আসতে পারব না। তােমার মােবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাচ্ছে— আমি কাজের কথা সেরে নেই। বল তাের কাজের কথা দাঁড়া এক সেকেন্ড তাের কাজের কথার আগে আমি আমার নিজের কথা বলে নেই, পরে ভুলে যাব। আমার বেলায় এটা খুব বেশি হয়। সময় মতাে কথা বলা হয় না বলে কখনােই বলা হয় না। কথাটা হলাে— আমি মােজা বানাতে পারে এমন একজনের সন্ধান পেয়েছি, তিনি আমাকে মােজা বানানাে শিখিয়ে দেবেন। তিনি পায়ের মােজা বানাতে পারেন আবার হাত মােজাও বানাতে পারেন।
ভালাে তাে। ……………..কোন মােজাটা বানাব সেটা বুঝতে পারছি না। স্ক্রপ্টে কিছু লেখা নেই। তোর কী মনে হয় ? ডিরেক্টর সাহেবকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। ……..প্রতি দশ মিনিট পরপর তাঁকে টেলিফোন করছি। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরছে না।
মা তােমার কথা কি শেষ হয়েছে ? আমি কি আমার কথাটা বলতে পারি ? তাের ষাট হাজার টাকা দরকার এই তাে কথা ? জাননা কীভাবে ? ……..তাের বাবা টেলিফোন করে আমাকে জানিয়েছে যেন আমি টাকাটা না দেই। ………………….ও আচ্ছা। মৃ শােন উলের মােজা সাধারণত কোন কালারের হয় বল তাে?…….মা আমি জানি না কোন কালারের হয়। আমি নিজে কখনাে উলের মােজা পরি না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
তুইও পরেছিস। জানুয়ারির সাত তারিখ তাের জন্ম। প্রচণ্ড শীত। তাের হাতে পায়ে উলের মােজা পরিয়ে রাখতাম। ছবিও তােলা আছে। …………মা এখন রাখি । রাখতে হবে না। আমার মােবাইলের ব্যাটারি একদম শেষ পর্যায়ে। এক্ষুণি বন্ধ হয়ে যাবে। পিক পিক শব্দ হচ্ছে শুনতে পাচ্ছিস না ?
পাচ্ছি। আয় আমরা কথা বলতে থাকি। ব্যাটারিও শেষ। আমাদের কথাও শেষ। বেশ কথা বলাে। ……..তুই এমন রাগী রাগী গলা করে রাখলে কথা বলব কী ? খেয়াল রাখবি। একে তাে আমি মা, তার ওপর বয়সে বড়। হি হি হি।। …………………..শুধু শুধু হাসছ কেন ?
এত সুন্দর একটা ডায়ালগ বলেছি এই আনন্দে হাসছি। একে তাে আমি মা, তার ওপর বয়সে বড়। আমার নিজের কথা না। এত গুছিয়ে কথা বলব এমন বুদ্ধি আমার নেই। পরশুরামের ডায়ালগ। আমি কী করি জানিস নানান জায়গা থেকে ইন্টারেস্টিং ডায়ালগ মুখস্ত করে রাখি সময় বুঝে ব্যবহার করি।
ভালাে। মু, এক্ষুণি ব্যাটারি চলে যাবে। টা টা বাই বাই বলে দে। ………..মা শােননা, আহ্লাদী করতে একটুও ইচ্ছা হচ্ছে না। আমার প্রচণ্ড মন খারাপ, শরীরও খারাপ— সব মিলিয়ে কেমন এলােমেলাে লাগছে। ……….মন ভালাে করে দেই ।………….কোনাে প্রয়ােজন নেই মা। তােমার কথা শুনে মাথাও ধরে গেছে। মানসিক যন্ত্রণাটা শারীরিক যন্ত্রণায় টার্ন নিচ্ছে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি তাের মাথা ধরা সারিয়ে দেব, মন খারাপ ভাব সারিয়ে দেব, শরীরও দেখবি ভাল হয়ে গেছে। কি দেব? আচ্ছা ঠিক আছে দিচ্ছি। শােন মৃ, টগরকে টাকাটা আমি দিয়ে দিয়েছি। এতক্ষণ অকারণেই তোর সঙ্গে খটখট করলাম।
টাকা দিয়ে দিয়েছ? ….হা। ব্যাংক থেকে তুলে এনে দিয়েছি। তাের বাবা জানতে পারলে কেঁচা দেবে। …“থ্যাংক ব্যু মা‘ বলে একটা চিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে। চিঙ্কার দিতে পারলাম না কারণ মা’র মােবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যােবাইল অফ হয়ে গেছে।
আমার মাথা ধরা নেই, মন খারাপ ভাব পুরােপুরি দূর হয়েছে। শরীর ঝরঝরে লাগছে। মা যেমন ছেলেমানুষি করে আমারও সে রকম কিছু করতে ইচ্ছা করছে। বৃষ্টিতে ভেজা টাইপ কিছু। এখন নভেম্বর মাস। আকাশে শীতের ঝলমলে রােদ। বৃষ্টির কোনােই সম্ভাবনা নেই। এমন কোনাে দিন সত্যি কি আসবে যখন প্রকৃতি পুরােপুরি মানুষের মুঠোর মধ্যে চলে আসবে ? আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে। আমি ছাদে উঠে দু’হাত আকাশের দিকে তুলে বললাম, বৃষ্টি! ওমি ছাদে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি শুধুই আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আর কাউকে কিছু করল না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যা পার করে। সন্ধ্যার অনেক আগেই ফিরতে পারতাম। শেষ ক্লাসটা হয় নি। তিনটার পর থেকেই ছুটি। মাঝে মাঝে ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছা করে শুধুই ঘুরে বেড়াই। প্রাণীজগতের ভেতর একমাত্র মানুষই হয়তাে এমন প্রাণী যার হঠাৎ হঠাৎ ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না। কিংবা কে জানে প্রাণী জগতের অনেকেরই হয়তো ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না। পাখিদের সম্বন্ধে পুরােপুরি না জেনেই হয়তো জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন—
সব পাখি ঘরে ফেরে ... পাখিদের কেউ কেউ হয়তাে কখনােই ফিরে না। ……………….ঢাকা শহর এমন একটা শহর যে ঘরে না ফিরে কোথাও যাবার জায়গা নেই। একজন মেয়ের পক্ষে একাকী কোথাও যাওয়া তাে অসম্ভব ব্যাপার । একটি সাধারণ কফি শপে কফি খেতে যাওয়া যাবে না। কফি শপের মালিক, কর্মচারী এবং কাস্টমাররা বারবার তীক্ষ্ণ চোখে দেখবে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
তাদের চোখে প্রশ্ন এই মেয়ে একা কেন? আমার এমন অভিজ্ঞতা অনেকবার হয়েছে। মেয়েদের একা ঘােরার জায়গা একটাই— শাড়ি গয়নার দোকান। যেন তাদের জীবনটাই শাড়ি এবং গয়নার গােলকধাধায় আটকে গেছে। মেয়েরা অন্য কোনাে গােলকধাঁধায় ঘুরতে পারবে না। এই গােলকধাধায় ঘুরতে পারবে।
আমার যখন একা ঘুরতে ইচ্ছা করে গাড়ি নিয়ে শালবনের দিকে চলে যাই। শালবন শব্দটা মনে হলেই আমাদের চোখে ভাসে— নিবিড় বন। মাঝখান দিয়ে রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। অতি নির্জন রাস্তা। বাতাসে শালবনের পাতা কেঁপে মােটামুটি ভয় ধরে যায় এমন শব্দ হচ্ছে আবার থেমে যাচ্ছে। যে শব্দের সঙ্গে সমুদ্র গর্জনের কিছু মিল আছে।
Read more