মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

মাওলানা এশার নামাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে হাতির গলার ঘণ্টার আওয়াজ পেলেনসােনাদিয়ার জমিদার শশাংক পালের হাতির গলার রপার ঘণ্টাঅতি মধুর আওয়াজ। তিনি শুনেছেন সােনাদিয়ার জমিদার আরেকটহাতি কিনেছেনমাদি হাতিএখন তিনি দুই হাতি পাশাপাশি নিয়ে চলেনমাদি হাতিটা থাকে সামনে, পুরুষটা পিছনে

এরা যখন থেমে থাকে তখন না কি পুরুষ এবং মেয়ে হাতি শুড় জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকেনিশ্চয়ই খুব মধুর দৃশ্যতিনি এখনাে দেখেন নিএকবার সােনাদিয়ায় যাবেনদেখে আসবেন| হাতি নিয়ে কোরান মজিদে একটা সূরা আছেসূরা ফিলমাওলানা মনে মনে সূরা আবৃত্তি করে তার বঙ্গানুবাদ করলেনতার ভালাে লাগল। 

আলাম তারা কাইফা ফালা রাব্বকা বিআছহবিল ফীলহস্তিবাহিনীর সাথে তােমার প্রভু কীরূপ আচরণ করলেন তাহা কি তুমি লক্ষ কর নাই ? আলাম ইয়াজআকাইদাহুম ফীদলীল

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ 

তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করেন নাই ? জঙ্গলের পথ ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠেই মাওলানা শশাংক পালের দেখা পেলেনহাতির পিঠে শশাংক পাল বসে আছেনহাতির গায়ের রঙ অন্ধকারেমিশে গেছেমাওলানা ইদরিসের মনে হলাে, জমিদার শশাংক পাল শূন্যের উপর বসে আছেন। 

মাওলানা ইদরিস বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আদাববিধর্মীকে আসসালামু আলায়কুম বলা নিষেধতাদের বেলায় আদাবআদাব শব্দের অর্থ আছে কি 

তিনি জানেন না। শশাংক পাল বললেন, কে ? মাওলানা বললেন, জনাব আমার নাম ইদরিসআমি জুম্মঘরের ইমামআমার অঞ্চলে গরু কাটা নিষেধ এটা জানাে তাে ? জি জনাব জানি । 

নিষেধ জেনেও অনেকে গরু কাটেগভীর জঙ্গলের ভেতর এই কাজ করে মাংস ভাগাভাগি করেএরকম সংবাদ যদি পাও আমাকে জানাবেআমি ব্যবস্থা নিবভালাে কথা, হরিচরণ মুসলমান হয়েছে এরকম একটা খবর পেয়েছি। 

খবরটা কি সত্য সত্য না, জনাব। আচ্ছা, ঠিক আছে। পথ ছাড়, আমি যাব । মাওলানা পথ ছেড়ে রাস্তার পাশেই দাড়িয়ে ছিলেনতিনি আরাে দূরে সরে গেলেন। …….শশাংক পাল হাতি নিয়ে হরিচরণের বাড়িতে এসেছেনহাতি দুটাই সঙ্গে এনেছেন। শশাংক পালের সঙ্গে তার এস্টেটের দুই ম্যানেজার এসেছেনএকজন হুঁকোবরদার এসেছেপান বাসে একজন এসেছেতার কাজ নানান মসলা দিয়ে পান বানানােশশাংক পালের তামাক খাওয়ার অভ্যাস আছে অন্যের হুকোয় তিনি তামাক খান না। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

শশাংক পালের বয়স চল্লিশশরীরের উপর নানান অত্যাচারের কারণে বয়স অনেক বেশি দেখায়চেহারায় বালকভাব আছে, তবে চোখ জ্যোতিহীনঅতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে হাতকাপা রােগ হয়েছেগাছের পাতা কাঁপার মতাে হাতের আঙুল প্রায়ই থরথর করে কাঁপেশশাংক পাল এই কারণেই শীত গ্রীষ্ম সবসময় মখমলের চাদরে শরীর ঢেকে রাখেন। 

হরিচরণ জমিদার বাবুকে অতি যত্নে বৈঠকখানায় বসিয়েছেনতাকে তামাক দেয়া হয়েছেএকজন পাখবরদার পেছনে দাঁড়িয়ে বাতাস করছে। এত বড় জমিদার হঠাৎ তার বাড়িতে কেন এই কারণ হরিচরণ ধরতে পারছেন নাএকটা অনুমান তিনি অবশ্যি করছেন ব্রিটিশরাজকে খাজনা দেবার তারিখ এসে গেছেশশাংক পাল হয়তাে খাজনার পুরাে টাকার ব্যবস্থা করতে পারেন নিখাজনা জমা দেবার সময়ই শুধু জমিদাররা ধনবানদের খাতির করেন। ……..হরিচরণ! জে আজ্ঞে । 

নতুন হাতি খরিদ করেছিগৌরীপুরের মহারাজার কাছ থেকে কিনলাম তিনি কিছুতেই বিক্রি করবেন নামহারাজা বললেন, আমি কি হাতি বেচাকেনার ব্যবসা করি ? তােমার হাতি পছন্দ হয়েছে নিয়ে যাও, কিছু দিতে হবে নাআমি বললাম, ঐটা হবে নানগদ আট হাজার টাকা উনার খাজাঞ্চির কাছে জমা দিয়ে হাতি নিয়ে চলে এসেছিভালাে করেছি না

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

হরিচরণ হাসূচক মাথা নাড়লেন। হাতির নাম রেখেছি বংপুরুষটার নাম চং, মাদিটার নাম বংদুইজনে মিলে বংচংহা হা হাভালাে করেছি না ? ……….জে আজ্ঞে, ভালাে। শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, এখন মূল কথায় আসিহঠাৎ হাতি কেনার কারণে আমি কিঞ্চিৎ অর্থসংকটে পড়েছিআগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে খাজনা পৌছতে হবেপাচ হাজার টাকার সমস্যাটাকাটা দিতে পারবে

হরিচরণ মুখ খােলার আগেই শশাংক পাল বললেন, আমি জিনিস বন্ধক রেখে টাকা নিব বং থাকবে তােমার কাছে বন্ধকএকটা বন্ধকনামা তৈরি করে এনেছিস্ট্যাম্পে পাকা দলিলআমি বিশেষ বিপদে পড়েছিবিপদ থেকে উদ্ধার কর। 

হরিচরণ বললেন, আপনি নিজে এসেছেন এই যথেষ্টবন্ধকনামা লাগবে হাতিও রেখে যেতে হবে না| শশাংক পাল বললেন, এই কাজ আমি করি নাবন্ধকনামায় আমি দস্তখত করি নাই টিপসই দিয়েছিইদানীং দস্তখত করতে পারি নাহাতকাপা রােগ হয়েছে, শুনেছ বােধহয়জনসমক্ষে বিরাট লজ্জায় পড়ি বিধায় চাদরের নিচে হাত লুকিয়ে রাখিএখন বলাে টাকাটা কি দিতে পারবে হরিচরণ বললেন, এত টাকা আমি সঙ্গে রাখি নাসকালে আপনার বাড়িতে দিয়ে আসব। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

শশাংক পাল আরাে কিছুক্ষণ থাকলেনশরবত খেলেন, পান খেলেনকিছুক্ষণ গল্প করলেন| উড়াউড়া শুনতে পেলাম তােমাকে নাকি সমাজচ্যুত করেছেকথাটা কি সত্যি হরিচরণ একবার ভাবলেন বলেন, সমাজচ্যুতির ঘটনা আপনার বাড়িতেই ঘটেছেআপনি নিজে উপস্থিত ছিলেনতারপর মনে হলাে এই মানুষকে পুরনাে কথা মনে করিয়ে দিয়ে কোনাে লাভ নেইতিনি কিছুই মনে রাখতে পারেন না। 

শশাংক পাল বললেন, তুমি নাকি সবার সামনে এক মুসলমান ছেলেকে চাটাচাটি করেছ ? গালে চুমা দিয়েছ হরিচরণ জবাব দিলেন না। …..শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, আবার কার কাছে যেন শুনলাম সেই মেয়ের মা রাইত নিশুথে তােমার ঘরে আসেতুমি একা থাক, রাইত নিশুথে তােমার ঘরে মেয়েছেলে আসা তাে ভালাে কথা না। সমাজ থেকে পতিত হবে। 

হরিচরণ বললেন, পতিত তাে আছিই। নতুন করে কী হবাে ? তা ছাড়া রাইত নিশুথে আমার কাছে কেউ আসে না । ঐ মেয়ে আমারে বাবা ডাকে। আমি তাকে কন্যাসম দেখি।

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *