডাল। সিম্পল ফুড। বাসায় কাজের কোনাে লােক নেই ? ……..একজন ছিল। মায়ের অসুখ বলে দেশে গিয়েছিল, আর ফেরে নি।
রেবেকা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি চায়ের কথা বলে আসি। চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবে ? …..তােমাকে অতি ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্ন যে করলাম, তার পেছনে কারণ আছে। তােমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার এখন আগ্রহ দেখানাের কিছু নেই।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
কারণটা কী ? …….আমি দেশে এসেছি পনের দিনের জন্য। সঙ্গে করে ইমনকে নিয়ে এসেছি। সে তার এবারের জন্মদিন তােমার সঙ্গে করতে চায়। আমি ঠিক করেছি চার পাঁচদিন একনাগাড়ে তাকে তােমার সঙ্গে থাকতে দেব ।
আমার কথা কি তার মনে আছে ? …….মনে থাকবে না কেন ? তােমার সঙ্গে যখন আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তখন ইমনের বয়স পাঁচ বছর তিন মাস। চার বছর থেকেই শিশুদের সব স্মৃতি থাকে ।
ইমন কোথায় ? ………..সে তার নানুর কাছে গিয়েছে। তার শরীরটা ভালাে না। কী হয়েছে ? জ্বর বমি এইসব। দেশের ওয়েদার তাকে স্যুট করছে না। শওকত আগ্রহ নিয়ে বলল, ইমনকে কবে নিয়ে যাব ? রেবেকা বলল, ওর জন্মদিন কবে তােমার কি মনে আছে ? ………..ভুলে গেছি। আমারাে তাই ধারণা । ওর জন্মদিন এই মাসের নয় তারিখ। তুমি পাঁচ তারিখ এসে ওকে নিয়ে যাবে। তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি চা নিয়ে আসছি।
ড্রয়িংরুমে শওকত এখন একা। সে আগেও একা বসেছিল, তখন নিজেকে একা একা মনে হয় নি। এখন মনে হচ্ছে। সবচে‘ বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে রেবেকা যখন বলল, আমি সঙ্গে করে ইমনকে নিয়ে এসেছি, তখন সে বুঝতেই পারে নি ইমনটা কে? যখন বুঝতে পারল তখন হঠাৎ সব জট পাকিয়ে গেল। সে ভুলে গেল এই মাসের নয় তারিখে ইমনের জন্মদিন। সে কখনাে এই দিন ভুল করে না।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
ঐ দিন সে একটা সাদা ক্যানভাসে মনের সুখে হলুদ রঙে মাখায় লেমন ইয়েলাে। কারণ শওকত তার ছেলের নাম রেখেছিল লেমন ইয়েলাে । রঙের নামে নাম। ছেলের জন্ম হলাে মিডফোর্ট হাসপাতালে। ছেলেকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে বলেছিল— একী! এই ছেলে দেখি সন্ধ্যার আকাশের সমস্ত লেমন ইয়েলাে রঙ নিয়ে চলে এসেছে। আমি এই ছেলের নাম রাখলাম লেমন ইয়েলাে!
লেমন ইয়েলাে দেশে এসেছে। সে তার বাবার সঙ্গে কয়েকদিন থাকবে । ……..রেবেকা চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকেছে। শওকত আবারাে উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার উঠে না দাঁড়ালেও চলত। কেন দাঁড়াল সে নিজেও জানে না। ……..রেবেকা বলল, তুমি এখন কী করছ ?
Read more
