যেন অশুভ কিছু তার জন্যে অপেক্ষা করছে। ভয়ঙ্কর কিছু। লৌকিক কিছু না, অলৌকিক কিছু। অনেককাল আগে তার একবার এ রকম অনুভূতি হয়েছিল। শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছেন। গভীর রাত। তিনি এগারাে সিন্ধুর এক্সপ্রেসে ভৈরব যাবেন। ট্রেন আসবে ভাের রাতে। পৌষ মাসের মাঝামাঝি। প্রচণ্ড শীত। ওয়েটিং রুমে বসে সময় কাটানাের জন্যে ঢুকতে যাবেন হঠাৎ তার পা জমে গেল। বুক ধকধক করতে লাগল। মনে হলাে ওয়েটিং রুমে অশুভ কিছু আছে। ভয়ঙ্কর কিছু। যে ভয়ঙ্করের কোনাে ব্যাখ্যা নেই। তার উচিত কিছুতেই ওয়েটিং রুমে না ঢােকা। একবার ঢুকলে আর বের হতে পারবেন না।
কৌতূহল সব সময় ভয়কে অতিক্রম করে। তার বেলাতেও তাই হলাে। তিনি কৌতূহলী হয়েই উঁকি দিলেন। ওয়েটিং রুমের ইজি চেয়ারে একজন বৃদ্ধ, হলুদ কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। বৃদ্ধের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে সিগারেট টানছে। মিসির আলি ঘরে ঢুকলেন। বৃদ্ধ চোখ মেলল না, তবে তার ঠোটের কোণায় সামান্য হাসি দেখা গেল। শরীর জমিয়ে দেয়া তীব্র ভয় মিসির আলিকে আবারাে আচ্ছন্ন করল । তিনি প্রায় ছিটকে বের হয়ে এলেন।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
বাকি রাতটা কাটালেন প্ল্যাটফরমে পায়চারি করে। এগারাে সিন্ধু এক্সপ্রেস ভাের চারটা চল্লিশে প্ল্যাটফরমে ইন করল। মিসির আলি ট্রেনে ওঠার আগে আরেকবার ওয়েটিং রুমে উকি দিলেন। বৃদ্ধ যাত্রী ঠিক আগের জায়গাতেই আছে। মাথা নিচু এবং চোখ বন্ধ করে আগের মতােই সিগারেট টানছে। ঠোটের কোণায় আগের মতােই অস্পষ্ট হাসি।
মিসির আলি তাঁর জীবনের এই ভয় পাওয়া ঘটনাকে নানানভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। সবচে’ কাছাকাছি ব্যাখ্যা যেটা দাঁড় করিয়েছিলেন সেটা হলাে কিশাের বয়সে তিনি নিশ্চয়ই নির্জন স্টেশনের ওয়েটিং রুমের কোনাে ভূতের গল্প পড়ে ভয় পেয়েছিলেন। ভয়টা এতােই তীব্র ছিল যে, মস্তিষ্কের নিউরােন সেই স্মৃতি মূল্যবান কোনাে স্মৃতি মনে করে যত্ন করে মেমােরি–সেলে ঢুকিয়ে রেখেছে। নষ্ট হতে দেয় নি। অনেককাল পরে আরেকটি নির্জন স্টেশন দেখামাত্র মস্তিষ্ক মনে করল এ রকম একটা স্মৃতি তাে আছে। স্মৃতিটা বের করে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক।
যেহেতু অনেকদিনের স্মৃতি বের করতে গিয়ে সমস্যা হলাে। স্মৃতির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেল। কিছু অন্য রকম হয়ে গেল। মস্তিষ্ক শুধু যে স্মৃতি বের করে আনল তা–না, স্মৃতির মনে জড়িত ভয়ঙ্কর ভীতিও বের করে আনল। এ রকম কাণ্ডকারখানা মস্তিষ্ক মাঝে মাঝে করে। এর যেমন মন্দ দিক আছে। ভালাে দিকও আছে, মস্তিষ্কের ভেতর হঠাৎ নিউরােনের প্রবল ঝড় সৃষ্টি হয়। এতে ক্ষতিকারক স্মৃতি উড়ে চলে যায়। স্মৃতি জমা করে রাখা মেমরি–সেল খালি হয়।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
আজ যে ভয়টা পাচ্ছেন তার পেছনের কারণটা কী? তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পাঁচিল–ঘেরা প্রকাণ্ড একটা বাড়ির গেটের কাছে। অন্ধকারে পাঁচিল–ঘেরা বাড়িটাকে জেলখানার মতাে লাগছে। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন একা। এতক্ষণ লিলি তার সঙ্গে ছিল। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করে সে দারােয়ান শ্রেণীর কাউকে দিয়ে গেট খুলিয়েছে।
তাও পুরাে গেট না। গেটের অংশ যার ভেতর ছােটখাট মানুষ হয়তাে–বা কষ্ট করে ঢুকতে পারে। গেট খুলতেই লিলি তাঁর দিকে ফিরে বলল, স্যার আপনি দাঁড়ান। পাঁচ–ছয় মিনিট লাগবে। আমি কুকুর বেঁধে আসি। আমাদের তিনটা কুকুর আছে। খুবই উগ্র স্বভাব, অপরিচিত কাউকে দেখলে কী করবে কে জানে ? আমাকেই একবার কামড়ে দিয়েছিল।
মিসির আলি তারপর থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ঘড়ি দেখেন নি কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে পাঁচ–ছু মিনিটের অনেক বেশি সময় পার হয়েছে। কোনাে সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। বিশাল বাড়ি কিন্তু পুরােপুরি নিঃশব্দ। তিনটা ভয়ঙ্কর কুকুর অথচ তারা একবারও শব্দ করবে না এটা কেমন কথা? তাছাড়া বাড়ি অন্ধকারে ডুবে আছে। বিশাল এই বাড়ির একটি ঘরেও বাতি জ্বলবে না, এটাই কেমন কথা। এমন তাে না যে, এই বাড়িতে মানুষজন থাকে না। রাত তাে বেশি হয় নি। খুব বেশি হলে দশটা। যে দারােয়ান গেট খুলেছে তার হাতে কি একটা টর্চ থাকবে না ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
এমন গাঢ় অন্ধকার মিসির আলি অনেকদিন দেখেন নি। নক্ষত্রের আলাে পর্যন্ত নেই। আকাশ মেঘে ঢাকা। প্রবল অন্ধকারে জোনাকি বের হয়। জোনাকিও নেই। অনেকদিন তিনি জোনাকি দেখেন নি। জোনাকি দেখতে পেলে ভালাে লাগত।
নদীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। স্রোতের শব্দ। হঠাৎ করেই কি নদী সাড়াশব্দ শুরু করল ? এতক্ষণ এই নদী ছিল কোথায় ? বকুল ফুলের গন্ধ আসছে। এটা কি বকুল ফুলের সময় ? শহরবাসী হয়ে ছােটখাট ব্যাপারগুলি ভুলতে বসেছেন।
গন্ধটা হয়তাে বকুল ফুলের না। অন্য কোনাে বুনাে ফুলের। জায়গাটা বন তাে বটেই। আশপাশে লােকালয় নেই।
ঘড়ঘড় শব্দ হলাে। মিসির আলির চোখ হঠাৎ ধাঁধিয়ে গেল। গেট খুলেছে। গেটের ওপাশে জাহাজি লণ্ঠন হাতে লিলি দাড়িয়ে আছে। তার পাশে দারােয়ান। দারােয়ানের হাতে লম্বা টর্চ। পাঁচ ব্যাটারির টর্চ নিশ্চয়ই। এই টর্চে আলাে ফেলে দেখতে ইচ্ছা করছে— আলাে কেমন হয় ।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলি বলল, স্যার আসুন। ওর শরীরটা খারাপ বলে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। আর আমি খুঁজে পাচ্ছি না হারিকেন। বরকতকে দেখুন এত লম্বা টর্চ নিয়ে ঘুরছে। টর্চে নেই ব্যাটারি। ব্যাটারি ছাড়া টর্চ হাতে নিয়ে ঘােরার দরকারটা কী স্যার আপনিই বলুন। আপনাকে ব্যাগ হাতে নিতে হবে না। বরকত নেবে।
মিসির আলি বললেন, তােমার কুকুর কি বাধা হয়েছে ?
‘বাঁধা হয়েছে। সকালে কুকুরগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব তখন আর আপনাকে কিছু বলবে না। আপনার থাকার ব্যবস্থা করেছি দোতলার সবচে’ দক্ষিণের ঘরে। ঘরটা তেমন ভালাে না, তবে খুব বড় ঘর। এই ঘরের খাটটা সুন্দর। অন্য ঘরগুলিতে এত সুন্দর রেলিং দেয়া খাট নেই।
লণ্ঠনের আলােয় বাড়িঘর কিছু দেখা যাচ্ছে না। লণ্ঠন তার চারপাশ আলাে করছে। দূরে আলাে ফেলতে পারছে না। লণ্ঠন এবং টর্চের এই হলাে তফাৎ লণ্ঠন নিজেকে আলােকিত করে। নিজেকে দেখায়। টর্চ অন্যকে আলােকিত করে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
সিঁড়িটা সাবধানে উঠবেন স্যার। শ্যাওলা জমে কেমন পিছল হয়ে গেছে। রেলিং ধরে উঠুন। আপনার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিধে লেগেছে। ক্ষিধে লেগেছে না স্যার?
হু লেগেছে।
আপনি হাত–মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম করুন। আমি খাবার রেডি করে ফেলব। এর মধ্যে কোনাে কিছুর দরকার হলে দোতলার বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়াবেন। মাথা নিচু করে বরকত বরকত করে ডাক দেবেন। আমাদের একটাই কাজের লােক বরকত। একের ভেতর চার। সে–ই দারোয়ান, সে–ই কেয়ারটেকার, সে ই মালী, সে–ই কুকুর–পালক। ভাত খাবার আগে চা–কফি কিছু খাবেন ?
খেতে পারি। আমি এক্ষুণি বরকতকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তােমার হাসবেন্ডের সঙ্গে কি রাতে দেখা হবে ? অবশ্যই হবে।
অসুস্থ বলছিলে। অসুস্থ হােক যাই হােক গেস্টের সঙ্গে দেখা করবে না ?
Read more
