এর প্রভাবও বাকিদের উপর পড়বে। আফ্রিকার আদিবাসি এক জনগােষ্ঠির উপর একবার একটি সমীক্ষা চালানাে হয়েছিল। দেখা গেল এরা সবাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। কারণ অনুসন্ধান করে পাওয়া গেল এদের দলপতি বাঁ পায়ে ব্যথা পেয়েছিল। ব্যথার কারণে সারাজীবন তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়েছে। তাই সংক্রমিত হয়েছে পুরাে দলের উপর ।
আমি এ বাড়ির তিন সদস্যকে আলাদা আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা করছি, আবার দলবদ্ধভাবেও দেখার চেষ্টা করছি। সুলতানকে আমার মনে হয়েছে আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ। আমি যা করছি ঠিক করছি, আমি যা ভাবছি ঠিক ভাবছি গােত্রের একজন। একই ব্যাপার লিলির মধ্যে এবং বরকতের মধ্যেও দেখলাম। দীর্ঘদিন কিছু মানুষ যদি একটি গণ্ডিতে বাস করে তাহলে একটা পর্যায়ে তারা তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। এদের ক্ষেত্রেও কি তাই হতে যাচ্ছে?
সুলতানের আট ধরনের মধু এবং মধু নিয়ে তার বাড়াবাড়ি উচ্ছাসের কারণটা ধরতে পারছি না। যারা মদ্যপান করেন এবং ভালাে মদের ব্যাপারে যাদের আগ্রহ আছে তাদের মধ্যে এই উচ্ছ্বাস দেখা যায়। নানান ধরনের মদ সংগ্রহ করতে এবং অতিথিদের তা দেখাতে এরা পছন্দ করেন। সুলতানের মধুর ব্যাপারটা শুরুতে আমি সে রকম কিছুই ভেবেছিলাম। পরে লক্ষ করলাম ব্যাপারটা সে রকম না। আমি নিশ্চিত যে সুলতান মধু খায় না।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
কারণ সে যখন আমাকে মধু দিচ্ছিল তখন তার নাকি এবং ভুরু সামান্য কুঞ্চিত হলাে। যে শুটকি কখনাে খায় না তার সামনে এক বাটি শুটকির ঝােল দিলে সে এই ভঙ্গিতেই নাক কুঁচকাবে। আমি একবার ভেবেছিলাম তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করি সে মধু খায় কি–না। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করি নি। আমি যে চোখ খােলা রেখে সব দেখছি তা ঠিক এই মুহূর্তে এদের জানতে দিতে চাচ্ছি না। বরকত নামের দারােয়ানের একটা বিষয় আমার চোখে লাগছে। আমি লক্ষ করেছি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে তার
খুবই কষ্ট হয়। দেখে মনে হয় কষ্টটা শারীরিক। আমার ধারণা তা না। আমার ধারণা কষ্টটা মানসিক। দোতলার কোনাে ভয়ঙ্কর স্মৃতি কি তার মাথায় আছে ?
যে কারণে দোতলায় ওঠার ব্যাপারে তার অনাগ্রহ আছে ?
লিলি মেয়েটি নিজের চারদিকে এক ধরনের রহস্য তৈরি করার জন্যে ব্যস্ত। এটি অস্বাভাবিক না। মেয়ে মাত্রই নিজেকে রহস্যময়ী হিসেবে উপস্থিত করতে চায়। মেয়েটি বুদ্ধিমতী। সে নানানভাবে আমার বুদ্ধির হিসেব নিতে চাচ্ছে। দাড়ি পাল্লায় বুদ্ধি মাপতে চাচ্ছে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে আমার বুদ্ধির ব্যাপারটা তার কাছে জরুরি। কেন জরুরি? সে–কী আমার বুদ্ধি ব্যবহার করতে চায় ? কোথায় ব্যবহার করবে...‘
এই পর্যন্ত লিখে মিসির আলি হাই তুললেন। তার ঘুম পাচ্ছে। এখন ঘুমানাে যায়।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
মিসির আলি বিড়বিড় করে বললেন, This is a dream.Nothing but a dream. যে বিস্ময়কর ঘটনা এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে ঘটছে সেটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। স্বপ্নে বিস্ময়কর ঘটনা খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে। এখানেও তাই ঘটছে। তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন তাঁর মশারির ছাদে একটা সাপ কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। কুণ্ডলি ভেঙে সাপটা মাথা বের করল। এই তাে এখন মশারি বেয়ে নিচে নামছে। সাপের গায়ে লম্বা লম্বা দাগ থাকে— এর গায়ে ফুটি ফুটি। অনেকটা চিত্রা হরিণের মত।
তিনি আবারাে বিড়বিড় করে বললেন, This is a dream. Nothing but a dream, স্বপ্নের নানান স্তর আছে। তিনি নিশ্চয়ই গভীর কোনাে স্তরের স্বপ্ন দেখছেন। এ ধরনের স্বপ্ন চট করে ভাঙে না। মানুষের মস্তিষ্ক স্বপ্নটা পুরােপুরি দেখানাের ব্যবস্থা করে। তার বেলাতেও এই ব্যাপারটিই হচ্ছে। স্বপ্নটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেখতে হবে। তার মস্তিষ্ক দেখাবে। তিনি না চাইলেও দেখাবে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
যদি ঘটনাটা স্বপ্ন হয়ে থাকে তাহলে তাঁর চুপচাপ শুয়ে সাপটার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। চোখ বন্ধ করলেও সাপটা চলে যাবে না। তার চোখ বন্ধ না করার সঙ্গে স্বপ্নের কোনাে সম্পর্ক নেই। আর যদি স্বপ্ন না হয়ে থাকে তাহলে অনেক কিছুই করার আছে। শুয়ে না থেকে তাঁর উঠে বসা দরকার। হাততালি দেয়া দরকার। সাপ শব্দ পছন্দ করে না। যে–কোনাে ধরনের কম্পন তার কাছে বিরক্তিকর। খাটটা দোলানাে যেতে পারে। বালিশের নিচে সিগারেট আছে। সিগারেট ধরানাে যেতে পারে। সিগারেটের ধোঁয়াও নিশ্চয়ই সাপটা পছন্দ করবে না।
মিসির আলি উঠে বসার সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বসতে পারলেন না। এর দুটা কারণ হতে পারে। স্বপ্নে নিজের ইচ্ছায় কিছু করা যায়।
তিনি উঠে বসার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। কাজেই এটা স্বপ্ন। আর স্বপ্ন না হয়ে ঘটনাটা যদি সত্যি হয় তাহলে তিনি উঠে বসতে পারছেন না, কারণ তিনি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন। ভয়ে স্নায়ুতে স্থবিরতা চলে এসেছে। মস্তিষ্ক উঠে বসার সিগন্যালটা ঠিকমত দিতে পারছে না। যে সব রাসায়নিক বস্তু নিউরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি বালিশের নিচে হাত দিয়ে সিগারেট নিলেন। সিগারেট ধরালেন। তামাকের গন্ধ পাওয়া গেল। তাহলে কি এটা স্বপ্ন না, সত্যি ? স্বপ্ন হলাে সিনেমার পর্দায় ছবি দেখার মতাে ছবি দেখা যাবে, শব্দ শােনা যাবে তবে কোনাে গন্ধ পাওয়া যাবে না। স্বপ্ন গন্ধ এবং বর্ণহীন।
তিনি গন্ধ পাচ্ছেন এবং রংও দেখছেন। সাপের গায়ের হলুদ ফুটি স্পষ্ট দেখেছেন। এই তাে এখন তার হাতে বেনসন এন্ড হেজেস–এর সােনালি প্যাকেট। গাঢ় লাল রঙের উপর লেখা Special filter.
তবে এখানেও কথা আছে, গভীর স্তরের স্বপ্নে বর্ণ গন্ধ সবই থাকে। আচ্ছা এমন কি হতে পারে তিনি যা দেখছেন তা স্বপ্ন না, বাস্তব ঘটনা। তাকে তাে আগেই বলা হয়েছে এই বাড়ির দোতলায় সাপ আছে। যদি সাপ থেকেই থাকে তাহলে ঘরে সাপ আসতেই পারে। কারণ এই ঘরটায় কার্বলিক এসিড দেয়া হয় নি।
ধরে নেয়া যায় একটা সাপ ঘরে ঢুকেছে। আলাে সমস্ত প্রাণীকুলকে কৌতূহলী করে সাপটাকেও করেছে। সে এগিয়ে এসেছে খাটের নিচে রাখা হারিকেনের দিকে। এখানে এসে সে শুনতে পেল নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ। খাট থেকে শব্দটা আসছে । সাপটা আবারাে কৌতূহলী হলাে। সে দেখতে গেল ব্যাপারটা কী? কীসের শব্দ ? শব্দটা কোত্থেকে আসছে? দেখতে গিয়ে সে চলে গেল মশারির ছাদে। তার কৌতূহল মিটেছে বলে সে এখন চলে যাচ্ছে। কিংবা তার কৌতূহল মিটে নি। সে চলে যাচ্ছে কারণ সে বুঝতে পারছে কৌতূহল মেটার কোনাে সম্ভাবনা নেই।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
মিসির আলি বিছানায় উঠে বসলেন। বালিশের কাছে হাত বাড়ালেন। টর্চ লাইটটা আছে। তিনি টর্চের আলাে ফেললেন। সাপটা দেখা যাচ্ছে না। খাট বেয়ে নিশ্চয়ই নেমে গেছে। তিনি কয়েকবার কাশলেন। টর্চ লাইটে টোকা দিলেন। বসে বসেই খাট নাড়ালেন। তিনি এখন বিছানা থেকে নামবেন। তাঁকে একটা কাজ করতে হবে। ছােটখাট একটা পরীক্ষা। তাকে যেতে হবে বড় টেবিলটার কাছে। টেবিলের উপর ডায়েরি আছে। ডায়েরির পাতায় কিছু একটা লেখে নাম সই করতে হবে।
Read more
