মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

বিরাট পণ্ডিতচারপাঁচটা ন্যায়রত্ব রামনিধি পানিতে গুলে খেয়ে ফেলতে পারেতােমার শরীর শুদ্ধির ব্যবস্থা কি করব ? যাক আরাে কিছু দিনতাছাড়া আপনি শরীর শুদ্ধি করলে তাে হবে নাকেউ মানবে নাকাশির পণ্ডিতদের লাগবে

তাও কথাএকটা কাজ করি, কোনাে শুভদিন দেখে দুজনে কাশি চলে যাইতােমার তাে অর্থের অভাব নাইআমারে খরচ দিয়া নিয়া গেলা পুণ্যধাম কাশি কোনােদিন দেখি নাইদেখার শখ আছে। ………….নিয়ে যাব আপনাকেকথা দিলামআমি উদ্ধার পাই বা না পাই আপনার শখ মেটাব। 

অম্বিকাচরণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন, হরিচরণের জন্যে তার সত্যি খারাপ লাগে। ….হরিচরণের জন্যে আরেকজন মানুষের খুবই খারাপ লাগে, তার নাম ধনু শেখসে লঞ্চঘাটের টিকেট বাবুমাঝে মাঝে টুকটাক ব্যবসা করেকোলকাতা থেকে এক ড্রাম লাল কেরােসিন নিয়ে এসে বান্ধবপুরে বিক্রি করেলঞ্চে পাঠিয়ে দেয় শুকনা মরিচএতে বাড়তি আয় যা হয় তা সে ব্যয় করে নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর পেছনে

পাউডার, স্নাে, শাড়ি, রুপার গয়নালঞ্চঘাটের কাছেই টিনের এক চালায় তার সংসারস্ত্রীর নাম কমলাধনু শেখ স্ত্রীর খুবই ভক্ততার একমাত্র স্বপ্ন একদিন সে একটা লঞ্চ কিনবে সেই লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সােহাগগঞ্জ চলাচল করবেলঞ্চের নাম এমএল কমলাএমএল হলাে মােটর লঞ্চসেই লঞ্চে কমলা নামের যেকোনাে যাত্রী যদি উঠে সে যাবে ফ্রিতার টিকেট লাগবে না। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ লঞ্চের টিকেট কাটতে এলেই ধনু শেখ কোনাে না কোনাে প্রসঙ্গ তুলে হরিচরণের জাত নষ্টের কথা তুলবে । 

বাবু, আপনে বলেনমনে করেন সুন্দর একটা কুত্তার বাচ্চা রাস্তায় হাঁটতেছেআপনে আয় তু তুবললেন, সে লাফ দিয়া আপনের কোলে উঠলআপনের জাইত কিন্তু গেল নামুসলমানের এক বাচ্চা কোলে নিছেনজাইত গেলএখন মীমাংসা দেনমুসলমানের বাচ্চা কি কুত্তার চাইতে অধম

যে সব বাবুদের ধরনের প্রশ্ন করা হয় তারা বিব্রত হন নাবিরক্ত হনকেউ কেউ বলেন, তুমি টিকেট বাবুতুমি টিকেট বেচবাএত কথা কী ? | জাইত জিনিসটা কী বুঝায়া বলেনশরীরের কোন জায়গায় এই জিনিস থাকে, ক্যামনে যায় ? জিনিসটা কি ধুয়াশা

তুমি বড়ই বেয়াদবতােমার মালিকের কাছে বিচার দিবচাকরি চইল্যাযাবেনা খায়া মরবা। …..মরলে মরবতয় জাইতের মীমাংসা কইরা দিয়া মরবতুমি জাইতের মীমাংসা করার কে? জাইতের তুমি কী বুঝ ? আমি না বুঝলেও আপনেরা তাে বােঝেনআপনেরা মীমাংসা দেন। 

বেয়াদবির কারণেই ধনু শেখের টিকেট বাবুর চাকরি চলে গেললঞ্চ কোম্পানির মালিক নিবারণ চক্রবর্তী তাকে ধর্মপাশা অফিসে ডেকে পাঠালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, ধনু, উইপােকা চেন ? …..ধনু শেখ ভীত গলায় বলল, চিনি। উঁইপােকার পাখা কেন উঠে জানাে ? উড়াল দিবার জন্যে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

উইপােকার পাখা উঠে মরিবার তরেতুমি উঁইপােকা ছাড়া কিছু নাতােমার পাখা উঠেছেতুমি সবেরে জাইত পাইত শিখাইতেছ ? …..ধনু শেখ বলল, কর্তা ভুল হইছেভুল স্বীকার পাইলে কানে ধরকানে ধইরা একশবার উঠবােস কর । 

ধনু দেরি করল নাকানে ধরে উঠবােস শুরু করলসে ধরেই নিয়েছিল চাকরি চলে যাবেকানে ধরে উঠবােসের মতাে অল্প শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছে দেখে সে আনন্দতার হাঁটুতে ব্যথা, উঠবােস করতে কষ্ট হচ্ছেএই কষ্ট কোনাে কষ্টই না। 

নিবারণ চক্রবর্তী খাতা দেখছিলেনখাতা থেকে মাথা তুলে বললেন, একশবার কি হইছে ? ..জে কর্তা হইছে। এখন বিদায় হওতােমার চাকরি শেষলঞ্চঘাটায় নতুন টিকেট বাবু যাবে।……আইজ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়বানতুন টিকেট বাবু পরিবার নিয়া উঠবে। 

আমার চাকরি শেষ ? এতক্ষণ কী বললাম ? …..ধনু শেখ বলল, চাকরি যদি শেষই করবেন কান ধইরা উঠবােস করাইলেকী জন্যে? ……..নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, আগেই যদি বলতাম চাকরি শেষ তাহলে কি কানে ধরে উঠবােস করতা? এই জন্যে আগে বলি নাই। 

ধনু শেখ বলল, এইটা আপনের ভালাে বিবেচনা | তােমার ছয়দিনের বেতন পাওনা আছেনতুন টিকেট বাবুর কাছে থাইকা নিয়া নিবাতার নাম পরিমলযাও, এখন বিদায়জটিল হিসাবের মধ্যে আছি। 

ধনু শেখ অতি দ্রুত গভীর জলে পড়ে গেলস্ত্রীকে নিয়ে উঠার কোনাে জায়গা নেইনিজের খরুচে স্বভাবের কারণে সঞ্চয়ও নেই| সে কিছুদিন বাজে মালের দোকান চালাবার চেষ্টা করলস্ত্রীর জায়গা হলাে নৌকায় ছইওয়ালা নৌকার দুপাশ শাড়ি দিয়ে ঘিরে তার ভেতরে সংসার। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

ধনু শেখের দোকান চলল নাহিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ তার দোকান থেকে কিছু কেনে নাআশ্চর্যের ব্যাপার, মুসলমানওরাও নারাতে নৌকায় ঘুমাতে গিয়ে ধনু শেখ হতাশ গলায় বলে, বউ কী করি বলাে তাে। নতুন কোনাে ব্যবসা দেখবেন ? কী ব্যবসা ? ঘােড়াতে কইরা ধর্মপাশা থাইকা মাল আনবেন। 

এই ব্যবসা করব না বউযারা ঘােড়ার মাল টানাটানি করে তারার স্বভাব হয় ঘােড়ার মতােঘােড়া হওয়ার ইচ্ছা নাই । ……নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে গিয়া তার পায়ে উপুড় হইয়া পইড়া দেখবেনপুরান চাকরি যদি ফেরত পান| ধনু শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, লাভ নাইউনার নতুন টিকেট বাবু কাজ ভালাে জানেতার জায়গায় আমারে দিবে না। 

এখন উপায়? তাই ভাবতেছি। ……অতিদ্রুত অবস্থা এমন পর্যায়ে গেল যে চাল ডাল কেনার টাকায় টান পড়লএর মধ্যে আরেক বিপদ কমলা গর্ভবতীতার সারাক্ষণ ভুখ লাগেএটা সেটা খেতে ইচ্ছা করেএকদিন অর্ধেকটা মিষ্টি কুমড়া কাচা খেয়ে ফেলল। 

ধনু শেখ বলল, বৌ, তােমারে তােমার মায়ের কাছে পাঠায়া দেই ? …..কমলা বলল, আপনেরে এতবড় বিপদে ফেইলা আমি বেহেশতেও যাব নাতাছাড়া আমার মার নিজেরই খাওন জুটে নাআমার কাছে স্বর্ণের একটা চেইন আছেএইটা বিক্রি করেন। ……….ধনু শেখ স্বর্ণের চেইন বিক্রি করতে পারল না

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *