মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

আসতে পারব নাতােমার মােবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাচ্ছেআমি কাজের কথা সেরে নেই। বল তাের কাজের কথা দাঁড়া এক সেকেন্ড তাের কাজের কথার আগে আমি আমার নিজের কথা বলে নেই, পরে ভুলে যাবআমার বেলায় এটা খুব বেশি হয়সময় মতাে কথা বলা হয় না বলে কখনােই বলা হয় নাকথাটা হলােআমি মােজা বানাতে পারে এমন একজনের সন্ধান পেয়েছি, তিনি আমাকে মােজা বানানাে শিখিয়ে দেবেনতিনি পায়ের মােজা বানাতে পারেন আবার হাত মােজাও বানাতে পারেন। 

ভালাে তাে। ……………..কোন মােজাটা বানাব সেটা বুঝতে পারছি না। স্ক্রপ্টে কিছু লেখা নেইতোর কী মনে হয় ডিরেক্টর সাহেবকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। ……..প্রতি দশ মিনিট পরপর তাঁকে টেলিফোন করছিরিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরছে না। 

মা তােমার কথা কি শেষ হয়েছে ? আমি কি আমার কথাটা বলতে পারি ? তাের ষাট হাজার টাকা দরকার এই তাে কথা ? জাননা কীভাবে ? ……..তাের বাবা টেলিফোন করে আমাকে জানিয়েছে যেন আমি টাকাটা না দেই। ………………….আচ্ছামৃ শােন উলের মােজা সাধারণত কোন কালারের হয় বল তাে?…….মা আমি জানি না কোন কালারের হয়আমি নিজে কখনাে উলের মােজা পরি না। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

তুইও পরেছিসজানুয়ারির সাত তারিখ তাের জন্মপ্রচণ্ড শীততাের হাতে পায়ে উলের মােজা পরিয়ে রাখতামছবিও তােলা আছে। …………মা এখন রাখি  রাখতে হবে নাআমার মােবাইলের ব্যাটারি একদম শেষ পর্যায়েএক্ষুণি বন্ধ হয়ে যাবেপিক পিক শব্দ হচ্ছে শুনতে পাচ্ছিস না

পাচ্ছিআয় আমরা কথা বলতে থাকিব্যাটারিও শেষআমাদের কথাও শেষবেশ কথা বলাে। ……..তুই এমন রাগী রাগী গলা করে রাখলে কথা বলব কী ? খেয়াল রাখবিএকে তাে আমি মা, তার ওপর বয়সে বড়হি হি হি। …………………..শুধু শুধু হাসছ কেন

এত সুন্দর একটা ডায়ালগ বলেছি এই আনন্দে হাসছিএকে তাে আমি মা, তার ওপর বয়সে বড়আমার নিজের কথা নাএত গুছিয়ে কথা বলব এমন বুদ্ধি আমার নেইপরশুরামের ডায়ালগআমি কী করি জানিস নানান জায়গা থেকে ইন্টারেস্টিং ডায়ালগ মুখস্ত করে রাখি সময় বুঝে ব্যবহার করি। 

ভালােমু, এক্ষুণি ব্যাটারি চলে যাবেটা টা বাই বাই বলে দে। ………..মা শােননা, আহ্লাদী করতে একটুও ইচ্ছা হচ্ছে নাআমার প্রচণ্ড মন খারাপ, শরীরও খারাপসব মিলিয়ে কেমন এলােমেলাে লাগছে। ……….মন ভালাে করে দেই ।………….কোনাে প্রয়ােজন নেই মাতােমার কথা শুনে মাথাও ধরে গেছেমানসিক যন্ত্রণাটা শারীরিক যন্ত্রণায় টার্ন নিচ্ছে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি তাের মাথা ধরা সারিয়ে দেব, মন খারাপ ভাব সারিয়ে দেব, শরীরও দেখবি ভাল হয়ে গেছেকি দেব? আচ্ছা ঠিক আছে দিচ্ছিশােন মৃ, টগরকে টাকাটা আমি দিয়ে দিয়েছিএতক্ষণ অকারণেই তোর সঙ্গে খটখট করলাম। 

টাকা দিয়ে দিয়েছ? ….হাব্যাংক থেকে তুলে এনে দিয়েছিতাের বাবা জানতে পারলে কেঁচা দেবে। …থ্যাংক ব্যু মাবলে একটা চিক্কার দিতে ইচ্ছা করছেচিঙ্কার দিতে পারলাম না কারণ মা’র মােবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যােবাইল অফ হয়ে গেছে। 

আমার মাথা ধরা নেই, মন খারাপ ভাব পুরােপুরি দূর হয়েছেশরীর ঝরঝরে লাগছেমা যেমন ছেলেমানুষি করে আমারও সে রকম কিছু করতে ইচ্ছা করছেবৃষ্টিতে ভেজা টাইপ কিছুএখন নভেম্বর মাসআকাশে শীতের ঝলমলে রােদবৃষ্টির কোনােই সম্ভাবনা নেইএমন কোনাে দিন সত্যি কি আসবে যখন প্রকৃতি পুরােপুরি মানুষের মুঠোর মধ্যে চলে আসবে ? আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছেআমি ছাদে উঠে দুহাত আকাশের দিকে তুলে বললাম, বৃষ্টি! ওমি ছাদে বৃষ্টি নামলবৃষ্টি শুধুই আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলআর কাউকে কিছু করল না। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যা পার করেসন্ধ্যার অনেক আগেই ফিরতে পারতামশেষ ক্লাসটা হয় নিতিনটার পর থেকেই ছুটিমাঝে মাঝে ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে নাইচ্ছা করে শুধুই ঘুরে বেড়াইপ্রাণীজগতের ভেতর একমাত্র মানুষই হয়তাে এমন প্রাণী যার হঠাৎ হঠাৎ ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে নাকিংবা কে জানে প্রাণী জগতের অনেকেরই হয়তো ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে নাপাখিদের সম্বন্ধে পুরােপুরি না জেনেই হয়তো জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন— 

সব পাখি ঘরে ফেরে ... পাখিদের কেউ কেউ হয়তাে কখনােই ফিরে না। ……………….ঢাকা শহর এমন একটা শহর যে ঘরে না ফিরে কোথাও যাবার জায়গা নেইএকজন মেয়ের পক্ষে একাকী কোথাও যাওয়া তাে অসম্ভব ব্যাপার একটি সাধারণ কফি শপে কফি খেতে যাওয়া যাবে নাকফি শপের মালিক, কর্মচারী এবং কাস্টমাররা বারবার তীক্ষ্ণ চোখে দেখবে

মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

তাদের চোখে প্রশ্ন এই মেয়ে একা কেন? আমার এমন অভিজ্ঞতা অনেকবার হয়েছেমেয়েদের একা ঘােরার জায়গা একটাইশাড়ি গয়নার দোকানযেন তাদের জীবনটাই শাড়ি এবং গয়নার গােলকধাধায় আটকে গেছেমেয়েরা অন্য কোনাে গােলকধাঁধায় ঘুরতে পারবে নাএই গােলকধাধায় ঘুরতে পারবে। 

আমার যখন একা ঘুরতে ইচ্ছা করে গাড়ি নিয়ে শালবনের দিকে চলে যাইশালবন শব্দটা মনে হলেই আমাদের চোখে ভাসেনিবিড় বন। মাঝখান দিয়ে রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছেঅতি নির্জন রাস্তাবাতাসে শালবনের পাতা কেঁপে মােটামুটি ভয় ধরে যায় এমন শব্দ হচ্ছে আবার থেমে যাচ্ছেযে শব্দের সঙ্গে সমুদ্র গর্জনের কিছু মিল আছে। 

 

 

 

 

 

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *