মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

আমি সরাসরি তাদের কাছে গেলামআজহার চাচা আমাকে দেখে আনন্দিত গলায় বললেন, অনেক আগেই চলে যেতামতুই আসবি, তাের সঙ্গে দেখা হবে এই জন্যেই বসে আছিতাের বাবা বলল তাের নাকি ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার টাইমের কোনাে ঠিক নেইকখনাে দুপুর তিনটায় ফিরিস, কখনাে রাত আটটা ?

আমি হাসলামহঠাৎ আপনার দেখা পেয়ে খুবই আনন্দ পাচ্ছি জাতীয় হাসিআমার আসলেই ভালাে লাগছেচাচা আপনি নাকি কবরের জন্যে জায়গা কিনছেন ? ……হারে মা, কিনে ফেললামধানমণ্ডিতে যখন এক বিঘার একটা প্লট কিনি তখন খুবই আনন্দ পেয়েছিলামকবরের জায়গাটা কেনার পরও সমান আনন্দ পেয়েছিতোর বাবাকে কিনে দিতে চাচ্ছি সে কিনবে না। 

আপনি তাে চাচা ডেনজারাস মানুষডেনজারাস কেনরে মা? ……….প্রথমে কাফনের কাপড় কিনে দিলেনএখন কবরের জন্যে জায়গা কিনে দিচ্ছেনকয়েকদিন পর কবরের জায়গাটা বাঁধিয়ে ফেলবেনতারপর মৌলবি রেখে দেবেন সে প্রতি বৃহস্পতিবারে গিয়ে ওজিফা পাঠ করবেদিকে কবরে কোনাে ডেডবডিই নেইবাবা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ 

আজহার চাচা শব্দ করে হেসে উঠলেনতার হাসি আর থামতেই চায় নাঅনেক কষ্টে হাসি থামান, আবার হাে হাে করে ওঠেনতিনি বাবার কাধে ধাক্কা দিয়ে বললেন তােমার মেয়ের কথাবার্তা শুনেছ ? জোকারী ধরনের কথাবার্তারকম কথা কয়েকটা শুনলে তাে হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়েই মারা যাববলে কীকবরে কোনাে ডেডবডি নেই, এদিকে প্রতি বৃহস্পতিবার ওজিফা পাঠ হচ্ছেহা হা হা। 

বাবা বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকালেনচোখের ভাষায় বলার চেষ্টা করলেনতুমি কেন বুঝতে পারছ না আমি এই লােকটার সঙ্গ পছন্দ করছি না ? কেন তুমি তারপরেও মানুষটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছ? তার সঙ্গে রসিকতা করার কোনাে দরকার নেই। 

আজহার চাচা বললেন, মৃন্ময়ী মা আমার ছেলেটাকে আজ জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিছােটবেলায় কত এসেছে এখন আর আসতে চায় নাতার কথা তাের মনে আছে তাে মা ডাক নাম শুভ | তােদের বসার ঘরে একা একা বসে আছেচাটা কিছু খাবে কিনা একটু জিজ্ঞেস করিসতােযা লাজুক ছেলে মুখ ফুটে কিছু বলবে নাএকে নিয়ে বিরাট বিপদে আছিতাকে এমন কোনাে মেয়ের হাতে তুলে দিতে হবে যে তার নাকে দড়ি দিয়ে কেনি আংগুলেবেধে রাখবে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ 

আমি বাবার দিকে তাকালামবাবা হতাশ দৃষ্টি দিয়ে ইশারায় বলার চেষ্টা করলেনখবরদার দিকে যাবি নাতার মনে ক্ষীণ সন্দেহও হলােহতাশ দৃষ্টিটা আমি কি বুঝেছি! সে কারণেই হয়তাে আজহার চাচার দিকে তাকিয়ে বললেন, তােমার ছেলে কি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে ? সে শুনেছি কঠিন ধর্ম পালন করেআজহার চাচা আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, মৃন্ময়ী মা তাে বাইরের কেউ না তার সঙ্গে কথা বলতে দোষ নাই। 

বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, একটা ছেলে একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে তার জন্যে যদি দোষগুণ বিচার করতে হয় তাহলে কথা না বলাই উচিতমৃন্ময়ী তাের যাবার দরকার নেইতােকে দেখে বেচারা হয়তাে অস্বস্তিতে পড়বেকী দরকার ? তােকে দেখে মনে হচ্ছে তুই খুব টায়ার্ডতুই একটা হট শাওয়ার নেনাশতা খেয়ে রেস্ট নেতাের পরিশ্রম বেশি হচ্ছেতাের রেস্ট দরকার। 

আমি তাদের সামনে থেকে চলে এলামআমার কাছে মনে হচ্ছে কোনাে একটা ঝামেলা হয়েছেবড় কোনাে ঝামেলাবাবা মুখ শুকনা করে বসে আছেনতিনি খুবই টেনশানে আছেন আজহার চাচা তার ছেলে শুভকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেনএটাই কি টেনশানের কারণ ? তিনি কিছুতেই চাচ্ছেন না আমি আজহার চাচার ছেলের সামনে যাই। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ 

বাবা যেখানে বসেছেন আমার ঘর তার থেকে অনেক দূরেবাবা আজহার চাচার সঙ্গে কী কথা বলছেন কিছুই শুনতে পাচ্ছি নাতবে একটু পর পর আজহার চাচার হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিআজহার চাচা আজ খুব আনন্দে আছেন। 

বসার ঘর অন্ধকারএই ঘরে বড় বড় জানালা আছেজানালায় ভারী পর্দা টানা থাকে বলে ঘর অন্ধকার হয়ে থাকেবসার ঘরে কেউ বসলে বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়আজ বাতি জ্বালানাে হয় নিআজহার চাচার ছেলে শুভ ঘরের এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছেতাকে দেখে মনে হচ্ছে সে সামান্য ভীত। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *